‘দ্রুতই স্বাভাবিক’ হওয়ার আশায় রাড্ডা
“বর্তমানে কিছু কাজ হচ্ছে। আশা করি দ্রুতই আমরা সব সেবা চালু করতে পারব,” বলেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার।
‘‘রাড্ডা ভাঙার কথা শুনে মন খারাপ লাগছিল। কিন্তু গতকাল রাতে শুনলাম, টিকাদান চালু রয়েছে; তাই আজ দুপুরে আসছি। কিন্তু আসার পর রাড্ডার দৃশ্য দেখে ভালো লাগেনি। সব কিছু ভাঙাচোরা, দেখতে কেমন জানি লাগতেছে।’’
সোমবার নিজের সন্তানকে টিকা দিতে নিয়ে এসে এসব বলছিলেন আসমা বেগম।
তিনি মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডের বাসিন্দা। এর আগেও তিনি এখানে সেবা নিয়েছেন বলে জানান।
বর্তমানে এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে টিকা কার্যক্রম চলমান থাকলেও প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ রয়েছে।
এখানকার স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাষ্য, এই সেন্টার থেকে প্রতিদিন তিন শতাধিক নারী বিভিন্ন ধরনের সেবা নিতেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর শুধু টিকাদান চালু করা সম্ভব হয়েছে।
সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের একটি কক্ষে হাম-রুবেলার বিশেষ ক্যাম্পেইনের টিকা কার্যক্রম চলছে। তবে অন্যান্য ঘরে স্বাস্থ্যকর্মীরা বসে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছেন। বাইরের ভাঙা জিনিসপত্র সরানো হয়েছে।
পেছনের অংশে গিয়ে দেখা যায়, এক্সকাভেটর দিয়ে দেয়াল ভাঙার ইট, ঢালাইয়ের বড় অংশসহ বিভিন্ন কিছু সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিদ্যুতের সংযোগ ঠিক করার প্রস্তুতিও চোখে পড়ে।
যেসব সেবা এখনও বন্ধ
রাড্ডা সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, প্রতিদিন এই সেন্টার থেকে তিন শতাধিক মানুষ নানা ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নিতেন। তবে ভাঙচুরের পর শুধু টিকাদান কার্যক্রম চালু করা গেছে।
কার্যালয়ের অবস্থা ঠিকঠাক হলে পরিবার পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সব ধরনের সরঞ্জাম সরবরাহের আশ্বাস পাওয়ার কথা তুলে ধরেন নাসরিন।
তিনি বলেন, “এখানে মূলত গর্ভবতী নারীদের কম খরচে আলট্রাসাউন্ডসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ ছিল। সব কিছু ভেঙে ফেলায় কিছুই মিলছে না।”
তিনি বলেন, “আজ দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৪৭ শিশুকে টিকা দেওয়া গেছে। সব স্বাভাবিক থাকলে এই সংখ্যা আরও কয়েক গুণ হতো।
‘‘এখন কোনো প্রাইভেসি নেই; জন্মনিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম নেই; নিরাপত্তার বিষয়ে ঝামেলা চলছে। নানা কারণে নারীরা সেবা নিতে আসতে পারছেন না।”
এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা আরেক গৃহিণী আঞ্জুমান বেগম বলেন, ‘‘আমার বড় ছেলেকে এখান থেকে আরও পাঁচ বছর আগে টিকা দিয়েছিলাম। এখন ছোট মেয়েকে নিয়ে আসছি। আগে থেকেই এই কেন্দ্রের নাম সবার কাছে পরিচিত ছিল। কিন্তু এটার ভাঙার খবরে খুবই খারাপ লেগেছে।”
তিনি বলেন, “এটা কার জমি বা কী— এসব কিছু জানি না। কিন্তু এখান থেকে যেহেতু অনেক মানুষ সেবা নেয়, তাই যারা সেবা দেয়, তাদের জন্যই জমি দেওয়া হোক। নারীদের সেবা বাদ দিয়ে দোকানপাট হোক, এমন কিছু চাই না।’’
মেরামতের কাজ চলছে
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ঘুরে দেখা যায়, ঘরের ভেতরের সব কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। ইপিআই কক্ষে ফ্যান লাগানোর জন্য নিয়ে আসা হয়েছে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। এছাড়া কেন্দ্রের সব কক্ষ থেকে ভাঙচুর হওয়া জিনিসপত্র সরানো হয়েছে।
আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সব কিছু স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রের পরিচালক।
নাসরিন আখতার বলেন, ‘‘গতকাল যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এসে এখানে সব কিছু সাত দিনের মধ্যে স্বাভাবিক করার আশ্বাস দিয়েছেন। বর্তমানে কিছু কাজ হচ্ছে। আশা করি দ্রুতই আমরা সব সেবা চালু করতে পারব।”
মিরপুর থানা পরিবার পরিকল্পনার প্রধান কর্মকর্তা শাহিনুজ্জামান শিশির বলেন, “আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এখানকার অবস্থা জানিয়েছি। কেন্দ্রের সব কিছু স্বাভাবিক হলেই আমরা আগের মতো সব কিছু সরবরাহ করব।”
কাজের তদারকি করছেন বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক (দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত) এ বি এম এ রাজ্জাকও আছেন।
তিনি বলেন, “আমাদের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এখানে মেরামত এবং সংস্কার কাজ চলছে। বিদ্যুতের লাইন চালু হয়েছে। ফ্যান নিয়ে আসা হয়েছে। কালই দেখবেন অনেক কিছু স্বাভাবিক হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রটি আগের মতো অবস্থায় চলে যাবে।’’
জমির বিরোধ নিয়ে রিট আবেদন করেছিল রাড্ডা
২০২২ সালে রাড্ডা সেন্টারের জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ জানার পর আদালতে রিট করেছিলেন বলে জানান সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার। তবে সেটির সমাধানের আগেই সেন্টারটি বৃহস্পতিবার ভাঙচুর করা হয়।
তিনি বলেন, “২০২২ সালে সেন্টারের ১০ কাঠা জমি নিয়ে সমমনা সমবায় সমিতি এবং একটি গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্বের কথা শুনছিলাম। এটা শুনেই আমরা আদালতে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে রিট আবেদন করি। সেটার কোনো ফয়সালা আদালত দেননি।”
তিনি বলেন, “রাড্ডা ১৯৭৬ সালে সেবা দেওয়া শুরু করে। পরে ১৯৮৩ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যসেবা চালানোর বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো আপত্তি থাকবে না বলে সিদ্ধান্ত দেয়। তারপর থেকে আমরা নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছি। কিন্তু হঠাৎ করে এক দল এসে হামলা চালিয়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়।”
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ের একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। হামলাকারীরা জমিটির সামনে ‘সমমনা দোকানদার সমিতির’ সাইনবোর্ড বসিয়ে চলে যায়।
প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, হামলার সময় তাদের অফিসের সামগ্রীসহ টিকাদানের প্রচুর সামগ্রী লুটপাট হয়েছে।
এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় একটি মামলা করেন রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার। তাতে স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফসহ ২০০-২৫০ জনকে আসামি করা হয়।
আরও পড়ুন
গুঁড়িয়ে দেওয়া ভবনের সামনে ত্রিপল টাঙিয়ে চলছে রাড্ডার টিকাদান
রাড্ডার স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিতে ওসির ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ ছিল?
