Published : 18 Jul 2025, 07:09 AM
‘উবুন্টু দর্শন’ এসেছে আফ্রিকার বান্টু ভাষা থেকে, যার অর্থ ‘আমি আছি, কারণ তুমি আছো’। অন্যভাবে বললে, ‘তুমি আছো বলেই আমার অস্তিত্ব টিকে আছে।’ এই ধারণার মৌলিক নীতি: মানুষ কখনোই একা বেঁচে থাকতে পারে না। কানেকশন (সংযোগ), কমিউনিটি (গোষ্ঠী) ও কেয়ারিং (যত্ন), মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এই তিনটি জিনিস ভীষণ জরুরি।
সেইসঙ্গে সমাজে চলতে গেলেও এসবের উপর নির্ভর করতে হয়। বর্তমানের এই দ্বিধা-বিভক্ত সমাজে অনুভব করি, উবুন্টুর দিকে নতুন করে আমাদের ফিরে তাকানো প্রয়োজন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, অত্যন্ত গভীর এ দর্শনটির উদ্ভবের পেছনে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার পোস্ট-অ্যাপারথাইড যুগের এক কালো অধ্যায়। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় যে রাষ্ট্রীয় বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা চালু ছিল, সেটাকেই বলা হয় ‘অ্যাপারথাইড’।
এসময় শ্বেতাঙ্গ সরকার এক আইনের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ, রঙিন ও এশীয়দের নাগরিক অধিকার, বসবাস, চলাচল ও শিক্ষাকে সীমিত করে দেয়। কৃষ্ণাঙ্গদের বসবাসের জন্যও নির্ধারণ করা হয় পৃথক এলাকা। পাশাপাশি ছিনিয়ে নেওয়া হয় তাদের ভোটাধিকার; বাধা ছিল নির্দিষ্ট পেশায় তাদের প্রবেশাধিকারেরও। নেলসন ম্যান্ডেলাসহ বহু মানুষ তখন দমনমূলক এই শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেন। অবশ্য, আন্তর্জাতিক চাপ ও আন্দোলনের ফলে একসময় এই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় বর্ণনিরপেক্ষ নির্বাচন।
একদিকে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের আইনের মাধ্যমে পৃথক রাখা, অন্যদিকে শ্বেতাঙ্গদের অধিক মাত্রায় সুবিধা প্রদান। সেই সঙ্গে দীর্ঘসময় ধরে চলমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক টালমাটাল অবস্থা। সব মিলিয়ে দেশটির সমাজব্যবস্থায় দেখা দেয় বিভাজন ও অসাম্যের চূড়ান্ত রূপ। এই বিভেদ ও অসাম্য কাটিয়ে সমাজে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে সামনে চলে আসে উবুন্টু দর্শনের গুরুত্ব। যার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, সমাজের সবাইকে নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ব্যক্তি তার নিজস্ব সত্তা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে। হোক সে অপরাধী কিংবা ভুক্তভোগী।
তবে দর্শনটি কেবল আফ্রিকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক মানবউন্নয়নের ক্ষেত্রে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাধারা হিসেবে ভেবেছেন নেলসন ম্যান্ডেলা, কফি আনান, ডেসমন্ড টুটু থেকে শুরু করে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদও। পৃথিবীখ্যাত এসব উন্নয়নকর্মী ও সমাজচিন্তকরা মানবউন্নয়নের কেন্দ্রীয় পাটাতন হিসেবে তুলে ধরেছেন এই দর্শনকে।
তারা মনে করতেন, পারস্পরিক সংযোগ, সহযোগিতা আর সমতার উপর ভর করেই একটি সমাজ সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার ডানপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট ও যাজক ডেসমন্ড টুটু উবুন্টুকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে, “তোমার মানবতার সঙ্গে আমার মানবতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একসঙ্গে থাকলেই আমরা প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারি।” তার ভাবনায় এই বিষয়টি প্রকট হয়ে ওঠে যে, আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করলে যে সাফল্য অর্জিত হয়, তা যেকোনো একক ব্যক্তির সাফল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
এই দর্শনটির সঙ্গে ধারণাগত মিল রয়েছে কবি মুহাম্মদ ইকবালের ‘আত্ম-দর্শন’ ভাবনারও। ইকবাল বিশ্বাস করতেন, “ব্যক্তি একা অনেক কিছু করতে পারে। কিন্তু ঐক্যের মাধ্যমে আরও বেশি অর্জন সম্ভব। এ কারণে ব্যক্তির নিজস্বতার বিকাশ ঘটলে সমাজও উন্নতি লাভ করবে। মানুষ তার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা আর আবেগের মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তা গড়ে তোলে, যা সমাজের সঙ্গেও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।”
উবুন্টুও আমাদের বলে, প্রত্যেক মানুষের কিছু প্রতিভা ও শক্তির জায়গা রয়েছে। কমিউনিটির উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেটিকে তারা কাজে লাগাতে পারে। এতে করে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েই সুফল পাবে। কমিউনিটির সাফল্যের জন্য তার ব্যক্তিগত সাফল্যকে বিসর্জন দিতে হবে না। তবে এ দুটোর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখা জরুরি।
নেলসন ম্যান্ডেলা ২০০৬ সালে উবুন্টুকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “চলতে গিয়ে কোনো পথচারী যদি কোথাও থামে, তবে পানি বা খাদ্যের জন্য তাকে কারও কাছে হাত পাততে হবে না। সেখানকার মানুষই এগিয়ে এসে তাকে খাদ্য ও বিনোদন দিয়ে সহযোগিতা করবে।” উবুন্টুর প্রধান আরেকটি দিক হচ্ছে, মানুষ শুধু তার নিজের উন্নতির জন্য কাজ করবে না, বরং তার কাজ সমাজের কোনো উপকারে আসবে কিনা, তা নিয়েও চিন্তা করবে।
এটা এ-ও বলে না যে, মানুষ তার নিজের উন্নতি বা সফলতার জন্য কাজ করবে না বা নিজেকে সমৃদ্ধ করবে না। বরং এটি এই প্রশ্ন উসকে দেয়, মানুষ তার নিজের উন্নতির জন্য যা যা করছে, এর মাধ্যমে তার আশপাশের মানুষ বা সমাজের কোনো উন্নতি হচ্ছে কিনা! উবুন্টু স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা প্রত্যেকেই বৃহত্তর এক সত্তার অংশ। নানাভাবে যুক্ত একে অন্যের সঙ্গে। আর তাই আমাদের প্রথমে এটা বুঝতে হবে আমরা যা হতে চাই তা তখনই সম্ভব, যখন নিশ্চিত করব অন্যদেরও সেই একই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক উন্নয়নে এই সংযোগের গুরুত্ব সম্পর্কে বলে গিয়েছেন এবছর সমাজসেবায় স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া স্যার ফজলে হাসান আবেদও। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি মানুষের উবুন্টুর চর্চা করা উচিত। সমাজকে ন্যায়পরায়ণ করতে হলে যা যা প্রয়োজন তার সারকথা উবুন্টুর সহজ, শক্তিশালী ও বোধগম্য বার্তাটির মধ্যে আছে।
২০০৭ সালে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, “আমাদের আশপাশের একজন মানুষও যদি দারিদ্র্য ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করে, তাহলে আমরা সবাই দরিদ্র। তাই আমাদের উচিত প্রতিটি সঠিক উপায়, সেটা সামাজিক, আইনি, বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক যাই হোক না কেন, গ্রহণ করে মানবউন্নয়নকে সবার যৌথ দায়িত্ব হিসেবে গড়ে তোলা।”
তবে এটা সত্য যে, একটি দেশ বা সমাজের সবাই উবুন্টু দর্শনের চর্চা করছে, এরকম ধারণা অবাস্তব। সমাজে নানা বিভাজন ও অসাম্য থাকবেই। পৃথিবী কারও একার নয়; সেখানে আরও অনেক মানুষ রয়েছে, যাদের দর্শন, চিন্তা ও জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্নও হতে পারে। আমাদের বুঝতে হবে মানবতার ভিত্তি একমাত্রিক নয়, বরং বহুমাত্রিক। তাই আমরা কোনো বিষয়কে যেভাবে দেখি, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, অন্যরা বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে। বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে ঐক্যের পৃথিবী গড়ে তোলার শিক্ষা দেয় উবুন্টু।
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান বিষয়টিকে সহজভাবে তুলে ধরেন এভাবে: উন্নয়নের অধিকারই অন্য সব মানবাধিকারের প্রতি সম্মানের মানদণ্ড। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সবাই তাদের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সক্ষম হবে এবং সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে। উবুন্টু মনে করিয়ে দেয়, একা ভালো থাকা যায় না। ভালো থাকতে গেলে আমাদের একে অপরকে প্রয়োজন। সেই সঙ্গে এই শিক্ষাও দেয়, আমরা যে চোখে অন্যদের দিকে তাকাই, আর তাদের নিয়ে যা চিন্তা করি, সেটাকে পাল্টাতে হবে।
একইসঙ্গে বদলাতে হবে নিজের প্রতি নিজের চিন্তাচেতনাকেও। যখন আমি আমাকে অন্যের মধ্যে দেখতে পাবো, তখনই জন্ম নেবে সহানুভূতি, গড়ে উঠবে সহমর্মিতা। বুঝতে শিখব, আমার মতো করেই অন্যের ভেতরেও আছে আনন্দ-বেদনা, দ্বন্দ্ব-সংকট ও সীমাবদ্ধতা। তখন আর ‘আমি’ আর ‘তুমি’ আলাদা থাকবে না। সেই বিভাজন ভেঙে আমরা এক মানবিক অভিজ্ঞতায় একসঙ্গে হতে পারব। সমাজ, মানুষ ও নিজের প্রতি এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে আমাদের পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ।