জাপানি কবিতা ‘ওয়াকা’: হাইকুর আদি উৎসের গল্প
চর্যাপদের মতো ওয়াকাও শুধু কবিতা নয়, সুর করেও গাওয়া হতো।
জাপানি সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলোচনা মানেই এক অপার্থিব প্রশান্তির প্রতিধ্বনি। গত পর্বে আমরা জাপানি কবিতার সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপ ‘হাইকু’ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। মাত্র সতেরোটি ধ্বনির সেই জাদুকরী বুনন কীভাবে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে নিজের আসন করে নিয়েছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
কিন্তু পাঠক হয়তো ভাবছেন, এই হাইকু কি হঠাৎ করেই আকাশ থেকে পড়ল? নাকি এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের কোনো বিবর্তন? আজকের পর্বে আমরা সেই শেকড়ের সন্ধানেই যাত্রা করব। আমরা জানব, হাইকুর জন্মকথা এবং জাপানি ‘ওয়াকা’ বা ধ্রুপদী কবিতার ইতিহাস। কীভাবে একটি জাতির লোকসংস্কৃতি তাদের সাহিত্য থেকে জীবনধারায় মিশে গিয়ে হাইকুতে পরিণত হলো, এ এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যান।
হাইকুর গঠনপ্রণালী ও ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই পরিচিত হতে হবে জাপানি ভাষায় লিখিত আদি ও সংক্ষিপ্ত কবিতার ধরন ‘ওয়াকা’-র সঙ্গে। ‘হাইকু’ যদি হয় জাপানি সাহিত্যের সতেজ মুকুল, তবে ‘ওয়াকা’ হলো সেই সাহিত্যের মহীরুহ।
‘ওয়াকা’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি বেশ চমৎকার। এটি দুটি জাপানি শব্দের (যা মূলত চীনা ভাষা থেকে ধার করা চিত্রলিপি বা কানজি) সমন্বয়ে গঠিত। প্রথম অংশ ‘ওয়া’ এবং দ্বিতীয় অংশ ‘কা’। ‘ওয়া’ শব্দটির অর্থ হলো জাপান বা জাপান সম্পর্কিত, আবার এর একটি গূঢ় অর্থ হলো ‘শান্তি’ বা ‘সামঞ্জস্য’। আর ‘কা’ (যার আরেকটি উচ্চারণ ‘উতা’) অর্থ হলো গান বা গীতি। অর্থাৎ শাব্দিক অর্থে ‘ওয়াকা’ হলো জাপানি গান বা জাপানি কবিতা।
এই নামকরণের পেছনে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকে ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত চীন দেশের লোকেরা জাপানকে বোঝাতে ‘ওয়া’ শব্দটি ব্যবহার করত। প্রাচীন চীনা ইতিহাসে জাপান সম্পর্কে যে প্রথম লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়, সেখানে জাপানকে ‘ওয়া’ দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসে বর্ণিত আছে, এই ‘ওয়া’ দেশটি হিমিকো নামের এক রহস্যময়ী রানি শাসন করতেন, যিনি পুরো দেশটিকে একতাবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তখনো জাপানের নিজস্ব কোনো বর্ণমালা বা লিপি আবিষ্কৃত হয়নি, তাই জাপানের ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়টি চীনা ইতিহাসবিদদের হাত ধরেই রচিত। পরবর্তীকালে যখন জাপান তার নিজস্ব সাহিত্যিক সত্তা খুঁজে পেল, তখন তারা তাদের একান্ত নিজস্ব এই কবিতার ধরনটিকে ‘ওয়াকা’ নামে অভিহিত করল। এটি ছিল চীনা কবিতা বা ‘কানশি’ থেকে নিজেদের স্বকীয়তা প্রমাণের একটি প্রয়াস।
এবার জানবো গাণিতিক ছন্দ ৫-৭-৫-৭-৭ এর জ্যামিতি। আমরা জানি, ‘হাইকু’ মাত্র তিন লাইনে লেখা ৫-৭-৫ ধ্বনির কবিতা। কিন্তু ‘ওয়াকা’ বা তানকার গঠনশৈলী কিছুটা ভিন্ন ও বিস্তৃত। ‘ওয়াকা’ হলো ৩১টি ধ্বনির (সিলেবল) সমন্বয়ে গঠিত পাঁচ লাইনের কবিতা বা গান। এর গাণিতিক গঠনটি হলো: ৫-৭-৫-৭-৭।
মজার ব্যাপার হলো, এই ৩১ ধ্বনির নিয়মটি কেউ একদিনে বসে ঠিক করে দেননি। কয়েকশ বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে এবং চর্চার মাধ্যমে এটি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে এসে দাঁড়িয়েছে। হাইকুর মতো ওয়াকাতেও ঋতু বা প্রকৃতির অনুষঙ্গ থাকা বাঞ্ছনীয়, তবে হাইকুতে যেমন ‘কিগো’ বা ঋতুবাচক শব্দ থাকা আবশ্যক, ওয়াকায় সেই নিয়মটি অতটা কঠোর নয়। কিন্তু ৩১ অক্ষরের দেয়ালটি এখানে অলঙ্ঘনীয়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, আমাদের বাংলা সাহিত্যের চর্যাপদ যেমন শুধু কবিতা নয়, বরং সুর করে গাইবার জন্য রচিত গান ছিল, জাপানি ওয়াকাও ঠিক তেমনই। এগুলি মূলত গীতি। জাপানিরা এগুলো আবৃত্তি করে না, বরং সুর করে গায়। সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই কবিতাগুলো ‘ওয়াকা’ নামেই পরিচিত ছিল। কিন্তু সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এবং পরবর্তীতে আধুনিক হাইকু ও তানকার জনক মাসাওকা শিকির সময় থেকে ৩১ ধ্বনির এই কবিতাকে নতুন নাম দেওয়া হয় ‘তানকা’।
‘তান’ অর্থ সংক্ষিপ্ত বা ছোট এবং ‘কা’ অর্থ গান। অর্থাৎ তানকা মানে ছোট গান। এখনো জাপানের বিভিন্ন স্থানে তানকার আসর বসে, যা শুনলে মনে হয় কোনো এক ধ্রুপদী সংগীতের আসরে এসেছি।
এবার আসি দশ হাজার পাতার সংগ্রহ ‘মানইয়োশু’ প্রসঙ্গে। নারা যুগে (৭১০-৭৯৪ সাল) ওয়াকার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও এর স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচিত হয় ‘মানইয়োশু’ সংকলনের কাল। ‘মানইয়োশু’ বা ‘দশ হাজার পাতার সংগ্রহ’ হলো জাপানি কবিতার সর্বপ্রাচীন ও সর্ববৃহৎ সংকলন। এতে প্রায় সাড়ে চার হাজারেরও বেশি কবিতা রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশই হলো ওয়াকা বা তানকা।
এই সংকলনটির বিশেষত্ব হলো এর সর্বজনীনতা। এখানে যেমন সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীদের লেখা কবিতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাধারণ সৈনিক, কৃষক, এমনকি ভিক্ষুকদের রচনাও। প্রায় ৪৫০ জন কবির লেখা এতে স্থান পেয়েছে, যার মধ্যে ৭০ জন ছিলেন নারী। এটি প্রমাণ করে যে, প্রাচীন জাপানে কবিতা চর্চা কেবল অভিজাত পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং নারীরাও সমান তালে সাহিত্য চর্চা করতেন।
ওয়াকার বিষয়বস্তু কী? নারা এবং হেইয়ান যুগের (৭৯৪-১১৮৫ সাল) সাহিত্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওয়াকা রচনার ক্ষেত্রে কিছু অলিখিত নিয়ম মানা হতো। জাপানিরা তাদের কবিতায় সাধারণত জীবনের রূঢ় বাস্তবতা, যেমন- বন্যা, মহামারী, যুদ্ধ বা দারিদ্র্যের কথা সরাসরি তুলে ধরত না। তারা মনে করত, কবিতা হলো সুন্দরের আরাধনা। তাই ওয়াকার মূল উপজীব্য ছিল প্রেম, বিরহ, প্রকৃতির পালাবদল এবং মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতি।
বিশেষ করে নারী ও পুরুষের গোপন প্রেম, নিষিদ্ধ ভালোবাসার হাতছানি এবং প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষার প্রহর, এসবই ওয়াকার ছত্রে ছত্রে বর্ণিত হয়েছে। বৃষ্টির উদাহরণ দিয়ে বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করা যাক। অতিবৃষ্টিতে জাপানের নদীগুলোতে প্রায়ই বন্যা হতো, মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যেত। কিন্তু ওয়াকা কবিতায় সেই ধ্বংসলীলার বর্ণনা পাওয়া ভার। সেখানে বৃষ্টি এসেছে প্রেমিকের বাণীবাহক হয়ে অথবা প্রকৃতির রূপবর্ধক হিসেবে।
‘মানইয়োশু’ থেকে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। দশম খণ্ডের ১৮৬৯ সংখ্যক পদে একজন অজ্ঞাতনামা কবি লিখছেন: “বাগানের সাকুরা কুঁড়ির ঘুম/ আজ ভাঙ্গালে বসন্তবৃষ্টির চুম।।” (ভাবানুবাদ) কিংবা বিখ্যাত কবি কাকিনোমোতোনো হিতোমারো তার প্রেয়সীর কথা মনে করে লিখছেন: “মেঘ গুরুগুরু, মেঘের ভেলা, বাদল বেলায় পাশে তুমি একেলা।” (ভাবানুবাদ: মানইয়োশু দ্বাদশ খণ্ড, পদ ২৫১৩) এখানে কবির হাহাকার আছে, একাকিত্ব আছে, কিন্তু তা এক অভিজাত নান্দনিকতায় মোড়ানো। জীবনের কদর্যতা এখানে অনুপস্থিত।
তাহলে ওয়াকা থেকে হাইকু বিবর্তনের ধারা কী? ৩১ ধ্বনির (৫-৭-৫-৭-৭) ওয়াকা থেকে ১৭ ধ্বনির (৫-৭-৫) হাইকু কীভাবে জন্ম নিল? এই রূপান্তরের ইতিহাসটি বেশ চমকপ্রদ। হেইয়ান যুগের শেষের দিকে এবং কামাকুরা যুগে জাপানি কবিদের মধ্যে একধরনের সাহিত্যিক খেলা বা আড্ডার প্রচলন শুরু হয়। এর নাম ছিল ‘রেঙ্গা’ বা ‘শৃঙ্খল কবিতা’ (লিংকড ভার্স)। এই খেলায় একাধিক কবি মিলে একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করতেন। খেলার নিয়মটি ছিল এমন- একজন কবি ওয়াকার প্রথম অংশ বা ‘কামিনোকু’ (৫-৭-৫ অংশটি) লিখতেন, আর অন্য একজন কবি তৎক্ষণাৎ এর সঙ্গে মিল রেখে বাকি অংশ বা ‘শিমোনোকু’ (৭-৭ অংশটি) পূরণ করতেন।
এই যে প্রথম অংশ বা শুরুর ৫-৭-৫, একে বলা হতো ‘হোককু’। শত শত বছর ধরে এই রেঙ্গা চর্চা চলতে থাকে। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে মাৎসুও বাশো নামের এক সন্ন্যাসী ও পরিব্রাজক কবি এই ‘হোককু’ অংশটিকে এতটাই শিল্পোত্তীর্ণ ও গভীর করে তুললেন যে, শেষের ৭-৭ অংশের আর প্রয়োজন হলো না।
বাশো এবং পরবর্তী সময়ে মাসাওকা শিকির হাত ধরে এই ‘হোককু’ বা শুরুর অংশটিই একটি স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কবিতার রূপ পেল, যার নাম হলো ‘হাইকু’। অর্থাৎ, হাইকু হলো ওয়াকার সেই জ্যেষ্ঠ সন্তান, যে বড় হয়ে বাবার ঘর ছেড়ে নিজের আলাদা সংসার পেতেছে এবং জগৎজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে।
আধুনিক জাপানে ওয়াকা বা তানকা কি হারিয়ে গেছে? একদমই না। বরং আধুনিক জাপানেও এটি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে টিকে আছে। জাপানের জাতীয় সংগীত ‘কিমি গা ইয়ো’ মূলত একটি প্রাচীন ওয়াকা। দশম শতাব্দীর একটি কবিতার ওপর ভিত্তি করে এটি রচিত, যা আজও জাপানিদের দেশপ্রেমের প্রতীক।
তাছাড়া প্রতি বছর নতুন বছরের শুরুতে জাপানের রাজপ্রাসাদে ‘উতাকাই হাজিমে’ বা ‘কবিতা পাঠের উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জাপানের সম্রাট, সম্রাজ্ঞী এবং রাজপরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকরাও তাদের রচিত তানকা পাঠ করেন। এটি জাপানের হাজার বছরের ঐতিহ্য।
জাপানি কবিতা- হোক তা হাইকু কিংবা ওয়াকা, আমাদের শেখায় কীভাবে অল্প কথায় বিশাল অনুভূতি প্রকাশ করতে হয়। ওয়াকা বা তানকা হলো জাপানি আত্মার স্পন্দন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের দুঃখ-কষ্টের মাঝেও প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং মানবিক প্রেমের অনুভূতিটুকুই শাশ্বত। ৫-৭-৫-৭-৭ এর এই গাণিতিক ছন্দে জাপানিরা হাজার বছর ধরে বুনে চলেছে তাদের সুখ, দুঃখ আর স্বপ্নের নকশিকাঁথা। নারা যুগের সেই প্রাচীন কবি থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক টোকিও শহরের কোনো তরুণ কবি, সবাই যেন একই সূত্রে গাঁথা, আর সেই সূত্রটির নাম ‘ওয়াকা’।
