০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

বেসরকারি হাসপাতালের সেবা কিনবে সরকার, কতটা সুফল মিলবে?

ঢাকার জনসংখ্যা বিবেচনায় আরও কয়েকটি বড় বড় হাসপাতাল করার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. বেনজির আহমেদ।

বেসরকারি হাসপাতালের সেবা কিনবে সরকার, কতটা সুফল মিলবে?

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।

আব্দুস সবুর লোটাস আব্দুস সবুর লোটাস

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Oct 2026, 01:14 AM

Updated : 07 Oct 2026, 01:14 AM

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামলাতে বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, এতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার উন্নয়ন এবং তুলনামূলক ভালো সেবা পাবে রোগীরা।

কীসের ভিত্তিতে রোগীদের সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে? এমন প্রশ্ন ওঠেছে।

পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ-পিপিপির আওতায় এমন প্রকল্পে সুফল মিলবে কিনা, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কারো কারো সংশয় রয়েছে।

তারা বলছেন, এসব প্রকল্প দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের জন্য হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন ‘বিপরীত’ উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

এ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রান্তি মানুষের জন্য কোনো উদ্যোগ যদি নিতে হয়, তাহলে তা গোড়া থেকে শুরু না করলে কার্যকর হবে না।

রোববার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সংবাদমাধ্যমে বলেন, “প্রাইভেট হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগী কম। তাই সরকারি হাসপাতাল থেকে সেখানে রোগী পাঠানো হলে চাপ অনেকটা কমবে।”

Image

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে রোগী ও স্বজনদের ভিড়। ফাইল ছবি

মন্ত্রী বলেছেন, দ্রুত চুক্তি হবে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হলেন অধ্যাপক মো. নাজমুল হোসেন বলেন, “আমরা বিভিন্ন বিষয় চিন্তা করে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় রাজধানীর সরকারি বড় হাসপাতাল থেকে তিনটি প্রাইভেট হাসপাতালের সেবা কেনার খসড়া একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটির পিছনে কিছু কারণ রয়েছে।

“দেশের প্রাইভেট হাসপাতালে ছাত্রের তুলনায় পাঁচগুণ শয্যা এবং সেখানে ৭০ শতাংশের মতো রোগী থাকার কথা। কিন্তু বেশির ভাগ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালে তেমন রোগী থাকে না। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে সিঁড়ি, বারাদ্দাসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করে রোগী চিকিৎসা নেন।”

তিনি বলেন, “এই অবস্থায় সরকারি মেডিকেল থেকে কিছু রোগীকে যদি প্রাইভেট হাসপাতালে সরকারির প্রতিষ্ঠানের মতো খরচে পাঠানো যায়, তাহলে রোগী সেবা যেমন ভালো পাবেন তেমন বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা অনুশীলনে বেশি রোগী দেখার সুযোগ পাবেন। যা মেডিকেল শিক্ষা এবং সেবার জন্য ভালো কিছু হবে।”

কী ধরনের সেবা পাবে এমন বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, “আমরা চিন্তা করেছি যেসব রোগী রেফারেন্সে পাঠালে সেখানে শিক্ষার্থীদের সুবিধা হবে, তেমন রোগী পাঠানো হবে।”

রোগী পাঠানোর ক্ষেত্রে অনিয়ম রোধে সফটওয়্যার ব্যবহারের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “রোগী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম এবং জালিয়াতি না হয়। কারণ করোনার ভাইরাস মহামারীর সময়ে আমাদের একটা মন্দ অভিজ্ঞতা রয়েছে।”

আপাতত ঢাকার তিনটি হাসপাতাল নিয়ে সরকার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চিন্তা করছে জানালেও হাসপাতালগুলোর নাম তিনি বলেননি।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেক জন কর্মকর্তা বলেছেন, চারটি হাসপাতালের সঙ্গে সরকার চুক্তি করতে যাচ্ছে। এসব হাসপাতাল হল-তেজগাঁওয়ের শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এবং ইমপালস হাসপাতাল, গুলশানের শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ২ হাজার ৬০০ শয্যার জায়গায় চার হাজারের বেশি রোগী বেশির ভাগ সময় থাকে। এছাড়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ হাজার ৩৫০ শয্যা হলেও তিন হাজারের বেশি রোগী বিভিন্ন জায়গায় ভর্তি থাকে।

অতিরিক্ত বেশির ভাগ রোগী বারান্দা, সিঁড়ি, করিডরসহ হাসপাতালের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় শয্যা পেতে চিকিৎসা নেন, বলেন তারা।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন বিভাগীয় প্রধান নাম প্রকাশ না করে বলেন, “অনেক দিন ধরে এই ধরনের প্রকল্পের কথা শুনছিলাম। সেটা এবার বাস্তবায়ন হচ্ছে, এটির মাধ্যমে রোগীরা খুব বেশি লাভবান হবেন। বাকিটা পাইলটিং করার পর নীতিমালা চূড়ান্ত করা যাবে।”

হাসপাতালটির পরিচালক ডা. মীর্জা গোলাম সারোয়ার বলেন, “এটি খুবই ভালো এটি প্রকল্প। স্বাস্থ্য খাতে বেশ ইতিবাচক হবে। কারণ সরকারি হাসপাতালে প্রচুর রোগীর চাপ। তবে এটা কেবল পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হচ্ছে। এটির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা যাবে, সেগুলো ঠিক করে সুন্দর নীতিমালা তৈরি করা গেলে সবার জন্য ভালো হবে।”

Image

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি ওয়ার্ড। ফাইল ছবি

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

রাজধানী ঢাকার চেয়ে দেশের প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলের মানুষদের সেবা দিতে যেসব বেসরকারি সংস্থা-এনজিওর স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কাজ করে তাদের সঙ্গে চুক্তির কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

এছাড়া এমন কিছু করতে হলে গোড়া থেকে শুরু করার কথাও বলেছেন তারা। অর্থাৎ প্রান্তিক পর্যায়ে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পর্যাপ্ত নয়, সেখানে নতুন হাসপাতাল বা সেবা সুবিধা বাড়ানোর কথা বলছেন তারা।

কেউ কেউ বলছেন, এমন ‘জগাখিচুড়িভাবে’ প্রকল্প করলে, তাতে সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এ ধরনের সেবা রাজধানীর অভিজাত শ্রেণির মানুষের তুলনায় দেশের প্রন্তিক-দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

“কিন্তু সরকার দেশের অভিজাত শ্রেণির মানুষের সুযোগের চিন্তা করছে, সাধারণ বা শ্রমজীবী মানুষের কথা চিন্তা করছে না। সেটি করা হলে গার্মেন্ট শ্রমিকদের এলাকা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জে এমন কিছু করার চিন্তা করা হতো, সেটি করছে না।”

এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হবে না বলে মনে করছেন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ।

তিনি বলেন, “ঢাকা মেডিকেলের যে পরিমাণ শয্যা, তার খুব কম সংখ্যক শয্যা রয়েছে এসব মেডিকেল কলেজে। তাই সেখানে রোগীদের সেবা প্রাপ্তির হার খুবই কম হবে। আর এসব জায়গায় কীভাবে বা কীসের ভিত্তিতে রোগীদের রেফার করা হবে?”

তার ভাষায়, ‘জগাখিচুড়ি’ তৈরির চেয়ে উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া ভালো।

ডা. বেনজির বলেন, “দেশের উপজেলা পর্যায়ে সরকার যে শয্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে এটা ভালো। কারণ এতে যদি রোগীরা উপজেলা পর্যায়ে তাদের সেবা পেয়ে যান, তাহলে আর তারা শহরে আসবে না। তাই উপজেলা পর্যায়ে মানুষের চাহিদা অনুসারে সেবা প্রাপ্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।”

এমন পরিকল্পনা নিতে হলে সেটা গোড়া থেকে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “এমন কিছু করা হলে সরকারি এবং প্রাইভেট ফান্ডের মাধ্যমে নতুন স্বাস্থ্য কেন্দ্র তৈরি করা উচিত, যেখানে অল্প টাকায় সব রোগী সেবা পাবেন।”

এসব উদ্যোগের ফলে অনিয়ম, দুর্নীতি আরও বাড়বে বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

তবে নতুন হাসপাতাল তৈরির চেয়ে এ প্রকল্পের মাধ্যমে কম টাকায় রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা যাবে বলে তুলে ধরেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন।

তার মতে, একটা হাসপাতাল তৈরি করতে অন্তত তিন বছর সময় লাগে। আর ১০০ শয্যার হাসপাতাল নতুন করে তৈরি করতে গেলে সেটার খরচ ৫০ কোটি টাকার বেশি হয়। এদিকে শয্যা অনুসারে এক হাজার করে ভর্তুকি দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ব্যবহার করা যাবে। এতে সরকারের অনেক সাশ্রয় হবে।

স্বাস্থ্য শিক্ষার ক্ষেত্রে সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. বেনজির বলেন, “এই চিন্তা করেই যদি রোগী রেফার করা হয় তাহলে কেন সেটাকে সেবার পার্টনারশিপ বলা হচ্ছে। যে কারণ রোগী পাঠানো হচ্ছে সেটাই বলা উচিত। আর ঢাকার জনসংখ্যা বিবেচনায় আরও কয়েকটি বড় বড় হাসপাতাল তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।