Published : 04 Dec 2025, 10:04 AM
শুরুটা হল ‘ও আলোর পথযাত্রী’ গানের সঙ্গে নাচ দিয়ে। এরপর ‘মানবো না এই বন্ধনে’, ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’, ‘হেই সামালো ধান হো কাস্তেটা তা শান হো’সহ বহু গানে কালজয়ী সুরস্রষ্টা সলিল চৌধুরীকে স্মরণ করল যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আনন্দধারা আর্টসের’ শিল্পীরা।
লন্ডনের রয়্যাল অ্যাকাডেমি অব মিউজিকে গেল ৩০ নভেম্বর ‘আনন্দধারা আর্টসের’ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হল সলিলের জন্ম শর্তবর্ষ উপলক্ষে একটি সংগীতানুষ্ঠান।
প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী ‘সলিলের গান, গানের সলিল’ শিরোনামের ওই আয়োজনে গানের পাশাপাশি উঠে আসে সলিল চৌধুরীর শিল্প–ভাবনা, মানবিক দর্শন ও বহুমাত্রিক সৃজনজীবনের নানা দিক।

বিজ্ঞপ্তিতে ‘আনন্দধারা আর্টস’ জানিয়েছে, অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা ও সঞ্চালনায় ছিলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক এবং সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহাদুজ জামান।
পরিবেশনার ফাঁকে তিনি সলিল চৌধুরীর ব্যক্তিজীবন, সংগীতচেতনা ও আজীবন লালিত মানবতাবাদী আদর্শ নিয়ে আলোচনা করে বলেন, “আজীবন সাম্যবাদী চেতনায় বিশ্বাসী সলিল চৌধুরীর সঙ্গীতে তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বারবার প্রতিফলিত হয়েছে।”
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ‘আনন্দধারা আর্টসের’ কর্ণধার চিকিৎসক ও গায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ।
তিনি বলেন, “শিল্পীর এবং শিল্পের মূল কাজ সুন্দরের সাথে, জীবনের নিগূঢ় অর্থের সঙ্গে মানুষের সংযোগ সৃষ্টি। সলিল চৌধুরী আমাদের জীবনে সেই সংযোগ সেতুর স্রষ্টা।”

গণসংগীত ও ক্লাসিক সুরের পরিবেশনা
সমবেত কণ্ঠে 'ও আলোর পথযাত্রী' গান ও নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর আনন্দধারা আর্টসের শিল্পীরা সলিল চৌধুরীর বিখ্যাত গণসংগীতগুলো পরিবেশন করেন।
গানগুলোর মধ্যে ছিল 'আমার প্রতিবাদের ভাষা', 'মানবো না এই বন্ধনে', 'ঢেউ উঠছে কারা টুটছে', 'হেই সামালো ধান হো কাস্তেটা তা শান হো', 'পথে এবার নামো সাথী', 'আর দুর নেই', 'বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা'সহ কিছু গান।
এরপর সংগীতশিল্পী অবন্তী সিঁথি শুনিয়েছেন, 'আজ নয় গুন গুন, গুঞ্জন প্রেমে' ও 'আজ তবে এই টুকু থাক', 'কেন কিছু কথা বলো না গান'।
অনুষ্ঠানে সংগীতশিল্পী অমিত দে গান, 'আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুব তারা'; 'সরস্বতী নদী তীরে', 'যদি কিছু আমারে শুধাও'।
এরপর দ্বৈত কণ্ঠে উর্বী মধুরা ও পূর্বা অধরার গায় 'নাও গান ভরে নাও নাও প্রাণ ভরে' ও 'সুরের এই ঝরঝরনা'। পাশাপাশি 'গুনগুন মন ভোমরা' গানটি এককভাবে পরিবেশন করেন উর্বী মধুরা। পূর্বা অধরাও গেয়ে শুনিয়েছেন 'যারে যারে উড়ে যারে পাখি' গানটি।
পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় রচিত ‘প্রান্তরের গান আমার, মেঠো সুরের গান আমার’ এবং ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম’ গান দুটো গেয়েছেন ইমতিয়াজ আহমেদ।
সলিল চৌধুরী শিশুদের জন্যও গান লিখেছিলেন। যা বিভিন্ন সময়ে শোনা গেছে তার মেয়ে অন্তরা চৌধুরীর গলায়। সেগুলোর মধ্যে আনন্দধারা আর্টসের ক্ষুদে শিল্পীরা গায় ‘তেলের শিশি ভাঙলো বলে’, ‘ও মাগো মা অন্য কোন গল্প বলো’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘না দির তা তুম না তুম’, ‘বুল বুল পাখি ময়না টিয়ে’, ‘এক যে ছিলো দুষ্ট ছেলে’ এবং ‘প্রজাপতি প্রজাপতি আমার ইচ্ছা হয়ে’। এই গানগুলির মধ্যে দুটি গান একক পরিবেশন করে তানিশা চৌধুরী ও বিদিশা শ্রেয়া।
এছাড়া ইমতিয়াজ আহমেদ ও অবন্তী সিঁথি দ্বৈত কণ্ঠে গেয়েছেন, ‘শোনো কোনো এক দিন’, ‘ও মোর ময়না গো’ ও ‘এই রকো পৃথিবীর গাড়ীটা থামাও’।

লন্ডনে সলিল চৌধুরীকে নিয়ে এত নান্দনিক, সুপরিকল্পিত ও বিস্তৃত আয়োজন আগে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন সেখানে উপস্থিত শ্রোতা ও দর্শকেরা।
নজরুলসংগীত শিল্পী লুসি রহমান বলেন, “সলিল চৌধুরীর সুরে, গানে, কবিতায় এক অসাধারণ সময় কেটেছে এখানে।”
আনন্দ গুপ্ত বলেন, “আমি কোরাসের মান দেখে অভিভূত এত শৃঙ্খলা, এত নিখুঁত লয়, এত প্রাণশক্তি! শতবর্ষ উদযাপনে এই আয়োজন সত্যিই অনন্য।”
গানের পাশাপাশি ছিল কবিতা আবৃত্তি পাঠ। সমর সাহার কণ্ঠে দর্শকরা উপভোগ করেছেন কবিতা ‘শৃঙ্খলা বিশৃঙ্খলা’ ও ‘অস্ত্রদীক্ষা’।
এই বিশেষ আয়োজনের পুরো অনুষ্ঠানে নৃত্যে অংশ নেন অদিতি রায় ও মনিরুল ইসলাম মুকুল।
বাদ্যযন্ত্র সহযোগিতায় ছিলেন অমিত দে (কীবোর্ড), নাগিফ সালভাহ (গিটার), অমি ইসলাম (বেজ), ময়ুখ চক্রবর্তী (বাঁশি), অনিরুদ্ধ মুখার্জি (তবলা) ও তৌকি জাওয়াদ (অক্টোপ্যাড)।
মঞ্চ পরিকল্পনা ও ভিডিও প্রক্ষেপণে ছিলেন গোলাম আকবর মুক্তা। শব্দ বিন্যাস ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পরিচালনা করেন শামসুল জাকি স্বপন। পুরো অনুষ্ঠানের সংগীত পরিচালনায় ছিলেন ইমতিয়াজ আহমেদ।
‘কোনো এক গাঁয়ের বধূ’, ‘ও আলোর পথযাত্রী’, ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’, ‘উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা’সহ বহু কালজয়ী ও জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা সলিল চৌধুরী। তিনি তার নিজের লেখা ও সুর করা গান দিয়ে যেমন খ্যাতি পেয়েছেন, তেমনি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’সহ বিভিন্ন কবিতায় সুরারোপের জন্যও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।
সলিল চৌধুরীর জন্ম ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণায় হরিনাভিতে। তার বাবা জ্ঞানেন্দ্রময় চৌধুরী ছিলেন আসামের লতাবাড়ি চা বাগানের চিকিৎসক। বাবার চাকরিসূত্রে আসামের চা বাগানেই কাটে তার শৈশব। বাবা ছিলেন পাশ্চাত্য সংগীতের ভক্ত। তাদের বাড়িতে মোৎজার্ট, বিটোফেন, চাইকোভস্কিসহ ধ্রুপদী পাশ্চাত্য সুরকারদের প্রচুর রেকর্ড ছিল। সেগুলো শুনেই সুরের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি।
লেখাপড়ার জন্য ১৯৪৪ সালে কলকাতায় আসেন তরুণ সলিল। সে সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক সংগঠন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ আইপিটিএতে যোগ দেন। আজীবন তিনি সাম্যবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। আইপিটিএর সদস্য অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন সলিল চৌধুরীর বন্ধু।

আইপিটিএর আরেক সদস্য হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও পরিচয় হয় তার। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সুকান্তর লেখা ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’ গান দুইটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়
১৯৪৭ সালে ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূ’ গানের রেকর্ড প্রকাশ হয়। গানটির কথা ও সুর ছিল সলিল চৌধুরীর আর গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হেমন্ত-সলিল জুটির পথচলা শুরু হয়। আইপিটিএর জন্য প্রচুর সংখ্যক গণসংগীত লেখেন ও সুর করেন সলিল চৌধুরী। সলিল চৌধুরী তার কবিতা ও ছোট গল্পের জন্যও খ্যাতিমান।
দেশভাগের পর তিনি চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করেন। সংগীত পরিচালক হিসেবে তার প্রথম সিনেমা ‘পরিবর্তন’ মুক্তি পায় ১৯৪৯ সালে।
বাঙালি পরিচালক বিমল রায় তাকে নিয়ে যান মুম্বাইয়ে। ১৯৫৩ সালে মুক্তি পায় বিমল রায়ের ‘দো বিঘা জমিন’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতা থেকে নামটি নেওয়া হয়। চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল সলিল চৌধুরীর লেখা ‘রিকশাওয়ালা’ গল্পের ভিত্তিতে। ছবিটির সংগীত পরিচালকও ছিলেন তিনি।
‘নওক্রি’, ‘আমানত’, ‘জাগতে রাহো’, ‘টাঙাওয়ালি’, ‘পরিবার’, ‘আওয়াজ’, ‘মুসাফির’, ‘পরখ’, ‘কানুন’, ‘ছায়া’, ‘চার দিওয়ার’, ‘হাফ টিকেট’, ‘মৃগয়া’, ‘মেরে আপনে’, ‘অন্নদাতা’, ‘আনন্দ’-এর মত সাড়া জাগানো হিন্দি ছবি এবং ‘এক দিন রাত্রে’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘সাগরিকা’র মত বাংলা সিনেমার সংগীত পরিচালক ছিলেন তিনি।
১৯৬৪ সালে তিনি মালায়াম ছবির সংগীত পরিচালনা করা শুরু করেন। সলিল চৌধুরী ৭৫টির বেশি হিন্দি, ৪০টির বেশি বাংলা , ২৬টি মালায়াম ছবির সংগীত পরিচালনা করেন। তিনি কন্নাড়া, মারাঠি, তামিল, তেলেগু, অহমিয়া, গুজরাটি, ওড়িয়াসহ ভারতের বিভিন্ন ভাষায় বেশ কিছু চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্যও গান লিখেছেন সলিল চৌধুরী।
বাংলা গানের এই যুগস্রষ্টা ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মারা যান। তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলা গানের জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন সলিল চৌধুরী।
শতবর্ষে সলিল: তার মত নির্ভীক সুরকার আর আসেননি, বললেন শান্তনু
সলিল চৌধুরীর তেতাল্লিশের নোটবই, রবিঠাকুরকে ভেবেছিলেন 'পরমাত্মীয়'