৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

জাপানি কবিতা ‘হাইকু’: তিন লাইনের বিস্ময়

কীভাবে একটি ঋতু ও মুহূর্তের ছবি আঁকা হয়, সেই রহস্য উন্মোচন করে হাইকু।

মাহমুদুল কবীর মাহমুদুল কবীর

Published : 15 Nov 2025, 12:15 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:07 PM

বাঙালির রক্তে আর আবেগে কবিতা যেভাবে মিশে আছে, তার তুলনা মেলা ভার। চর্যাপদের আবছা আলো থেকে যাত্রা শুরু করে মঙ্গলকাব্যের আখ্যান, মৈমনসিংহ গীতিকার লোকজ সুর পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে বাংলা কবিতা বিশ্বসভায় নিজের আসন পাকা করেছে। আমাদের কবিতার এই দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ পথচলার পাশাপাশি বিশ্ব সাহিত্যের আঙিনায় উঁকি দেওয়াটাও এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং নিজেকে আরও ঋদ্ধ করার এক দারুণ উপায়।

চলুন, আজ কবিতার রথে চড়ে বেরিয়ে পড়ি সূর্যোদয়ের দেশ জাপান থেকে, আর পরিচিত হই তাদের সংক্ষিপ্ততম অথচ গভীরতম কাব্যধারা ‘হাইকু’-এর সঙ্গে।

কী এই হাইকু?

হাইকু সম্ভবত জাপানি কবিতার সবচেয়ে পরিচিত এবং জনপ্রিয় রূপ। একে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম কবিতার আঙ্গিকও বলা হয়। এর গঠন সরল, মাত্র তিনটি লাইন। তবে এই সারল্যের পেছনেই লুকিয়ে আছে এর গভীরতা। জাপানি ভাষায় একটি হাইকু লেখা হয় ৫-৭-৫ মাত্রার বিন্যাসে। অর্থাৎ, প্রথম লাইনে থাকে পাঁচটি মাত্রা, দ্বিতীয় লাইনে সাতটি এবং তৃতীয় লাইনে আবার পাঁচটি মাত্রা।

এখানে ‘বর্ণ’ বা ‘অক্ষর’-এর চেয়ে ‘মাত্রা’ বা ‘ধ্বনি’ শব্দটি বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ, জাপানি ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব বাংলার চেয়ে কিছুটা আলাদা। বাংলায় যেমন ‘ক’ একটি ব্যঞ্জনবর্ণের খণ্ডাংশ, জাপানিতে তেমনটা নয়। সেখানে প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণ স্বরবর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ধ্বনি বা মাত্রা তৈরি করে, যেমন- কা, কি, কু, কে, কো।

তাই হাইকুর ৫-৭-৫ কাঠামোটি মূলত এই ধ্বনির খেলা। এই কাঠামোর কারণেই জাপানে হাইকু অনেক সময় ‘গো-শিচি-গো’ (অর্থাৎ ৫-৭-৫) নামেও পরিচিত। কিন্তু কেবল ৫-৭-৫ মাত্রায় তিনটি লাইন লিখলেই কি তাকে হাইকু বলা যাবে? উত্তর হলো, না। একটি সার্থক হাইকুর পেছনে থাকে আরও কিছু শৈল্পিক নিয়ম ও দর্শন।

হাইকুর আত্মা: কী থাকে এই তিন লাইনে?

হাইকুর প্রকৃত সৌন্দর্য তার কাঠামোর চেয়েও বেশি লুকিয়ে আছে তার ভেতরের দর্শনে। এর দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:

১. ‘কিগো’ (ঋতুর ছোঁয়া)

প্রতিটি হাইকুর গভীরে একটি ঋতু বা কালের ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে। এই ইঙ্গিত সরাসরি ‘এটা গ্রীষ্মকাল’ বা ‘এখন বসন্ত’ এভাবে বলা হয় না, বরং একটি নির্দিষ্ট শব্দ বা প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, যাকে বলা হয় ‘কিগো’। যেমন, হাইকভিতে ‘সাকুরা’ ফুলের উল্লেখ থাকলে পাঠক বুঝে নেন কবিতাটি বসন্তের। ঠিক যেমন বাংলা কবিতায় কদম ফুল বর্ষার অনুষঙ্গ হয়ে আসে। তেমনি জাপানি হাইকুর কিছু চিরাচরিত কিগো হলো- শীতের জন্য ‘স্নো’ (বরফ), গ্রীষ্মের জন্য ‘জোনাকি’, শরতের জন্য ‘ঝরা পাতা’ ইত্যাদি। এই একটি শব্দই পুরো কবিতার পটভূমি তৈরি করে দেয়।

২. কিরেজি (ভাবনার যতিচিহ্ন)

হাইকুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘কিরেজি’ বা ‘ছেদ শব্দ’। এটি হলো এমন একটি শব্দ যা কবিতার মাঝে একটি অর্থপূর্ণ যতি বা ছেদ তৈরি করে। এই শব্দগুলোর আক্ষরিক কোনো অর্থ না থাকলেও এরা দুটি ভিন্ন চিত্র বা ভাবনার মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে এবং পাঠককে মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিয়ে ভাবতে সাহায্য করে। জাপানি ‘ইয়া’ বা ‘কানা’ এমনই দুটি জনপ্রিয় কিরেজি। এটি অনেকটা চিত্রকরের তুলির এক আচড়ের মতো, যা পুরো ছবিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে।

সহজ কথায়, একটি হাইকু হলো প্রকৃতির বুকে ঘটে যাওয়া একটি ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তকে মাত্র তিন লাইনে আঁকা একটি ছবি। এতে থাকে একটি ঋতুর ইঙ্গিত এবং দুটি ভাবনার সূক্ষ্ম সংযোগ।

হাইকুর জন্মকথা: হোককু থেকে হাইকু

শুনলে অবাক হতে হয়, ‘হাইকু’ শব্দটি কিন্তু খুব বেশি পুরোনো নয়। উনিশ শতকের কবি মাসাওকা শিকি (১৮৬৭-১৯০২) প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন এবং একে একটি স্বতন্ত্র কাব্যধারা হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলেন। এর আগে কি এমন কবিতা ছিল না? অবশ্যই ছিল, তবে তার নাম ছিল ভিন্ন।

হাইকুর জন্ম হয়েছিল জাপানের প্রাচীন কাব্যধারা ‘রেঙ্গা’ থেকে। রেঙ্গা ছিল এক ধরনের শিকল-কবিতা, যেখানে একাধিক কবি পালা করে একে অপরের কবিতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন পঙক্তি যোগ করতেন। এই দীর্ঘ কবিতার প্রথম তিনটি লাইন (৫-৭-৫ মাত্রার) লেখার দায়িত্ব পড়ত সবচেয়ে সম্মাননীয় কবির ওপর। এই সূচনামূলক পদটিকে বলা হতো ‘হোককু’। হোককুর কাজ ছিল পুরো কবিতার জন্য একটি ঋতু, স্থান ও মেজাজ নির্ধারণ করে দেওয়া।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, সতেরো শতকের কবি মাতসুও বাশো (১৬৪৪-১৬৯৪) এই ‘হোককু’-কে রেঙ্গা থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে চর্চা শুরু করেন। তার হাতে হোককু সাধারণ সূচনার গণ্ডি পেরিয়ে এক গভীর আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক রূপ লাভ করে। বাশাও-এর লেখা সেই বিখ্যাত হাইকুটি এখানে স্মরণ করা যেতে পারে: “ফুরুইকে ইয়া/ কাওয়াজু তোবিকোমু/ মিজু নো ওতো।” অর্থাৎ “পুরোনো পুকুর/ একটি ব্যাঙ ঝাঁপ দিল/ জলের শব্দ।”

এখানে ‘ইয়া’ হলো কিরেজি, যা একটি শান্ত, স্থির চিত্রের (পুরোনো পুকুর) পর হঠাৎ একটি গতির (ব্যাঙের ঝাঁপ) আগমন ঘটিয়ে পাঠককে চমকে দেয়। নিস্তব্ধতার মাঝে হঠাৎ বেজে ওঠা জলের শব্দ এক গভীর ধ্যানের মুহূর্ত তৈরি করে।

সুতরাং, বাশো বা তার সমসাময়িক কবিরা যা লিখতেন তা আদতে ছিল ‘হোককু’। বহু বছর পর মাসাওকা শিকি এই হোককুকে তার শিকল-কবিতার বাধ্যবাধকতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে নতুন নাম দেন ‘হাইকু’ এবং এর নিজস্ব নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠা করেন। একইসাথে তিনি ‘শাসেই’ বা ‘জীবন থেকে আঁকা’ ধারণার প্রবর্তন করেন, যা কবিকে উদ্বুদ্ধ করে চারপাশের জগৎকে নির্মোহভাবে পর্যবেক্ষণ করে তার ছবি আঁকতে।

আজ হাইকু জাপানের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। নানা ভাষায়, নানা সংস্কৃতিতে কবিরা এই তিন লাইনের জাদুতে নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করছেন। বাংলাতেও হাইকুর চর্চা নেহাত কম নয়। অনুবাদের ক্ষেত্রে বা অন্য ভাষায় লেখার সময় ৫-৭-৫ মাত্রার কাঠামো বজায় রাখা কঠিন হতে পারে, কিন্তু হাইকুর মূল দর্শন- একটি মুহূর্তকে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করে সহজ ও অনাড়ম্বরভাবে তুলে ধরা সর্বদাই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

এই ক্ষুদ্র কবিতা আমাদের শেখায়, জীবনের সবচেয়ে গভীর সৌন্দর্যগুলো আসলে সবচেয়ে সহজ আর সাধারণ মুহূর্তগুলোতেই লুকিয়ে থাকে। শুধু দেখার জন্য একজোড়া সংবেদনশীল চোখ প্রয়োজন।