বিএমইউতে ভবন থেকে পড়ে কিশোরীর মৃত্যু: ‘গ্রিল থাকলে মেয়েটা মরত না’
‘‘এ ভবন সেই শুরু থেকে এভাবে তৈরি, তাই গ্রিল নেই,’’ বলেন সহকারী পরিচালক আজিজুর রহমান।
রোববার দুপুর ১২টা, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) অষ্টম তলার ব্লু ইউনিট। ছয় নম্বর শয্যার জানালা খানিকটা খোলা, বাতাসে পর্দা নড়ছিল।
এই ওয়ার্ডের অন্য সব শয্যায় রোগী আছে, কেবল জানালার পাশের এ শয্যা ছাড়া।
ফাঁকা ছিল না; শনিবার দুপুর পর্যন্ত এখানেও রোগী ছিল। দুপুরে জানালা দিয়ে পড়ে সামিয়া নুর নামে ১৫ বছরের এক কিশোরীর মৃত্যুর পর শয্যাটিতে আর কেউ ওঠেনি।
সামিয়ার বাবা নুরুন্নবী বলেন, ‘‘এত বড় হাসপাতাল, সেখানে নিরাপত্তার জন্য কোনো গ্রিল নেই। জানালার সঙ্গেই শয্যাটি লাগানো।
‘‘যেকোনো স্বাভাবিক মানুষ এত উঁচু থেকে নিচে তাকালে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। সেখানে আমার বাচ্চা মেয়ে অসাবধানতায় নিচে তাকিয়ে পড়ে গেছে। গ্রিল থাকলে মেয়েটা মারা যেত না।”
বিএমইউ হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়ে নুরুন্নবী বলেন, ‘‘মেয়ে পড়ে যাওয়ার পর হাসপাতালটি তাকে বোঝা মনে করেছে তাই দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে রেফার করেছে। সেখানে নিয়ে যাওয়ার একটু পর চিকিৎসকরা মারা গেছে বলে জানায়।’’
বিএমইউ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, এই হাসপাতালের ‘সি’ ব্লকের ভবনের কোনো তলার জানালায় গ্রিল নেই, শুধু গ্লাস লাগানো আছে।
ব্লু ওয়ার্ডের ছয় নম্বর শয্যাটি জানালার সমান্তরালভাবে রাখা ছিল। জানালার গ্লাস থেকে শয্যার কোনো দূরত্ব ছিল না।
কী ঘটেছিল শনিবার
নিহত সামিয়ার বাবা নুরুন্নবী বলেন, ‘‘আমার স্ত্রীর টিউমারের চিকিৎসায় ১৭ তারিখ এই হাসপাতালে এসেছিলাম। ২৮ তারিখ অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। তাই অপারেশনের আগে অষ্টম তলার ওই ওয়ার্ডের ছয় নম্বর শয্যায় সামিয়ার মা ভর্তি ছিল।
তিনি বলেন, ‘‘শনিবার দুপুরে মেয়ে বাইরে থেকে এসে ভাত চায়। ভাত খেয়ে ওই শয্যায় বসে। এরপর শয্যার ওপর দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ফলে নিচে পড়ে যায়। তার মা শয্যার নিচে বসেছিল। একটু পরই হঠাৎ করে নিচে পড়ে যায়। কারণ শয্যা আর জানালার দূরত্ব ছিল না।’’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ডে কেউ নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি।
পাশের ৭ নম্বর শয্যার রোগী বলেন, ‘‘আমি ঘুমের আগে মা-মেয়েকে শয্যার ওখানে দেখেছি। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে চিৎকারের আওয়াজ শুনে উঠে শুনি জানালা দিয়ে মেয়ে পড়ে গেছে। এর বাইরে কিছু জানি না।’’ একই ধরনের কথা একাধিক রোগী বলেছে।
এদিকে জানালার ছবি তোলার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সরা এসে বাধা দেন। জানালার পাশে বেড রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে একজন বলেন, ‘‘পাশে ওয়াশরুমে গেট থাকায় এই একটা শয্যা এভাবে রাখা হয়েছে। এটি খাড়াভাবে বা অন্য শয্যার মতো করে রাখলে ওয়াশরুমে যেতে অসুবিধা হবে।’’
ওই সময় দায়িত্বে কোন কোন নার্স ছিলেন জানতে চাইলে দুজন নার্স থাকার কথা স্বীকার করেন। তবে তারা নিজেদের নাম প্রকাশ করেননি।
এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. ইরতেকা রহমান ও অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন) ডা. হাসনাত আহসান।
‘সি’ ব্লকের দায়িত্বে থাকা হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আবুনূর মো. মাসুদের দপ্তরে দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও দেখা হয়নি। ফোন করলে ‘মিটিংয়ে ব্যস্ত আছি’ বলে জানান।
জানালায় গ্রিল না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমইউর সহকারী পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, ‘‘এই ভবন সেই শুরু থেকে এভাবে তৈরি, তাই গ্রিল নেই।’’
এদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘‘বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে অবশ্যই গ্রিল থাকতে হবে। এটি একটি ভবনের মূল নিরাপত্তার বিষয়ে কাজ করে।’’
‘‘তবে বর্তমানে আধুনিক নকশাকার নামে নিরাপত্তার চেয়ে সৌন্দর্যের প্রাধান্য দিয়ে গ্রিল ছাড়া শুধু কাঁচের দরজা-জানালা দেওয়া হচ্ছে। এটি নিরাপত্তাসহ অগ্নিকাণ্ডের মতো সময়েও ঝুঁকিপূর্ণ।’’
তিনি যোগ করে বলেন, ‘‘দেশের বিভিন্ন খাতের যখন ভবন নির্মাণের অনুমোদন হয় তখন এসব বিষয় খেয়াল করা জরুরি।’’
যে কারণে বিএমইউ থেকে ঢামেকে নেওয়া হয় কিশোরীকে
দুপুর আড়াইটায় সামিয়া ৮ তলা থেকে পড়ে যাওয়ার পর তাকে প্রথমে বিএমইউ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থা খারাপ হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাজধানীর অন্যতম বড় হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা না থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন মেয়ের বাবা এবং বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল এ ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী একজন নার্স নাম প্রকাশ না করে বলেন, মেয়েটি পড়ে যাওয়ার পর তার অবস্থা খারাপ হয়। ঘাড় ভেঙে যায়, শরীরের ভেতরে অনেক ব্লিডিং হয়। এছাড়া হাই ফ্লো অক্সিজেন দিয়ে কাজ হচ্ছিল না তাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
মেয়ের বাবা নুরুন্নবী বলেন, ‘‘আমার মেয়েকে এখানে বোঝা হিসেবে দেখেছে। তারা চিকিৎসা না দিয়েই ঢাকা মেডিকেলে রেফার করেছে। শুনেছি, মেয়ের ঘাড়, হাত ভেঙে গেছিল। আরও কিছু অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কথাও শুনেছি।’’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘দেশের সব হাসপাতালের ভালো জরুরি বিভাগ থাকা প্রয়োজন। সেই হিসেবে বিএমইউর মতো ভালো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আরও বেশি সক্ষমতা থাকার প্রয়োজন ছিল। আগে বিএমইউতে জরুরি বিভাগ ছিল না, নতুন হয়েছে তাই হয়তো এত গুরুতর রোগী সামলানোর মতো সক্ষমতা ছিল না।’’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমইউর সহকারী পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, ‘‘কেন সেই মেয়েটিকে এখান থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে সেটা বলতে পারছি না। এসব বিষয়ে নিয়ে কথাও বলতে চাই না।’’
