Published : 30 Jan 2026, 11:43 AM
সহজ-সরল এক মিষ্টি ভালুক, পরনে ছোট একটি লাল শার্ট, আর সারাক্ষণ মধুর সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো- এই হলো উইনি-দ্য-পু। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে সে কেবল একটি কাল্পনিক চরিত্র নয়, বরং শৈশব আর অকৃত্রিম বন্ধুত্বের এক চিরন্তন প্রতীক।
আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে, ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ লেখক এ. এ. মিলনের হাত ধরে এই প্রিয় বন্ধুটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। ২০২৬ সালে সারা বিশ্ব যখন পু-র শততম জন্মদিন উদযাপন করছে, তখন এর নেপথ্যের জাদুকরী গল্পটি জেনে নেওয়া যাক।
আসল ‘উইনি’ এবং এক সৈনিকের গল্প
অনেকেই হয়তো জানেন, ‘উইনি-দ্য-পু’ গল্পের মূলে রয়েছে এক সত্যিকারের ভালুক আর এক সৈনিকের গভীর মায়া। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কানাডীয় সৈনিক হ্যারি কোলবোর্ন মাত্র ২০ ডলারে একটি কালো ভালুক শাবক কিনেছিলেন। নিজের শহর উইনিপেগের নামানুসারে তিনি তার নাম রাখেন ‘উইনি’।
যুদ্ধের ডামাডোলে হ্যারি যখন ফ্রান্সে যান, তখন উইনিকে লন্ডনের একটি চিড়িয়াখানায় রেখে যান। সেখানেই ছোট্ট ক্রিস্টোফার রবিনের (লেখক এ. এ. মিলনের ছেলে) সঙ্গে উইনির বন্ধুত্ব হয়। ক্রিস্টোফারের নিজের একটি খেলনা ভালুক ছিল, যার নাম সে রেখেছিল ‘উইনি-দ্য-পু’। ছেলের সেই খেলনা আর তার কল্পনাকে সঙ্গী করেই মিলন সৃষ্টি করেন এই অমর কাহিনি।
বাস্তবের মায়াবী জঙ্গল: হান্ড্রেড একর উড
উইনি-দ্য-পু-র গল্পের সেই রহস্যময় বন ‘হান্ড্রেড একর উড’ কোনো কল্পনা নয়। এটি আসলে ইংল্যান্ডের পূর্ব সাসেক্স অঞ্চলের ‘অ্যাশডাউন ফরেস্ট’। লেখক এ. এ. মিলন এই বনের পাশেই থাকতেন। এই বনটি পরিবেশের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিরল ‘হিথল্যান্ড’ বা উঁচু ঘাসজমি, যা পৃথিবীর অনেক রেইনফরেস্টের চেয়েও দুর্লভ। এখানে বাস করে ইউরোপের সবচেয়ে বিপন্ন কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদ। পু-র গল্পের জনপ্রিয়তার কারণে আজও হাজার হাজার মানুষ এই অরণ্যে ছুটে যান তাদের প্রিয় চরিত্রের পদচিহ্ন খুঁজতে।
ডিজনি এবং বিশ্বজয়ী জনপ্রিয়তা
১৯২৬ সালে বই প্রকাশের পর থেকেই পু জনপ্রিয় হতে শুরু করে। তবে ১৯৬১ সালে বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘ডিজনি’ যখন এর স্বত্ব লাভ করে, তখন পু-র জনপ্রিয়তা অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে যায়। আমরা আজ পু-র গায়ে যে আইকনিক লাল শার্টটি দেখি, সেটি আসলে ডিজনিরই দেওয়া। ই. এইচ. শেফার্ডের সেই ক্লাসিক অলঙ্করণ আর ডিজনির জাদুকরী অ্যানিমেশন মিলে পু-কে করে তুলেছে শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শতবর্ষের মহা-উৎসব: ‘দ্য বিগ ওয়ান হান্ড্রেড’
এই ঐতিহাসিক শতবর্ষ উদযাপন করতে ইংল্যান্ডের অ্যাশডাউন ফরেস্টে বসছে এক জাঁকজমকপূর্ণ আসর। ‘ট্রিগার’ নামক একটি বিখ্যাত নাট্যগোষ্ঠী সেখানে ‘দ্য বিগ ওয়ান হান্ড্রেড’ শীর্ষক প্রজেক্ট শুরু করেছে। তারা বিশালাকার সব যান্ত্রিক পুতুল বা ‘পাপেট’ তৈরি করছে, যা এই বনের বিচিত্র সব প্রাণীর আদলে গড়া। এই উৎসবের মাধ্যমে একদিকে যেমন পু-র শতবর্ষ উদযাপন করা হচ্ছে, অন্যদিকে বন ও প্রকৃতি রক্ষার বার্তাও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
এই আয়োজনের অংশ হিসেবে স্থানীয় স্কুলগুলোতে বিশেষ কর্মশালার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে ছোটরা নিজেদের কল্পনার নানা অদ্ভুত প্রাণীর ছবি আঁকবে ও গল্প লিখবে। এমনকি সাধারণ মানুষও এই উৎসবে নতুন একটি পাপেট প্রাণীর নাম প্রস্তাব করার সুযোগ পাচ্ছে।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক পু?
১০০ বছর পেরিয়েও উইনি-দ্য-পু কেন এত জনপ্রিয়? কারণ, পু আমাদের খুব সহজ কিছু জীবনের পাঠ দেয়। পু আমাদের শিখিয়েছে- “বন্ধুত্ব মানে বড় কোনো কিছু নয়, এটি আসলে অনেকগুলো ছোট ছোট মুহূর্তের সমষ্টি।” কিংবা যখন সে বলে, “একটু ধৈর্য ধরলে আর একটু মমতা থাকলে সবকিছুই সুন্দর মনে হয়।” আজকের এই ব্যস্ত পৃথিবীতে পু-র এই সহজ দর্শন যেন আরও বেশি প্রয়োজন।
অ্যাশডাউন ফরেস্টের প্রধান নির্বাহী মার্ক পিয়ারসন যথার্থই বলেছেন, “আমরা চাই আগামী প্রজন্মও যেন এভাবেই প্রকৃতির কোলে তাদের প্রিয় বন্ধুদের খুঁজে পায় এবং আমাদের এই পৃথিবীটাকে ভালোবাসতে শেখে।”
সূত্র: বিবিসি