Published : 13 Sep 2026, 10:25 PM
লালনসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পেরিয়ে গেল নীরবে-নিভৃতে।
গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর এই সংগীতশিল্পীকে হারিয়েছিল দেশের সংগীতাঙ্গন।
তার প্রয়াণের এক বছর ঘিরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বড় পরিসরে কোনো স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়নি, এই নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন তার স্বামী ও বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিম।
তবে তাদের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান অচিন পাখি থেকে স্বল্প পরিসরে স্মরণ করা হয়েছে শিল্পীকে।
রোববার সন্ধ্যায় ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশনের ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’তে আয়োজন করা হয় এ স্মরণ অনুষ্ঠান।
গাজী আবদুল হাকিম বলেন, “অচিন পাখিতে কার্যক্রম চলছে। কোরআন খতম হয়েছে, দোয়া, স্মরণসহ আরও কিছু আয়োজন হয়েছে। কুষ্টিয়াতেও হয়েছে। কয়েক দিন আগে আমি কুষ্টিয়ায় লালনের আখড়ায় গিয়ে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করেছি। যেখানে তাকে কবর দেওয়া হয়েছে, সেখানে একটি এতিমখানা আছে। সেখানে কাজ করছি। ওনার কবরটাও বাঁধাই করেছি। সব মিলিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
বড় পরিসরে স্মরণ আয়োজনের কথা জানিয়ে হাকিম বলেন, "আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ‘অচিন পাখি’ একাডেমির পক্ষ থেকে ফরিদা পারভীনের স্মরণে একটি অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের একটি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান হবে। সেখানে একাডেমির শিক্ষার্থীরা গান ও কবিতা পরিবেশন করবে এবং বাইরের কয়েকজন শিল্পীকেও আমন্ত্রণ জানানো হবে।"
ঢাকার তেজকুনি পাড়ার হোন্ডার গলিতে একটি ভাড়া বাড়িতে ১৭ বছর আগে প্রতিষ্ঠা পায় ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশনের ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’। ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনের যে সুরচর্চা পাঁচ দশক ধরে চলেছে, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতেই এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি।
ফরিদা পারভীনকে হারানোর এক বছর, প্রতিষ্ঠানটি এখন কেমন চলছে প্রশ্নে হাকিম বলেন, "অচিন পাখি একাডেমি আগের মতই চলছে, আমাদের ফান্ড নাই, আমরা খুব অভাবের মধ্যেই চলি। তারপরও আমার যতটুকু সামর্থ্য, তা দিয়েই চালাচ্ছি। আগে তো দুইজনে বেশি খরচ করতাম। দুইজনের খরচের ওপর চলত, গায়ে লাগত না তখন। এখন তো একদম একা।”
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব থাকলেও নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ফরিদা পারভীনের স্মৃতি ও সুর ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, “সরকারিভাবে একাডেমির জন্য আমরা এখনও কোনো অনুদান পাই না। আগে বছরে এক লাখ টাকা আসত, সেটাও তিন-চার বছর ধরে বন্ধ। তারপরেও একাডেমি যেভাবে চলে, চলছে।”
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে ফরিদা পারভীনকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় বড় আয়োজন নেই, এ নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে হাকিম বলেন, “আমি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি, বারবার চেষ্টা করেছি। তারা যদি কোনো উদ্যোগ নেয় তবে ভালো, আর না নিলে আমার যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, তার মধ্যেই করব।”
দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এই বংশীবাদক বলেন, “সব মিডিয়া তার স্মরণে অনুষ্ঠান করেছে। রেডিও স্টেশন অনুষ্ঠান করেছে, বিভিন্ন টেলিভিশন স্টেশনও তাকে স্মরণ করেছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমার আক্ষেপ আছে, কিন্তু কারো প্রতি কোনো অভিযোগ বা অনুযোগ নেই— সরকারের কাছেও না, দেশের ধনীদের কাছেও না, কোনো মিডিয়ার কাছেও না। ফরিদাও নেই, আমার অনুপস্থিতিতে ‘অচিন পাখি’ একাডেমি কতদিন টিকে থাকবে, তা আমার জানা নেই। আমি যে কয়দিন বাঁচব, আমার হাতের বাঁশিটা যে কয়দিন আছে, সে কয়দিন চালাতে পারব। যেদিন আমার হাতের বাঁশিটা ভেঙে যাবে, সেদিন কী হবে তা জানি না।”
ফরিদা পারভীনের প্রয়াণের পর নিঃসঙ্গতাই এখন তার সঙ্গী বলে মন্তব্য করেন এই বংশীবাদক। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে দৈনন্দিন জীবনে প্রতি মুহূর্তে তার শূন্যতা অনুভব করেন তিনি।
“তার চলে যাওয়ায় আমার জন্য সবথেকে বড় আঘাত হচ্ছে নিঃসঙ্গতা, সে সারাক্ষণ আমাকে নিয়েই ভাবত। তার ধ্যানে-জ্ঞানে, অচিন পাখি আর আমিই ছিলাম। সকালে চা-নাস্তা খেলাম কি না, দুপুরে খেয়ে কাজে গেলাম কি না, অসুস্থ থাকলেও সে খোঁজ নিত, এখন এসবের বড্ড অভাব বোধ করি। ঘরের প্রতিটি কোণায় এখনও জীবন্ত ফরিদা পারভীনের স্মৃতি। সুর মানেই তো ফরিদা পারভীন, যেখানেই তাকাই তাকে দেখি।"
কিডনি সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে গেল বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে চলে যান ফরিদা পারভীন।
১৯৫৪ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর নাটোরে জন্ম নেওয়া ফরিদা বেড়ে ওঠেন কুষ্টিয়ায়। বাবা ছিলেন চিকিৎসক, মা গৃহিনী। সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া ফরিদার গানে হাতেখড়ি পাঁচ বছর বয়সে। বাবা-মায়ের উৎসাহে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেওয়া ফরিদার ইচ্ছা ছিল নজরুলসংগীতের শিল্পী হওয়ার। এগোচ্ছিলেনও সেই পথেই।
রাজশাহী বেতারে নজরুলগীতির শিল্পী হিসেবে গান গাইতে শুরু করেন ১৯৬৮ সালে। গেয়েছেন আধুনিক ও দেশের গানও। তরুণ বয়সে লালনের গান একরকম ‘উপেক্ষিতই’ ছিল তার কাছে। তবে সংগীতের অন্য সব ধারাকে পাশে সরিয়ে কীভাবে, কোন তাড়নায় তিনি লালনের গানে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন সেই গল্প ফরিদা শুনিয়েছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে।
ফরিদা বলেছিলেন, স্বাধীনতার বছরখানের পর কুষ্টিয়ার ছেঁউরিয়াতে দোল পূর্ণিমার উৎসবে গুরু মোকছেদ আলী তাকে অনুরোধ করেছিলেন লালনের গান গাইতে।
তার ভাষ্য ছিল, “তখন আমি খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললাম, ঠিক আছে আমাকে একটা গান শিখিয়ে দেন।”
এরপর ‘বড় অনিচ্ছায় কেবল গুরুর মান রাখতে’ লালনের ‘সত্য বল সুপথে চল’ গান ফরিদা করেছিলেন।
ওই গানই শিল্পী জীবনের বাঁক বদলে দেয় ফরিদার। নিজের ভেতরে এক ধরনের ‘অনুরণন’ অনুভব করেন বলে ভাষ্য ছিল তার।
ফরিদা বলেছিলেন, “যেটা ঐশ্বরিক অনুরণন। আমি শান্তি পাচ্ছিলাম না। আমার মনে হল আমাকে এই গান আরও করতে হবে, এই গান শিখতে হবে। এরপর গুরু আমাকে একটা একটা করে গান শেখাতে লাগলেন। আর এভাবেই লালন গানের শুরু। এখন এই লালন ফকিরই আমাকে সবার প্রাণের মধ্যে উপস্থাপন করেছে। এই গান দিয়ে আমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন বলেই সেদিন 'সত্য বল সুপথে চল' গানটি আমাকে দিয়ে করিয়েছিলেন।”
অনেকে তাকে লালনের গানের 'রানি বা সম্রাজ্ঞী' বললেও এ ধরনের উপাধি পছন্দ করতেন না ফরিদা।
তার কথায়, “এসব আমি একদমই পছন্দ করি না। কেউ যদি লালনের বাণীগুলো অন্তর থেকে আত্মস্থ করতে পারে, সে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এসব নাম দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।”
ফরিদা পারভীনের আক্ষেপ ছিল, নতুন প্রজন্ম ‘শুদ্ধভাবে লালন চর্চা করছে না’। লালনের গান উপস্থাপনার হালের প্রবণতাও ‘সঠিক নয়’ বলে তার ভাষ্য। তার মতে, হৃদয়ের গভীর উপলব্ধি থেকে লালন চর্চার কোনো বিকল্প হতে পারে না।
লালনের গান ছাড়াও ফরিদা পারভীনের গাওয়া বেশ কয়েকটি আধুনিক ও দেশের গান জনপ্রিয় হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে ‘তোমরা ভুলে গেছ মল্লিকা দির নাম’, ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’। বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন এই শিল্পী।
লালনের গান গেয়ে ফরিদা কেবল নিজেই জনপ্রিয় হননি, এই সংগীতকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও পৌঁছে দিয়েছেন। সংগীতের সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে পেয়েছেন একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা।
সংগীতাঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। ২০০৮ সালে জাপান সরকারের ‘ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার’ পুরস্কার পান তিনি। সেরা প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান ১৯৯৩ সালে।