Published : 29 Jun 2025, 01:44 PM
কখনো ভেবেছেন, একটি নতুন শব্দ কীভাবে অভিধানে ঢোকে? এটা কি একজন লোক সিদ্ধান্ত নেয়, নাকি একদল বিশেষজ্ঞের অনুমোদন লাগে? এই প্রবন্ধে আমরা জানব, নতুন শব্দ কীভাবে অভিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়।
শব্দকে অভিধানে তোলেন যিনি, তিনি কে?
শব্দ নিয়ে কাজ করেন যারা, তাদের বলা হয় লেক্সিকোগ্রাফার বা শব্দসংকলক। এই ব্যক্তিরাই গবেষণা করেন নতুন শব্দ কোথায় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে; পত্রিকা, বই, অনলাইন এবং কথ্য ভাষায়। তারা শব্দের ব্যবহার, প্রসঙ্গ ও অর্থ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং সেগুলো একটি ডেটাবেসে সংরক্ষণ করেন।
যখন একটি শব্দ অনেক ধরনের মাধ্যম ও পরিবেশে ব্যবহৃত হতে থাকে এবং তার একটি প্রতিষ্ঠিত অর্থ স্পষ্ট হয়, তখন তা অভিধানে অন্তর্ভুক্তির জন্য বিবেচিত হয়। এই প্রক্রিয়া অনেক সময় ধরে চলতে পারে। একদিনে কোনো শব্দ অভিধানে উঠে আসে না।
কোন কোন অভিধান আছে?
শুধু একটি অভিধান নয়, বিভিন্ন ভাষায় অনেক অভিধান রয়েছে। ইংরেজিতেও অনেক অভিধান আছে। তবে সবচেয়ে প্রামাণ্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত হলো ‘অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি’। এতে প্রায় ৬ লাখ শব্দ ও ৩০ লাখ উদ্ধৃতি আছে। অক্সফোর্ড অভিধানের প্রথম খণ্ড তৈরির কাজ শুরু হয় ১৮৭৯ সালের অগাস্টে, আর শেষ খণ্ড প্রকাশ পায় ১৯২৮ সালে। পুরো কাজ শেষ হতে লেগে যায় প্রায় ৫০ বছর।
বাংলা অভিধান
বাংলা ভাষার প্রথম বাংলা থেকে বাংলা অভিধান সংকলন করেন রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ, ১৮১৭ সালে। এরপর আরও অনেক বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সুবলচন্দ্র মিত্রের ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ (১৯০৬), জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ (১৯১৭) এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ (১৯৩২-১৯৩৬)। বাংলা একাডেমি ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ প্রকাশ করে ১৯৯২ সালে।
কীভাবে নতুন শব্দ যুক্ত হয়?
কোনো শব্দ অভিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য সেটি বিস্তৃতভাবে ব্যবহৃত হতে হবে। নতুন শব্দ যতক্ষণ না বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যবহৃত হয় এবং মানুষের মুখে মুখে ফেরে, ততক্ষণ সেটি অভিধানে স্থান পায় না।
একটি শব্দ যদি প্রচলিত হয় এবং তার অর্থ সবাই বোঝে, তাহলেই সেটি অন্তর্ভুক্তির জন্য বিবেচিত হয়। তবে এটি তাৎক্ষণিক হয় না, অনেক সময় লেগে যায়।
কে সিদ্ধান্ত নেয়?
লেক্সিকোগ্রাফাররা একা সিদ্ধান্ত নেন না। তারা তথ্য জোগাড় করেন এবং বিশ্লেষণ করেন। যখন দেখা যায় যে শব্দটি বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ, বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যবহার করছে, এবং এর অর্থও একটি নির্দিষ্ট রূপ পেয়েছে, তখন তা অভিধানে যুক্ত করার প্রস্তাব ওঠে। অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি বছরে চারবার হালনাগাদ হয়।
শব্দ মুছে ফেলা হয় কি?
অত্যন্ত কম সংখ্যক শব্দ অভিধান থেকে মুছে ফেলা হয়। অক্সফোর্ড দাবি করে, তারা কখনো কোনো শব্দ মুছে দেয়নি। বরং কোনো শব্দ যদি আর প্রচলিত না থাকে, তাকে ‘অপ্রচলিত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
শব্দের ইতিহাস রেকর্ড করাই অভিধানের উদ্দেশ্য। তাই পুরনো বই পড়তে গিয়ে কোনো অজানা শব্দ পেলে, আপনি তা অভিধানে খুঁজে পেতে পারেন।
অভিধান কেন তৈরি হয়েছিল?
মানুষের ভাষা সংরক্ষণের আগ্রহ বহু প্রাচীন। ১৫৮২ সালে রিচার্ড মালকাস্টার প্রথম একটি ইংরেজি শব্দ-তালিকা তৈরি করেন, যাতে ৮ হাজার জটিল শব্দ ছিল। ১৬০৪ সালে রবার্ট কডরির লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি অভিধান প্রকাশিত হয়।
এরপর ১৮৫৭ সালে লন্ডনের ফিলোলজিকাল সোসাইটি সিদ্ধান্ত নেয়, ইংরেজি ভাষার ইতিহাস রেকর্ড করতে হবে, সেখান থেকেই অক্সফোর্ড অভিধান প্রকল্পের সূচনা।
এখন কি আগের চেয়ে বেশি শব্দ যুক্ত হয়?
প্রতি বছর অক্সফোর্ড অভিধানে ৫০০ থেকে ১ হাজার নতুন শব্দ যুক্ত হয়। আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম যেমন বেড়েছে, তেমনি নতুন শব্দ চিহ্নিত করাও সহজ হয়েছে। তাই মনে হতে পারে, এখন বেশি শব্দ যুক্ত হচ্ছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যায় তেমন পার্থক্য নেই।
কেউ যদি নতুন একটি শব্দ আবিষ্কার করে এবং সেটি যদি জনপ্রিয়তা পায়, প্রচলন হয় ও স্থায়ী অর্থ ধারণ করে, তাহলে সেটিও একদিন অভিধানে উঠে আসতে পারে।
শব্দকে অভিধানে স্থান পেতে হলে তাকে বহুল ব্যবহৃত হতে হবে, মানুষের মুখে মুখে ফিরতে হবে, আর তার অর্থও সবার কাছে পরিষ্কার হতে হবে। তখনই সে শব্দ পায় অভিধানের মর্যাদা।
তথ্যসূত্র: দ্য ফ্যাক্টসাইট ডটকম