২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল: শয্যা দ্বিগুণ হলেও জনবল ঘাটতি ৪০%, কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলবে কবে?

“বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হল জনবলের। কারণ এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন,” বলছেন পরিচালক ডা. খসরু।

আব্দুস সবুর লোটাস আব্দুস সবুর লোটাস

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 25 Sep 2026, 08:53 AM

Updated : 25 Sep 2026, 09:16 AM

স্নায়ু চিকিৎসার বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের শয্যা দ্বিগুণ করা হলেও মিলছে না পুরো সুবিধা।

হাসপাতালটিতে ৪০ শতাংশের বেশি জনবল ঘাটতি থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা যে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না তা মানছেন খোদ পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান খান খসরুও।

তিনি আশার বাণী শুনিয়ে বলেছেন, আগামী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে জনবল ঘাটতি পূরণ করে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া হবে।

হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা ২৭২৮। এর মধ্যে ১৬১৯ জন (৫৯.৩৫%) বর্তমানে কর্মরত আছেন।

গত ১৫ অগাস্ট হাসপাতালটিতে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগে থেকেই ৫০০ শয্যা থাকায় হাসপাতালটি এখন এক হাজার শয্যায় উন্নীত হয়েছে। এর পরও রোগীর চাপ থাকায় নতুন রোগী এসেই দিনের দিন ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।

২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যাত্রা করা হাসপাতালটিতে শুরুতে ৩০০ শয্যার সুবিধা ছিল। রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় পরে আরো ২০০ শয্যা বাড়ানো হয়।

১৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটি ঘুরে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কয়েকজন স্বজন বললেন, তারা রোগী আনার পর শয্যা পাচ্ছেন না। নতুন ভবনের বহির্বিভাগে চিকিৎসকরা সেবা দিলেও সেখানে এখনো কেউ ভর্তি হতে পারছেন না।

যশোর থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর এসেছেন মনির হোসেন। চার মাস আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। চিকিৎসা নিয়ে মোটামুটি সুস্থ হয়েছেন।

তার সঙ্গে আসা ছোট ভাই মানিক হোসেন বলেন, “দুর্ঘটনার পর ভাইয়ের অবস্থা খারাপ ছিল, চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হয়েছে।

“মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ডাক্তার দেখানোর পর দুটা রিপোর্ট করতে দিয়েছে, সেটা দিয়েছি; কিন্তু এখনো রিপোর্ট পাচ্ছি না। এর জন্য আমাদের বাইরে থাকতে হচ্ছে।”

পুরনো ও নতুন ভবন—দুটিরই টিকেট কাউন্টারে লম্বা লাইন। প্রতিটি কাউন্টারে জনা পঞ্চাশেক মানুষ দাঁড়িয়ে।

আর হাসপাতালের যেসব জায়গা ফাঁকা রয়েছে, সেসবে বিছানাপত্র নিয়ে আছেন রোগী ও স্বজনরা। আবার স্ট্রেচারে থাকা গুরুতর রোগীদের অনেকেই আছেন শয্যার অপেক্ষায়।

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নতুন ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় বহির্বিভাগে সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। চালু হয়েছে অপারেশন থিয়েটোর ও পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড। তবে এ ভবনের সাধারণ ওয়ার্ড এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এখনো চালু হয়নি।

জনবল ঘাটতি ৪০ শতাংশের বেশি

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে থেকেই চিকিৎসক ও কর্মকর্তা মিলিয়ে ২০৩টি অনুমোদিত পদ ছিল। এরপর নতুন করে আরো ৪৪৬টি পদ সৃজন করা হয়েছে। তাতে অনুমোদিত পদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৪৯-এ। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ২৮৬ জন। তার মানে চিকিৎসকদের অর্ধেকরও বেশি পদ খালি রয়েছে।

সেবা বিভাগে আগে থেকে পদ ছিল ৫২৭টি, সৃজন করা হয়েছে আরও ৩৩৭টি। সব মিলিয়ে ৮৬৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৬৭৭ জন।

আর আউটসোর্সিং কর্মীর অনুমোদিত পদ ছিল ৬৫৬টি। নতুন করে অনুমোদন হয়েছে ৫৫৯টি পদ। তাতে মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২১৫টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছে ৬৫৬টি পদ।

রোগীরা কী বলছেন

গেল ২৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার থেকে এসেছেন রশিদ হাসান। সঙ্গে মা ও ভাই রয়েছেন।

রশিদের ভাই হিমেল হাসান বলেন, “ভাইয়ের মেরুদণ্ডে টিউমার হয়েছে। অপারেশন করতে হবে, এখানে ভর্তির কথা বলা হয়েছে। তবে এখনো বেড ফাঁকা পাচ্ছি না, তাই ভর্তি করানো যাচ্ছে না। ভর্তি হওয়ার আগে অপারেশন হওয়াও সম্ভব নয়।

“বেড ফাঁকা হলে হাসপাতাল থেকে নাকি কল দেবে। তবে আমরা নিজেরাও চেষ্টা করছি বেডের জন্য।”

ছয় দিন ধরে হাসপাতালের পাশে একটি বাসায় ভাড়ায় রয়েছেন চাঁন মিয়ার পরিবার। তার মেরুদণ্ডের হার ক্ষয় হয়েছে, দাঁড়াতে পারছেন না।

চাঁন মিয়ার বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা কিছু পরীক্ষা রংপুরে করিয়েছিলাম। সেগুলাসহ গত শনিবার এখানে ডাক্তার দেখাইছি। আরো দুটো টেস্ট করানো হয়েছে, একটা ফলাফল পাইছি; সেটা দেখাতে আজ আসছি।

“রোগী উঠে দাঁড়াতে পারছে না, স্ট্রেচারে করে নিয়ে আসতে হয়। তার পরও এখানে ভর্তি নিচ্ছে না। শুনলাম, সিট ফাঁকা নেই। এভাবে আমাদের হাসপাতালে আসতে হয় ডাক্তার দেখাতে; আর থাকতে হচ্ছে বাইরে।’’

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের একমাত্র ‘পূর্ণাঙ্গ’ নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালকে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হলেও সময়ের সঙ্গে রোগীর চাপও বেড়েছে। এখন প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগী সেবা নিতে এখানে আসছেন। বেশির ভাগ রোগীই আসছেন জটিল ও গুরুতর সমস্যা নিয়ে। তবে চাহিদা অনুসারে শয্যা না থাকায় বাইরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে।

নেই পলিট্রমা ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে ‘পূর্ণাঙ্গ’ নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল বলা হলেও পলিট্রমা ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা নেই। ফলে জনবলের ঘাটতি কারণে যেমন রোগীরা সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনই একাধিক অঙ্গের জটিলতায় এক ছাদের নিচে সব চিকিৎসাও মিলছে না। ফলে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে ছোটাছুটি করতে গলদঘর্ম ছুটছে স্বজনদের।

এ বিষয়ে হাসপাতালের অ্যানেস্থেশিয়া, নিউরো ট্রমা ও নিউরো ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসিফ-উর-রহমান বলেন, “দেশের সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল রোগীদের এই হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু পলিট্রমা ম্যানেজমেন্টের জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল নেই। যার ফলে অনেক রোগীর ভিন্ন হাসপাতালেও হয়।”

কোনো রোগীর একাধিক অঙ্গ গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হলে, তার সমন্বিত চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনাই পলিট্রমা ম্যানেজমেন্ট নামে পরিচিত। যেমন সড়ক দুর্ঘটনায় একজন ব্যক্তির মাথায় আঘাত, বুকের হাড় ভাঙা, ফুসফুসে ক্ষতি এবং পা ভেঙে গেল; এ ধরনের পরিস্থিতিতে সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

ডা. আসিফ-উর-রহমান বলেন, “অনেক সড়ক দুর্ঘটনায় রোগীদের শুধু মাথা নয়, শরীরের একাধিক অঙ্গের ক্ষতি হয়। তবে শুধু মাথায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় এখানে।

“যদি এই হাসপাতালে আরও কিছু বিশেষজ্ঞের একটা টিম থাকত, তাহলে একসঙ্গে পলিট্রমা ম্যানেজমেন্ট করা যেত।”

যা বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও আবাসিক চিকিৎসক মাজহারুল ইসলাম বললেন, “দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল এটি, তাই প্রচুর রোগী আসে।

“এখন সব জনবল না থাকায় পূর্ণাঙ্গ সেবায় আমরা যেতে পারছি না। খুব দ্রুতই এখান থেকে সাধারণ মানুষরা উন্নত বিশ্বের হাসপাতালের মতো সেবা পাবে।”

আগামী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে এই হাসপাতাল থেকে পূর্ণাঙ্গ সেবা মিলবে বলে আশার কথা শোনালেন পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান খান খসরু।

তিনি বলেন, “বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হল জনবলের। কারণ এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন।”

ডা. খসরু বলেন, “আমরা চাইলেই দেশের অন্যান্য হাসপাতাল থেকে একজন ডাক্তারকে নিয়ে আসতে পারি না। কারণ সেখানে তার প্রয়োজন আছে।

“আরো কিছু প্রথম শ্রেণির কর্তকর্তা প্রয়োজন যা মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর থেকে নিয়োগ হয়। এছাড়া ল্যাব, আইসিইউ পরিচালনার জন্য টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন।’’

পরিচালক অধ্যাপক খসরু বলেন, “আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে চিকিৎসক নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে আউটসোর্সিংয়ে জনবল নেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে। আগামী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে সব ধরনের সুফল পাবে রোগীরা।”