ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ২২
Published : 29 Mar 2026, 07:18 PM
একাত্তরের সেই অবিনাশী দিনগুলো বাঙালির হৃদয়ে যেমন গৌরবের আলপনা এঁকেছে, তেমনি অনেক বীরের শরীরে এঁকে দিয়েছে আমৃত্যু বয়ে বেড়ানো গভীর ক্ষতচিহ্ন। এমনই এক জীবন্ত কিংবদন্তি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট মোহাম্মদ কাঞ্চন সিকদার।
একসময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুশৃঙ্খল সিপাহি ছিলেন তিনি, কিন্তু দেশের প্রয়োজনে সেই শৃঙ্খল ভেঙে যোগ দেন স্বাধীনতার মহাসংগ্রামে। ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর শাহজাহান ওমরের (বীর উত্তম) অধীনে গৌরনদী, ঝালকাঠি ও ফরিদপুরের বিস্তৃত জনপদে তিনি যুদ্ধ করেছেন অসম সাহসিকতায়।
বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার আশুকাঠি গ্রামের এই বীরের স্মৃতিপটে আজও অম্লান হয়ে আছে সেই রক্তাক্ত অক্টোবর। স্মৃতির জানালা খুলে তিনি তুলে ধরেন তার জীবনের সেই সন্ধিক্ষণের কথা, যখন স্বাধীনতার সূর্যোদয় দেখার জন্য তিনি নিজের একটি পা বিসর্জন দিয়েছিলেন।
বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হানাদারের নৃশংসতার এক বীভৎস কেন্দ্র ছিল গৌরনদীর বাটাজোর ক্যাম্প। রাজাকারদের যোগসাজশে সেখানে মুক্তিকামী সাধারণ মানুষকে ধরে আনা হতো। কাঞ্চন সিকদারের ভাষায়, “পাকিস্তানি সেনাদের একটি ক্যাম্প ছিল গৌরনদীর বাটাজোরে। রাজাকারদের সহযোগিতায় সেখানে মুক্তিকামী বাঙালিদের ধরে আনা হত। তারপর তাদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে মারা হত গ্রেনেড চার্জ করে। নাম-না-জানা অজস্র রক্তাক্ত লাশের ঠিকানা ছিল বাটাজোর খাল। তারা এভাবেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছিল।”
এই পৈশাচিকতা বন্ধ করতে অক্টোবর মাসের ২২ তারিখ আসে চূড়ান্ত এক নির্দেশ। লক্ষ্য- বাটাজোর ক্যাম্প দখল। রাত তখন গভীর, ঘড়ির কাঁটায় দুটো। ২৫ জন করে তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা অগ্রসর হন। কাঞ্চন সিকদার নিজেই একটি দলের কমান্ডে ছিলেন। তার সেই দুঃসাহসী অভিযানে সঙ্গী ছিলেন ট্যাংক রেজিমেন্টের সার্জেন্ট হায়দার, সুবেদার গোলাম মোস্তফা, এসমত আরা রাসু, পুলিশের দারোগা মতিন ও লতিফ। তিনটি নৌকায় চড়ে তারা তাদের গন্তব্যে যাত্রা করেন।
পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত ও কৌশলী। ক্যাম্পের কাছেই ছিল একটি পোস্ট অফিস, যা পাকিস্তানিরা ওয়্যারলেস যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করত। একটি দল প্রথমে সেই পোস্ট অফিসে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে; দ্বিতীয় দলটি দক্ষিণে বরিশাল-শিকারপুর এলাকা থেকে আসা সম্ভাব্য শত্রু সাহায্য রুখে দাঁড়াবে; আর কাঞ্চন সিকদারের নেতৃত্বাধীন মাঝখানের দলটি সরাসরি ক্যাম্পে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
ভোর চারটার দিকে চারআনির পুলের কাছে নৌকা ছেড়ে তারা পায়ে হেঁটে একটি ছোট খাল পেরিয়ে পজিশন নেন। ঠিক তখনই উত্তর দিকের দলটি পোস্ট অফিসে গ্রেনেড চার্জ করে এবং আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হয় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। কাঞ্চন সিকদার ও তার দল তখনই গুলি করা শুরু করেন।
যুদ্ধের সেই উত্তাল মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “যুদ্ধের সময় আমি পজিশন রাখতাম দুটি। একটিতে ফায়ার হলে অন্য পজিশনে সরে পড়তাম। একটি নারকেল গাছের গোড়ায় ছিল আমার পজিশন। সঙ্গে নাইনটি ফোর এনারগা। এনারগা দিয়ে ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ফায়ার করতেই সেটি গিয়ে পড়ে ওদের বাংকারের উপর। সঙ্গে সঙ্গে ওরাও বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে থাকে। ওদের এলএমজির গুলিতে হঠাৎ সামনের নারকেল গাছটি দুভাগ হয়ে যায়। আমি পড়ে যাই টার্গেটে।”
মৃত্যু তখন মাথার ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে। আত্মরক্ষার জন্য তিনি পাশের একটি আমগাছের গোড়ায় ঝাঁপ দেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ব্রাশফায়ারের মুখে পড়েন তিনি। একটি বুলেট তার বাঁ পায়ে আঘাত হানে এবং মুহূর্তেই পায়ের হাড়গুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। সেই ভয়াবহ অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “নিজেকে রক্ষায় জাম্প দিই সেখানে। ওই সময়ই ব্রাশফায়ারে পড়ি। গুলি লাগে আমার বাঁ পায়ে। পায়ের হাড্ডিগুলো উড়ে যায়। প্রথম কোনো বোধ পাই না। সবার সঙ্গে তখন গামছা থাকত। তা দিয়ে পা শক্ত করে বেঁধে নিই। পাশেই ছিল হায়দার। বললাম, ‘ভাই, আমারে একটু ধর’। আম গাছের পাশ থেকে এক পা ধরে সে আমাকে টেনে নামিয়ে আনে খালের মধ্যে।”
কিন্তু সহযোদ্ধাকে বাঁচাতে গিয়ে হায়দার নিজেও মারাত্মক আহত হন; একটি গুলি তার পুরুষাঙ্গের শিরা ভেদ করে চলে যায়। সহযোদ্ধারা তাদের উদ্ধার করে পাশের গ্রামের রহম আলী কারিগরের বাড়িতে নিয়ে যান এবং পরে একটি দরজার পাল্লায় শুইয়ে নৌকায় করে ধামুরায় আকবর মিস্ত্রির দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই কাঞ্চন সিকদারের ঝুলন্ত পা থেকে টপটপ করে ঝরছিল রক্ত, আর সেই দৃশ্য দেখতে দেখতেই তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন।
পায়ের অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে, স্থানীয় তিনজন চিকিৎসক- রণজিৎ, মহসিন ও আজহার বাধ্য হয়ে হাঁটু থেকে তার পায়ের নিচের অংশটি কেটে ফেলেন। জ্ঞান ফেরার পর নিজের খণ্ডিত দেহের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন এই যোদ্ধা। কাঞ্চন বলেন, “পায়ের অবস্থা ভালো ছিল না। স্থানীয় তিনজন ডাক্তার, রণজিৎ, মহসিন ও আজহার গিরা (হাঁটু) থেকে পায়ের নিচের দিকটুকু কেটে ফেলেন। ওখান থেকে যেভাবে রক্ত ঝরছিল তা দেখে আমার সহযোদ্ধারাও মুশড়ে পড়ে। জ্ঞান ফিরতেই দেখি পা-টা নেই। সারাজীবনের জন্য আমি পঙ্গু। কষ্টে আর দুঃখে তখন বুকটা ফেটে যাচ্ছিল।”
কথাগুলো বলতে বলতে আজও কান্নায় ফুঁপিয়ে ওঠেন তিনি। যুদ্ধের পরবর্তী দিনগুলো ছিল আরও কঠিন। ধামুরার একটি টিনের ঘরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজাকারদের মাধ্যমে খবর পেয়ে পাকিস্তানিরা গানবোট নিয়ে হানা দেয়। গানবোটের আলো আর গুলির শব্দের মাঝে স্ত্রী ও মাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নৌকায় করে জল্লার বিলে আত্মগোপন করেন।
পায়ে তখন ঘা হয়ে হাড় বেরিয়ে গেছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে ক্ষত থেকে। পাকিস্তানি সেনার ভয়ে কেউ দুদিনের বেশি আশ্রয় দিতে চাইত না। এই দুঃসময়ে মুক্তিযোদ্ধা কেরামত তার ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। আসকর কালিবাড়ির ঠাণ্ডারাম বৈরগীর বাড়িতে এক হিন্দু চিকিৎসকের মলমে ধীরে ধীরে তার ক্ষত শুকাতে শুরু করে। সেই কষ্টের দিনগুলোতে জাতীয় নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত তাকে দেখতে এসে চোখের জল ফেলেছিলেন।
অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর এলো সেই কাঙ্ক্ষিত বিজয়। স্বাধীনতার খবর শুনে আনন্দের চেয়েও তার চোখে ছিল বেদনার অশ্রু। স্বাধীনতার পর চিকিৎসার জন্য তাকে সরকারিভাবে পোল্যান্ডে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই কৃত্রিম পা আর হুইলচেয়ার হয়ে ওঠে তার জীবনসঙ্গী। আজও পায়ের মাংসে মাঝে মাঝে ইনফেকশন হয়ে যায়, যা তাকে মনে করিয়ে দেয় সেই রক্তমূল্যের কথা। দেশের জন্য পা হারানোর কষ্ট তিনি মানতে পারলেও পঙ্গু হয়ে প্রতিদিন পথ চলার যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খায়।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “স্বাধীনের খবর শুনে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিলাম। চিকিৎসার পর থেকে কৃত্রিম পা ও হুইলচেয়ারই ভরসা। পায়ের মাংসে এখনও মাঝে মাঝে ইনফেকশন হয়ে যায়। দেশের জন্য পা হারানোর কষ্ট না হয় ভুলে গেলাম। কিন্তু পঙ্গু হয়ে প্রতিদিন চলছি, এ কষ্ট আর যন্ত্রণা ভুলি কীভাবে?”
সার্জেন্ট মোহাম্মদ কাঞ্চন সিকদার আজ কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি বাংলাদেশের এক জীবন্ত মানচিত্র। নতুন প্রজন্মের প্রতি তার শেষ নিবেদনটি গভীর ও হৃদয়স্পর্শী। তিনি তার সেই করুণ ও দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন, “যে যেখানেই থাক, মনে রেখ, স্বাধীন এই দেশটার জন্য লাখো মানুষ শহীদ হয়েছেন। বহু লোক পঙ্গু হয়েছেন। বহু নারী তার সম্ভ্রম হারিয়েছেন। স্বাধীনতা আপনা-আপনি ধরা দেয়নি। অন্তরে এই বোধটা থাকলেই তোমরা দেশকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসতে পারবে। আর তখনই দেশের চেহারা সত্যি বদলে যাবে।”
তার সেই আবেগঘন কান্না আর দেশপ্রেমের কথাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আজকের এই মুক্ত বাতাস কত শত বীরের নিশ্বাস আর রক্তের বিনিময়ে কেনা।