Published : 12 Jan 2026, 01:24 PM
“মাস্টারদা, আপনি কি হাতঘড়ি পরতেন কখনো? এই প্রশ্ন আমাকে ঠোকর মেরেছে অনেকবার। মাস্টারদা, আপনার বিষয়ে অনেক কিছুই জানা আছে আমার।” কবি শামসুর রাহমানের এই পঙ্ক্তি আমাদের স্মৃতির আয়নায় এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি করে।
একজন মানুষ, যার নাম শুনলে একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কেঁপে উঠত, তিনি কি সময়ের হিসাব রাখতেন ওই ছোট্ট একটি হাতঘড়িতে? নাকি তার হৃদস্পন্দনেই বাজত পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অনন্ত সাইরেন?
১২ জানুয়ারি। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক মহিমান্বিত অথচ বিষাদঘন দিন। ১৯৩৪ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এক মহানায়কের কণ্ঠস্বর। কিন্তু কণ্ঠ স্তব্ধ হলেও যে অগ্নিশিখা তিনি জ্বেলে দিয়ে গিয়েছিলেন, তা আজও বাংলার প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে প্রজ্বলিত।
১৮৯৩ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার নোয়াপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া সূর্য সেন শৈশব থেকেই ছিলেন ধীরস্থির এবং প্রখর মেধাবী। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের গোপন বইপত্র তার সঙ্গী ছিল। ১৯১৬-১৭ সালের দিকে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল তুঙ্গে, তখনই তিনি প্রত্যক্ষভাবে বিপ্লবী দলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন আপসহীন। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময় টেবিলের ওপর একটি বই পড়ে থাকাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন অধ্যক্ষের রোষানলে পড়েন তিনি। যদিও তিনি নকল করার উদ্দেশ্যে তা করেননি, তবু অধ্যক্ষ তাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করেন। এই জেদ তাকে নিয়ে যায় কলকাতার বহরমপুর কলেজে, যেখান থেকে ১৯১৮ সালে তিনি বিএ পাশ করেন।
পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামে ফিরে শুরু হয় শিক্ষকতা জীবন। উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের এই গণিতের শিক্ষক হয়ে ওঠেন সবার প্রিয় ‘মাস্টারদা’। কিন্তু তার অন্তরে তখন জ্বলছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। পরিবারের চাপে বিয়ে করতে হয়েছিল পুষ্প দত্তকে। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে ইতিহাস দেখেছে, ফুলশয্যার রাতে স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগেই রাতের অন্ধকারে তিনি গৃহত্যাগ করেন।
দেশমাতৃকার সেবায় নিবেদিত এক প্রাণের কাছে ব্যক্তিগত সুখ কতখানি তুচ্ছ হতে পারে, তা সূর্য সেনের এই জীবনদর্শন না পড়লে অনুধাবন করা অসম্ভব। স্ত্রীর মৃত্যুর পর জেল থেকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে শুধু একপলক তাকে দেখতে এসেছিলেন তিনি, এই এক মুহূর্তের জন্য হলেও তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের সংযোগ ঘটেছিল।
বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি শক্ত ভিত। দেওয়ানজী পুকুর পাড়ে ‘শান্তি আশ্রম’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাস্টারদা তরুণদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। সে সময় বিপ্লবী দলগুলো বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত ছিল, কিন্তু সূর্য সেন চট্টগ্রামে এক স্বতন্ত্র ও আপসহীন ধারা তৈরি করেছিলেন। বিপ্লবের খরচ জোগাতে তারা কখনও কখনও রাজনৈতিক ডাকাতির পথও বেছে নিতেন। আনোয়ারার এক হিন্দু জমিদারের বাড়িতে ডাকাতি করে অর্জিত সতের হাজার টাকা দিয়ে তারা অস্ত্র কেনেন। এটি ছিল শৃঙ্খল ভাঙার এক মরণপণ লড়াইয়ের শুরু।
মাস্টারদা জানতেন, শুধু ছোট ছোট সংঘর্ষ দিয়ে এই বিশাল সাম্রাজ্যকে টলানো যাবে না। প্রয়োজন এক সম্মুখ যুদ্ধ। জালালাবাদ যুদ্ধের প্রায় সাত বছর আগে নাগর পাহাড়ে পুলিশের সঙ্গে এক খণ্ড যুদ্ধে তিনি প্রথম অংশ নেন। সেই যুদ্ধে তিনি গ্রেপ্তার হলেও ব্রিটিশ সরকার তাকে বেশিদিন আটকে রাখতে পারেনি। ব্যারিস্টার দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের বুদ্ধিমত্তায় তিনি সেবার মুক্তি পান।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল। দিনটি ছিল শুক্রবার, গুড ফ্রাইডে। মাস্টারদার নেতৃত্বে মাত্র ৬৩ জন তরুণ এক অসম্ভবকে সম্ভব করার পরিকল্পনা করেন। ‘ভারতীয় রিপাবলিকান আর্মি, চট্টগ্রাম শাখা’ নামে একটি বাহিনী গঠন করে তারা ঘোষণা করেন চট্টগ্রামের স্বাধীনতা।
রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে শুরু হয় অভিযান। একদিকে অনন্ত সিংহ ও গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে পুলিশ অস্ত্রাগার আক্রমণ, অন্যদিকে নির্মল সেন ও লোকনাথ বলের নেতৃত্বে রেলওয়ে অস্ত্রাগার দখল। চট্টগ্রামের টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। সফল অভিযান শেষে গভীর রাতে যখন চট্টগ্রামের আকাশে স্বাধীন পতাকা ওড়ানো হয় এবং মাস্টারদাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়, সেই মুহূর্তটি ছিল বাঙালির শৌর্য ও বীরত্বের এক অনন্য দলিল।
এরই ধারাবাহিকতায় আসে ২২ এপ্রিলের ঐতিহাসিক জালালাবাদ যুদ্ধ। পাহাড়ের ওপর অবস্থান নেওয়া বিপ্লবীদের ওপর ব্রিটিশরা আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারাদিনের তুমুল লড়াই শেষে ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। সেই যুদ্ধে হরিগোপাল বল (টেগরা), প্রভাস বল, নির্মল লালাসহ ১৩ জন তরুণ অকাতরে প্রাণ দেন। আত্মসমর্পণের চেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন অমরেন্দ্র নন্দী। এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম প্রমাণ করেছিল, পরাধীনতার গ্লানি মোচনে বাঙালি তরুণরা কতটা বেপরোয়া হতে পারে।
জালালাবাদ যুদ্ধের পর শুরু হয় মাস্টারদার যাযাবর জীবন। ব্রিটিশ সরকার তার মাথার দাম ঘোষণা করে ১৫ হাজার টাকা। দীর্ঘকাল আত্মগোপন করে থাকার পর ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গৈরলা গ্রামে তিনি ধরা পড়েন। ইতিহাসের সেই চিরকালীন ট্র্যাজেডি, বিশ্বাসঘাতকতা। নিজেরই আত্মীয় রঞ্জন সেনের ভাই নেত্র সেন সামান্য অর্থের লোভে ব্রিটিশদের কাছে খবর পৌঁছে দেয়। বাংলার ইতিহাসে আরও এক মীরজাফরের জন্ম হয়, আর বাংলার সূর্য ঢাকা পড়ে অন্ধকারের কালো মেঘে।
১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে মাস্টারদা সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হয়। ফাঁসির আগে তাদের ওপর চালানো হয়েছিল অমানুষিক নির্যাতন। হাতুড়ি দিয়ে তাদের দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, নখ উপড়ে ফেলা হয়েছিল। জ্ঞানহীন অবস্থায় তাদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়। এমনকি তাদের মৃতদেহ সসম্মানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে দেওয়া হয়নি; গোপনে লোহার খাঁচায় ভরে বঙ্গোপসাগরের অতল গহ্বরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে মাস্টারদা তার অনুসারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “বন্ধুগণ বিদায়, চিরবিদায়। বিপ্লবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে। বন্দে মাতরম, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।” সেই দিন চট্টগ্রাম কারাগার প্রকম্পিত হয়েছিল রাজবন্দীদের গগনবিদারী স্লোগানে। কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই প্রতিটি প্রকোষ্ঠ থেকে বিপ্লবীরা সমস্বরে বিদায় জানিয়েছিলেন তাদের প্রিয় মাস্টারদাকে।