গুঁড়িয়ে দেওয়া ভবনের সামনে ত্রিপল টাঙিয়ে চলছে রাড্ডার টিকাদান
অস্থায়ী ব্যবস্থাতেই দিনভর অন্তত ৪০ শিশুকে টিকাদানসহ অর্ধশতাধিক জনকে সেবা দিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা।
“আমি যখন ছোট ছিলাম, এখানে টিকা দেওয়া হইছে। আমার ভাই-বোন সবাইকেই এখানে টিকা দিছে। আমার ছেলে-মেয়েকে এখানে টিকা দিছি। এখন নাতিপুতি যারা হইছে, তাদেরও এইখানে নিয়া আইতাছি।”
ঢাকার মিরপুর-১ নম্বরে বৃহস্পতিবার মধ্য রাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন স্থানীয় বাসীন্দা নারগিস আক্তার। রোববার নিজের মেয়েকে নিয়ে নাতনিকে টিকা দেওয়ার জন্য ভেঙে ফেলা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটিতে এসেছিলেন তিনি।
ভাঙচুর ও লুটপাটে কিছুই অবশিষ্ট না থাকা প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা এ দিন ভাঙা ভবনের সামনেই ত্রিপল টাঙিয়ে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসেছিলেন স্বাস্থ্যসেবা পরামর্শ ও টিকাদান কার্যক্রমে। অন্যান্য দিনের মত রোববারও সেখানে ছিল স্থানীয় নিম্ন ও মধ্যবিক্ত মানুষের ভিড়।
নারগিস আক্তার বলেন, “টিকা দেওয়ার তো একটা তারিখ থাকে। এইখানে প্রথম থেইকা টিকা দিছি। এখন এইখানেই নিয়া আসছি। বাইরে হইলেও টিকা দিতেছে। যদি তারা টিকা না দিত তাইলে আমরা কই যাইতাম?”
মিরপুর ১ নম্বরে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, যা সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ৫০ বছর ধরে গরিব, অসহায় মা ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে বলে প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ের একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। হামলাকারীরা জমিটির সামনে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লি.’ এর সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়ে চলে যান।
প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, হামলার সময় তাদের অফিসের সামগ্রীসহ টিকাদানের প্রচুর সামগ্রী লুটপাট হয়েছে। এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় একটি মামলা করেন রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার। মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফসহ ২০০/২৫০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার বিবরণে বলা হয়, হাতুড়, লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন এক দল লোক। তারা নৈশপ্রহরী আন্দ্রিয় সরকার ও মো. আব্দুল হাইকে মারধর করে বেঁধে রাখেন। তারা এক্সকেভেটর নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে একটি সেমিপাকা ঘর, পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার আরেকটি সেমিপাকা ঘর এবং ক্লিনিক ইনচার্জ, চিকিৎসক ও ডেপুটি ক্লিনিক ইনচার্জের সেমিপাকা ঘর ভাঙচুর করেন।
এসব ঘরে থাকা আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করা হয়। আল্ট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও ল্যাবরেটরি কক্ষের দরজা-জানালা ভাঙচুর করা হয়। বিভিন্ন ওষুধ ও সামগ্রী, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি ও স্টিলের আলমারি নিয়ে যান। নৈশপ্রহরীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে সেখানে সমবায় সমিতির ব্যানার ও সাইনবোর্ড লাগিয়ে যান হামলাকারীরা।
ভবন ভাঙা থাকলেও গত শনিবার অস্থায়ীভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করে রাড্ডা কর্তৃপক্ষ। রোববার সকাল থেকে চেয়ার টেবিল নিয়ে ও ব্যানার টাঙিয়ে দ্বিতীয় দিনের মত প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম শুরু করে।
রাড্ডার স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাষ্য, অস্থায়ী ব্যবস্থাতেই রোববার দিনভর অন্তত ৪০ শিশুকে টিকাদানসহ অন্যান্য সেবা মিলিয়ে অর্ধশতাধিক জনকে সেবা দিয়েছেন তারা। স্বাভাবিক দিনে গড়ে এই কেন্দ্র থেকে সেবা দেওয়া হত প্রায় দেড়শ জনকে।
রোববার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সীমিত পরিসরের সেবা নিতে আসা অনেকেই শিশুকে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। তবে প্রত্যেকেই অপেক্ষা করে সেবা নিয়ে ফিরেছেন।
প্রায় দুইঘণ্টা অপেক্ষার পর নাতনীকে টিকা দেওয়া নারগিস আক্তার বলেন, “আমরা সবাই চাই রাড্ডা এই এলাকায় থাকুক। এইটার কারণে আমাগো অনেক সুবিধা হইছে। এইটা বন্ধ হইলে আমাগো মত গরীব মানুষরা কই যাইব?”
শিশুপুত্রকে টিকা দিতে নিয়ে এসেছিলেন এক রিকশাচালক। তিনি বলেন, “আজকে আইছি, এর আগেও দিছি। আমার টিকাও এহানে হইছে, এহন বাচ্চারে নিয়া আইছি।”
রাড্ডা কর্মীরা বলছেন, টিকাদানের পাশাপাশি সেন্টারটিতে মা ও শিশুদের নানা সেবা দেওয়া হত। গর্ভবতী নারীদের কম খরচে আল্ট্রাসনোগ্রাম, বিভিন্ন পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ ছিল। তবে গত দুদিন ধরে টিকাদান আর প্রাথমিক কিছু পরামর্শ বাদে সব সেবাই বন্ধ রয়েছে।
ফারজানা নামে এক স্বাস্থ্যসেবাকর্মী বলেন, “এখানে শিশুদের কার্ড পূরণ করে টিকা দেওয়া হত। শিশুর ওজন ও উচ্চতা মাপা, পুষ্টি পরামর্শ দেওয়া হত। সন্তান জন্মের পর মায়েদেরও বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়। পরিবার পরিকল্পনা ও প্রসবপরবর্তী সেবাও দেওয়া হত। এখন এসব সেবা দেওয়া যাচ্ছে না।”
প্রতিষ্ঠানটির কমিউনিটি হেলথের পরিচালক ইকবাল জিল্লুল মজিদ সেখানে ৩৭ বছর ধরে কর্মরত। তার ভাষ্য, “সরকার আমাদেরকে কাজ করতে দিয়েছে। সরকার আমাদেরকে বললে আমরা চলে যাব। কিন্তু রাতের আঁধারে এই ধরণের ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।”
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বৃহস্পতিবারের হামলাকে ‘বর্বরোচিত’ মন্তব্য করে বলেন, “আমাদের যত সরঞ্জামাদি ছিল, সমস্ত কিছু তারা লুট করেছে। এমনকি টিকার যে রেজিস্ট্রার, ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের যে সেবাগুলো দীর্ঘমেয়াদি দেওয়া হয়, সবগুলোর রেজিস্ট্রার ধ্বংস করে দিয়েছে।
“আপনারা দেখেছেন সাইনবোর্ড আছে, কারা এই কাজটা করেছে। আমরা সরকারের উপর আস্থা রাখতে চাই। যারা ধরা পড়েছে এবং তাদের যারা ইন্ধনদাতা তাদেরকেও আশা করছি সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে বের করে যথাযথ শাস্তির আওতায় আনবে।”
অস্থায়ীভাবেই কেন্দ্রটিতে পূর্বঘোষিত হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন অব্যাহত রাখার কথাও বলেছেন তিনি।
গ্রেপ্তার ১০ জন কারাগারে
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান থেকে লুট হওয়া দুই ট্রাক মালামাল জব্দের কথাও বলেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তাররা হলেন- শাহাদাত হোসেন, কাজী মকবুল হোসেন, শাহ আলম, আতিকুর রহমান, কামরুল ইসলাম, শাকিল, সোহেল, জুয়েল, জিহাদ হাসান ও রাব্বি। তাদের সবাইকে শনি ও রোববার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। যদিও তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে কিনা সে তথ্য দেয়নি পুলিশ।
পুলিশের দারুসসালাম জোনের সহকারী কমিশনার জাকির হোসেন বলেন, “বিষয়টি তদন্ত পর্যায়েই রয়েছে, এখনো বিস্তারিত কিছু বলার সময় আসেনি।”
