Published : 10 Aug 2015, 09:58 AM
বাংলাদেশের সংগীত-পরম্পরায় ফরিদা ইয়াসমিনের পদানুসরণ করেছেন তার তিনবোন ফৌজিয়া খান, নীলুফার ইয়াসমিন ও সাবিনা ইয়াসমিন।
ফরিদা ইয়াসমিনের জন্ম ১৯৪১ সালে, নানাবাড়ি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায়। বাবা লুৎফুর রহমান ছিলেন সরকারি চাকুরে, মা বেগম মৌলুদা খাতুন গৃহিণী। তিনি ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান, তার পর যথাক্রমে জন্মান ফৌজিয়া খান, নাজমা ইয়াসমিন হক, নীলুফার ইয়াসমিন ও সাবিনা ইয়াসমিন।
নাজমা ইয়াসমিন হক ছাড়া বাকী চারজনই বাংলা গানের জগতে পরিচিত ও জনপ্রিয় নাম। যার সূত্রপাত হয় ফরিদা ইয়াসমিনের হাত ধরে।
ফরিদা ইয়াসমিন গান শিখেছেন দূর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে, তার সঙ্গে আরও শিখতেন ফৌজিয়া খান। ছোট বোন সাবিনা ইয়াসমিন এক সাক্ষাৎকারে গ্লিটজকে বলেছিলেন, “বাড়িতে একটা সংগীতের পরিবেশ দেখেছি। মা গান গাইছেন, বাবাও খুব ভালো গাইতেন। বোনেরা তো গাইছেন। আম্মার গানের গলা অসম্ভব সুন্দর ছিল এবং তিনি গাইতেনও খুব সুন্দর। এত সুন্দর হারমোনিয়াম বাজাতেন, আমি অবাক হয়ে দেখতাম এবং শুনতাম। আমার বড় বোন ফরিদা ইয়াসসিন, ফৌজিয়া খান উচ্চাঙ্গ শিখতেন ওস্তাদ দূর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে। আমরা তখন বাবার চাকরীর সুবাদে নারায়ণগঞ্জ থাকতাম। আমি আর নীলুফার মাঝেমাঝে বসতাম তাদের পাশে। দেখতাম কী শিখছেন।”
সাবিনা ইয়াসমিন আরও জানান, তাদের মা সংগীত চর্চা চালিয়ে যেতে পারেননি পারিপার্শ্বিকতার কারণে।
“সেই সময় মুসলিম নারীদের জন্য গান-বাজনা চর্চা করা সহজ ছিল না। পরে অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সংসারে ঢুকে গান-বাজনা কিছুই হলো না আম্মার। আমার মায়ের মনে জিদ ছিল এজন্য, আমাদের অর্থ্যাৎ তার সন্তানদের গান শেখানোর বিষয়ে। আরেকটা ব্যাপার, আম্মা পড়াশোনাতেও অসম্ভব ভালো ছিলেন, সেটাও চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। এজন্য আমাদের এ দুটি দিকেই সমান মনোযোগী করতে সচেষ্ট ছিলেন তিনি।”
পাঁচ বোনের সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে মূলত গাইতে শুরু করেন ফরিদা। রূপালি জগতের জীবন খুবই ছোট, ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ সাল। এরপরই ব্যস্ত হয়ে পড়েন সংসার নিয়ে।
ফরিদা ইয়াসমিন আধুনিক বাংলা গান, সিনেমার গানই গেয়েছেন বেশি। ষাটের দশকে রেডিও ও প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। উর্দু ভাষার গান, গজলও গেয়েছেন।

মোহম্মদ মনিরুজ্জামানের লেখা এবং আবদুল আহাদের সুরে সমবেতভাবে গাওয়া ‘আমারও দেশেরও মাটির গন্ধে’ গানটিতে অংশ নেন ফৌজিয়া খান ও ফরিদা ইয়াসমিন।
সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘এই মন তোমাকে দিলাম’। এ গানটিতে প্রাথমিকভাবে কণ্ঠ দিয়েছিলেন ফরিদা ইয়াসমিন।
জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকতেই ফরিদা ইয়াসমিনের বিয়ে হয় লেখক কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। সেবা প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলে কাজী আনোয়ার, বাংলাদেশি গোয়েন্দা চরিত্র মাসুদ রানার স্রষ্টা। ফরিদা ইয়াসমিনের দুই ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন ও কাজী মায়মুর হোসেন বাবা ও দাদার পথে চলছেন। লেখালেখি এবং সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে রয়েছেন তারা। একমাত্র মেয়ে শাহরীন সোনিয়া।
ফরিদা ইয়াসমিনের বড় ছেলে কাজী শাহনূর বলেন, “মা পরে মাঝে মাঝে বিশেষ কোনো উপলক্ষেই গান গাইতেন। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে উনি একেবারেই গান ছেড়ে দেন।”
শাহরীন সোনিয়া দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগে মারা যান গত বছর। সোনিয়ার খালাতো ভাই আগুন গ্লিটজকে বলেন, “মৃত্যুর সাত দিন আগেও বুঝতে পারিনি তিনি চলে যাবেন।” মেয়ের মৃত্যুও শিল্পীকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
দীর্ঘদিন ধরেই নানা রোগে ভুগছিলেন সত্তরোর্ধ্ব এই শিল্পী। এ বিষয়ে তার ভাগ্নি কণ্ঠশিল্পী ইয়াসমিন ফায়রুজ বাঁধন বলেন, “উনি হাফ কোমায় ছিলেন। অনেক দিন আগে থেকেই কিডনি কাজ করছিল না, ডায়ালাইসিস চলছিল। এছাড়া থেলাসেমিয়া ছিল, একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। বিভিন্ন রকম সমস্যা ছিল উনার।”
৮ অগাস্ট, শনিবার ঢাকার বারডেম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই শিল্পী।
অনাড়ম্বরভাবেই শিল্পীর চির ঘুমের আয়োজন করা হয় মিরপুরের ১১ নম্বর সেক্টরের জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থানে। সেখানে শুয়ে আছেন তার মা মৌলুদা খাতুন।
শিল্পীর ভাগ্নে আগুন গ্লিটজকে জানান, “কাল দুপুরে জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থানে তার মায়ের কবরে সমাহিত হয়েছে তাকে।”
রোববার সকাল পর্যন্ত শিল্পীর মৃতদেহ রাখা হয় বারডেমের হিমঘরে। হিমঘর থেকে সেগুন বাগিচার নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়া তাকে। দুপুরে ধর্মীয় রীতি মেনে কবরস্থান অভিমুখে যাত্রা করে পরিবার, আত্মীয় ও স্বজনের দল।