১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মডেলিং আমাকে পরিপক্ব করেছে, পৃথিবী দেখিয়েছে: ‘আড্ডানামায়’ বিবি রাসেল

বিবি রাসেলের ভাষ্য, গ্রামীণ কারিগররাই তার শক্তির উৎস এবং স্বপ্নপূরণে সঙ্গী।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 20 Aug 2026, 10:23 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:03 PM

সত্তরের দশকে বিবি রাসেল লন্ডনে পাড়ি দেন ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়তে, চেনাজানা মানুষ কটাক্ষ করে বলেছিল, মেয়েটা গেল ‘দর্জি হতে’!

সেই তরুণী বাবার পকেট থেকে একটিও টাকা না নিয়ে রাত সাড়ে ৩টায় ঘুম থেকে উঠে চিঠি বিলি করে আর বৃত্তির টাকায় পড়াশোনার খরচ যোগালেন। ‘লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশন’ থেকে পেলেন সেরা শিক্ষার্থীর স্বীকৃতি। 

ঘটনাচক্রে হয়ে গেলেন মডেলও; হলেন ভোগ, কসমোপলিটান, মেরি ক্লেয়ারসহ বহু ফ্যাশন সাময়িকীর মুখ।

কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকায় ফ্যাশনের আলো ঝলমলে জগৎ ছেড়ে বিবি রাসেল নব্বইয়ের দশকে ফিরলেন নিজ ভূমিতে। উদ্দেশ্য নিজ নামে লেবেল তৈরি করে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি ফ্যাশন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া। 

৭৬ বছর বয়সেও তিনি সেই কাজে পথ চলছেন অবিরাম। এই পথচলায় সঙ্গী করেছেন দেশের আনাচে-কানাচে থাকা গ্রামীণ কারিগরদের, যারা তার ‘শক্তির উৎস এবং স্বপ্নপূরণে সঙ্গী’ বলে এই ফ্যাশন ডিজাইনারের ভাষ্য।

এখন তার একমাত্র লক্ষ্য হারিয়ে যাওয়া মসলিনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা, যে কাজে এগিয়ে নিতে রাতদিন গবেষণা ও পরিশ্রম করে চলেছেন তিনি। 

এই কাজে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও কারো কাছে হাত পাততে রাজি নন বিবি রাসেল। নিজের সামর্থ্যে এই মহাযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার কথা তিনি বলেছেন। 

গ্লিটজের সাক্ষাৎকার সিরিজ ‘আড্ডানামা’য় অতিথি হয়ে এসে বিবি রাসেল শুনিয়েছেন তারুণ্যের দিনগুলোতে ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার তাড়নার কথা, বলেছেন মডেলিং কীভাবে তার জীবনকে প্রভাবিত করেছে।

এছাড়া তাঁত, জামদানি ও মসলিনের মত দেশীয় ঐতিহ্য বিশ্ব ফ্যাশন মঞ্চে তুলে ধরতে তার সংগ্রামের গল্পও বলেছেন সময় নিয়ে। 

আড্ডনামা সঞ্চালনা করেছেন অভিনেত্রী নিমা রহমান। গ্লিটজের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে আলোক হেলথকেয়ার এন্ড হাসপাতাল। 

বৃহস্পতিবার রাতে প্রচার হয়েছে ‘আড্ডানামা’র তৃতীয় পর্ব। এর আগের দুই পর্বে অথিতি হয়েছিলেন অভিনেতা আবুল হায়াত এবং জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠান।

রঙিন সুতোর বৈচিত্র্যে মুগ্ধতা শৈশবেই

বিবি রাসেলের জন্ম ১৯৫০ সালে চট্টগ্রামে। বাবা মোখলেসুর রহমান সিধু এবং মা শামসুন্নাহার রহমান। বিবি রাসেলের বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। সে সময় বাড়িতে আসা ফেরিওয়ালা, মাছওয়ালাদের পরনের লুঙ্গি-গামছার রঙিন সুতোর বৈচিত্র্যতায় মুগ্ধ হতেন বিবি রাসেল। চোখ আটকাতো কাপড়ে হরেক রঙিন সুতোর ব্যবহারে।

তিনি বলেন, “আমি আমার বাবা মাকে বলতাম আমার এত পেন্সিল কালারস আছে, কিন্তু আমার থেকে সুন্দর কালার কম্বিনেশন ওই যে লুঙ্গি গামছা শাড়ি পরে আসে যারা, তাদের আছে।” 

বিবি রাসেল পড়াশোনা করেছেন টিকাটুলীর কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। তার কথায়, স্কুল-কলেজে তিনি পরীক্ষা দিতেন কেবল পাস করার জন্য। তার শঙ্কা ছিল, যদি ভালো ফল করে ফেলেন, তাহলে হয়ত ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে দেবে। 

“কিন্তু আমার টিচাররা আমাকে কোনদিন বকতো না, জানতো আমি ইচ্ছা করে করি।"          

লেখাপড়া নিয়ে একটি ঘটনা তিনি বলেছেন আড্ডানামায়। 

"আমরা যখন ম্যাট্রিক (এসএসসি) পরীক্ষা দিয়েছি তখন তো নিউজপেপারে আসত রেজাল্ট। তো রেজাল্টে আমার নাম নেই। তো আমার বাবা বকতেন না, মায়েরা তো একটু বকে। আমি আমার বাবাকে বললাম, আমি পাঁচটা প্রশ্ন দিয়েছি বাবা, আমি ফেল করতেই পারি না, কোনও রকমে সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করব। 

“আমি তো প্রিপেয়ারই করে নিয়ে যেতাম ছয়টা কি সাতটা, তার মধ্যে পাঁচটা কমন, তো ফেল করতে তো পারি না। তখন থেকে আমার মা বলত 'ওর কি বিশ্বাস', আমি কিন্তু যত পরীক্ষা এখানে দিয়েছি কোনো রকমের সেকেন্ড ডিভিশনে পাওয়া মেয়ে আমি।"  

স্কুলের ধাপ পেরিয়ে বিবি রাসেল গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে সিদ্দিকা কবির এবং হুসনা বানু খানমের মত শিক্ষকদের সান্নিধ্য পান। শিক্ষকরাও তার চঞ্চলতা বুঝতেন এবং বকাঝকা করতেন না। 

বিবি রাসেল বলেন, “আমি অনেক আদরের, টিচাররাও আমাকে বকত না, জানত আমি ছটফট করতেছি; বুঝছ, ওখানেও কোন রকম করে পাস করা মেয়ে আমি।" 

ছোটবেলা থেকে আঁকাআঁকিতে পারদর্শী বিবি রাসেল অবশ্য চারুকলায় পড়তে চাননি। 

অল্প বয়েসে তিনি বাবার কাছ থেকে কোকো শ্যানেলের ওপর একটা বই উপহার পেয়েছিলেন; সেই বই তার ভেতরে ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার ইচ্ছেকে উসকে দিয়েছিল। 

‘সবাই বলল দর্জি হতে লন্ডনে যাচ্ছি’

কলেজের গণ্ডি পার হয়ে যুক্তরাজ্যে পড়তে যান বিবি রাসেল, সময়টা সত্তরের দশকের শুরুর দিকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর। তখন দেশের কেউ ভাবতেও পারতেন না, ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে কেউ ক্যারিয়ার গড়তে পারে। কিন্তু ভেবেছিলেন বিবি রাসেল।

ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার ইচ্ছে কেবল মনের ভেতরে রেখে দেননি তিনি। যুক্তরাজ্যের ‘লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশন’ এ তিনি পড়াশোনা শুরু করলেন। 

পড়াশোনার জন্য কেন ফ্যাশন ডিজাইনিং বেছে নিয়েছিলেন, তা নিয়ে কটাক্ষের শিকার হতে হয়েছিল তাকে।

বিবি রাসেল বলেন, “আমাকে বলা হয়েছে তোমার বাবা মা তোমাকে বিয়ে দিয়ে দিল না, দর্জি হতে যাচ্ছ। এটা দর্জির কাজ। আমি রাত সাড়ে ৩টায় উঠতাম পোস্ট বিলি করতে। তখন স্টুডেন্ট, কাজেই ট্যাক্স দিতে হয় না, তারপর কলেজে দৌড়াতাম।"

কষ্ট করে পড়াশোনা করার সেসব দিনের কথা গ্রামের কারিগরদেরও বলেন বিবি রালেন। এই কথাগুলো তিনি বলেন তাদেরকে কাজে অনুপ্রাণিত করতে।

বাবা-মা বিদেশে টাকা পাঠাতেন কি না জানতে চাইলে বিবি রালেন বলেন, "না, আমি প্রথম ছয় মাস পোস্ট অফিসে চাকরি করেছি, তারপরে একটা প্রাইভেট স্কলারশিপে ফার্স্ট হয়েছি, তারপর আমার আর পিছনে ঘুরে তাকাতে হয়নি।" 

‘লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশন’ বিশ্বের ফ্যাশন স্কুলগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। আর বিবি রাসেলকে বলা হয় সেই স্কুলের ‘ওয়ান অব দ্য বেস্ট স্টুডেন্ট এভার’।

বিবি রাসেল বলেন, “ফ্যাশন স্কুলে ফাইনাল ইয়ারের কাজগুলো সব আর্কাইভে রাখা, ওটা একদম মন দিয়ে করেছি।"

'মডেলিং পরিপক্ব করেছে'

ফ্যাশন নিয়ে পড়া ছিল বিবি রাসেলের কাছে স্বপ্ন, এক কথায় 'সবকিছু'; কিন্তু মডেলিং করার কথা তিনি ভাবেননি। 

বাঙালিত্বকে আপাদমস্তক ধারণ করা এই নারী শুধু ভাবতেন, দেশের চিরাচরিত ফ্যাশনকে কীভাবে বিদেশের ফ্যাশন সংশ্লিষ্টদের সামনে তুলে ধরা যায়।

১৯৭৬ সালে নিজেদের গ্র্যাজুয়েশন শোতে পোশাক প্রদর্শনের প্রস্তুতি বিবি রাসেল নিলেও সেটার মডেলিংয়ের বিষয় মাথায় আনেননি। পরে শিক্ষকদের উৎসাহে তার অবস্থান বদলে যায়। 

নিমা রহমানকে বিবি রাসেল বলেন. “তুমি জানো আমার মতন একটা মেয়ে ছোটবেলা থেকেই শুনেছে আরে ওকে কোথায় পেয়েছে? কে ওকে বিয়ে করবে–এত কুৎসিত! শুধু আমার বাবা-মা বাড়ির মানুষ আমাকে কিছু বলত না। 

“তো সেই মেয়ে করবে মডেলিং! আমাদের যখন গ্রাজুয়েশন পরীক্ষা হয়, মানে আমার কলেজে ফ্যাশনে দ্যাটস দ্য মোস্ট ইম্পর্টেন্ট শো কিন্তু এখনো। সেখানে নিউ ট্যালেন্টকে খোঁজা হয়। তো আমার টিচাররা আমাকে দেখলে বলত ‘সানশাইন’। আমি হাসতাম। তারা বলে, ‘তুমি হাসো কেন? তোমাকে কমপ্লিমেন্ট দিচ্ছি।’ আমি বলেছি, শুনে আসছি ছোট থেকে আমি কত ‘আগলি’ তোমরা হঠাৎ করে আমাকে সুন্দর বলছ!”

অনিচ্ছা নিয়েই ফ্যাশন শোতে অংশ নিতে হয় বিবি রাসেলকে। লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশনে পাস করা শিক্ষার্থীদের ডিজাইন করা পোশাকের যে প্রদর্শনী হয়, তাতে হাজির হন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রতিনিধি, ডিজাইনার, ফটোগ্রাফারসহ অনেকে। সেখানে দর্শক সারিতে ছিলেন ফ্যাশন ম্যাগাজিন হার্পার্স বাজার, ভোগ সাময়িকীর প্রতিনিধিরা। 

এর পর কী কী হল? বিবি রাসেল বললেন, "পরের দিন আমাকে কলেজে প্রিন্সিপাল ডেকে বলল, ‘জানো, তোমাকে চায় হার্পার্স বাজার, তাদের ১০ পেইজে।’ আমি বললাম না, আমি করতে চাই না। তাও আমাকে কনভিন্স করল।”

ওই একটি ঘটনা নতুন দিগন্ত খুলে দেয় বিবি রাসেলের জীবনে। এরপর এক বছর ছাপা ম্যাগাজিনের কাজে সুনাম অর্জনের পর তার ডাক পড়ে ফ্যাশন শো করার।

তিনি বলেন, “মডেলিং আমাকে ম্যাচিউর করেছে, পৃথিবী দেখিয়েছে, ডিফরেন্ট কালচারকে দেখেছি, ডিফরেন্ট ল্যাঙ্গুয়েজ শিখেছি। ডিফরেন্ট ডিজাইনারের সঙ্গে কাজ করেছি।

“আমি প্রায় সব ম্যাগাজিনে অনেক দিন কাজ করেছি, হার্পার্স, ভোগ, কসমো, মারি ক্লেয়ার, সব সব।"

দেশে ফেরা চুরানব্বইয়ে, গড়ে উঠল ‘বিবি প্রোডাকশন’

পড়াশোনা শেষ করে, পুরো ইউরোপ, আমেরিকা, ইতালি, জাপানসহ আরও কয়েক দেশে মডেলিংয়ের কাজ ছেড়ে ১৯৯৪ সালে দেশে ফিরে আসেন বিবি রাসেল। দুবছর পর ১৯৯৬ সালে বাংলা তাঁতের ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তোলেন ‘বিবি প্রোডাকশন’।

এর আগের সময়টা কি করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আগে থেকেই জানতাম আমি কি করব। কিন্তু আমি আমার বন্ধুদের আমার নাম ছাড়া ডিজাইন দিতাম।

“আমি জানি আমরা কি করে পৃথিবীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারব, কোনো মেশিনে তৈরি কোনো কিছু দিয়ে না। ইতিহাস আছে, আমরা ১৮ সেঞ্চুরিতে বা তার আগে কি সুন্দর সুন্দর কাজ করেছি, ওটা নিয়ে কাজ করব।

“আরেকটা জিনিস আমি বলতে চাই, সবাই আমাকে বলে যে, ওর ১০টা দোকান আছে, এর ১০টা দোকান আছে। তুমি যদি বিদেশ যাও বা ইন্ডিয়ায় যাও, কলকাতায় সব্যসাচীর (সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়, ফ্যাশন ও কস্টিউম ডিজাইনার) একটা দোকান আছে। আমি একজন ডিজাইনার, হ্যাঁ আমি তো ওরকম ডিপার্টমেন্টাল স্টোর করতে আসিনি। কিন্তু এসেছি মানুষকে ভালো জীবন দিতে কাজ করতে, উন্নয়ন করতে। আমি গ্রামে গিয়ে কী করি?”

সঞ্চালক তখন পাল্টা প্রশ্নে বলেন, “হ্যাঁ, গ্রামে তুমি কী করো?

বিবি রাসেল বলেন, “আমাকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো চায় কেন? তাদের কথা, ‘তুমি কেমন করে এই ম্যাজিক দেখিয়েছ!’ এটা একদম সত্যি কথা যে খালি দোকান করতে হলে আমি দেশে ফিরে আসতাম না।”

নিমা রহমান জানতে চান, দেশে ফিরে বিবি রাসেল কাদের নিয়ে কাজ করলেন?

গ্রামীণ এলাকার কারিগরদের কথা তুলে ধরে বিবি রাসেল বলেন, “আমাদের কিন্তু কৃষির পরেই ক্রাফট। আমার সময় নাই ঢাকায় এই ট্রাফিকের মধ্যে এই পার্টিতে এখানে যাওয়ার, ওখানে যাওয়ার, একদম না। আমি ফিরে এসছি বাংলাদেশের ৫০ ভাগ মানুষ, যারা গ্রামে থাকে হাতে দিয়ে জিনিস করার জন্য। তাদের কাছ থেকে আমি নড়িও না।”

কোনো ধরনের স্পন্সর ছাড়া নিজের উপার্জন দিয়ে গ্রাম-বাংলার ফ্যাশন ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছেন বিবি রাসেল। এই সংগ্রামে তার কেটে গেছে তিন দশক।

“৩০ বছর হয়ে গেছে বাংলাদেশে, আমার কোনো দুঃখ না, কোনো কষ্ট না কোনো কমপ্লেইন না পৃথিবীর কোনখানেই কিন্তু আমার বাড়ি ঘর নাই। সবকিছু বিক্রি করে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করছি, আমার টাইম নাই আমি প্রপোজাল নিয়ে কারো কাছে যাব বা কিছু হাত পাতব। বিদেশে তো আমি ভিক্ষা করে বড় হইনি, নিজের ট্যালেন্ট দিয়েই বড় হয়েছি।

‘আমাদের জামদানির সঙ্গে কেউ পারবে না’

কথায় কথায় নিমা রহমান বলেন, “জামদানি তো অনেক ভালো করে ফেরত আনলে তুমি। বলতো এই কাহিনীটা?”

এর কৃতিত্ব তাঁতীদের দিয়ে বিবি রাসেল বলেন, "আমি না, এটা তো তাঁতিদের দক্ষতা, কিন্তু এখন তো বেশ খারাপ অবস্থা, জামদানি মেশিন তৈরি হয়ে যাচ্ছে সিনথেটিক জামদানি। জামদানি আমাদের একটা এক্সকুইজিট ঐতিহ্য, আমাদের জামদানির সঙ্গে কেউ পারবে না।” 

জামদানি শাড়ির গুণমান ভালো হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যার তীরের আবহাওয়াই মূল কারণ।  

‘মসলিন আমার স্বপ্ন’

মসলিনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতেও দিনরাত কাজ করার কথা বলেছেন বিবি রাসেল। তার কথায়, এই কাজে তার অগগ্রতি ২০ শতাংশ। 

"মসলিনটা তো খাদির মতন, প্রত্যেকটা জিনিস হাতে করতে হয়। সুতা কাটার থেকে সব কিছু। এখন তো মেশিন মেইড সুতা দিয়ে সব। আমার তো একটাই স্বপ্ন এখন, মসলিন। মসলিন এখনো তো ওঠাতে পারিনি, ওটা পারব কি না জানি না। যেদিন পারব, আমার মনে হয় সেদিন আমি দেশ বিদেশের সব মিডিয়ার সামনে আসব। আমি দিন রাত কাজ করছি। অন্য আর কিছু করি না।”

‘গুরু’ গওহর জামিল 

দেশের রাজনীতি, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি-সব অঙ্গনের সেরা মানুষদের চোখের সামনে দেখে বিবি রাসেলের বড় হওয়া। একটা মানুষের গড়ে ওঠার পেছনে তার বাড়ির শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

পরিবারের সাংস্কৃতিক আবহ তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের বাড়িতে কে না আসত! জাহিদুর রহিম বাবু ভাই (রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী), আলতাফ ভাই (শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদ), আব্দুর রহিম বল, সন্‌জীদা চাচি (সন্‌জীদা খাতুন), ওয়াহিদুল চাচা (ওয়াহিদুল হক) ফিরোজা খালা (নজরুলগীতি শিল্পী ফিরোজা বেগম)–এদের তো ছোট থেকেই চিনি। আমি নাচ শিখেছি গওহরদার কাছে (গওহর জামিল)।”

নাচ ছাড়লেন কেন? বিবি রাসেল বলেন, “একটা পয়েন্টে এসে আমি তো মেয়েদের থেকে এক হাত লম্বা, বুঝছ, আমাকে যখন ছেলে বানাত, আমি নাচ ছেড়ে দিছি। কিন্তু আমার গুরু গওহর জামিল আর রওশন জামিল। বেহালা শিখেছি মতি মিয়ার (ওস্তাদ মতিউর রহমান খান, যিনি মতি মিয়া নামে পরিচিত)। অনেকে বলে যে আপনি বাজান, আমি বলছি না এখন তো চর্চা নাই।” 

ছবি আঁকা এবং শিল্পীদের প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, "আমি তো জয়নুল আবেদিন ভাই, কামরুল হাসান ভাই, কিবরিয়া ভাইকে ছোট থেকেই দেখেছি।”

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁও এসেছিলেন বিবি রাসেলদের পুরান ঢাকার বাড়িতে। সেই স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি আড্ডানামায়। 

"ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ একবারই এসেছিলেন বাংলাদেশে। তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম। উনি সকালে উঠে নিজে আজান দিতেন। আমার ছয়, সাত কি আট বছর বয়স হবে। এখনো কিন্তু ওই আজানটা আমার কানে আছে।”

শাড়ির থেকে সুন্দর কোনো পোশাক হতে পারে!

শাড়ির প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা তুলে ধরে বিবি রাসেল বলেন, "আমি সবসময় তাঁতের দেশীয় শাড়ি পরি। কিন্তু হয়তবা আমি আমার স্টাইলে পরি। শাড়ির থেকে সুন্দর কোনো পোশাক হতে পারে একটা বাঙালি মেয়ের জন্য বা যে কোনো মেয়ের জন্য? এখন শুনি তো বেশিরভাগই পার্লারে গিয়ে শাড়ি পরে। এটা খুব দুঃখজনক হবে শাড়ি যদি আস্তে আস্তে চলে যায়।"    

শাড়ি পরে বিদেশে মডেলিং করেছিলেন কি না জানতে চাইলে বিবি রাসেল বলেন, "না আমি মডেলিং করেছি একদম বিদেশে। বিদেশি কোম্পানি। এখনো বলা হয় আমার মতন কেউ করেনি, আমি সব টপ গাড়ির অ্যাড করেছি। রোলস রয়েস থেকে জাগুয়ার থেকে সবগুলোই করেছি। 

“মডেলিং আমি এদেশে করব!  এদেশের তুলনায় আমি তো একটা কুৎসিত মেয়ে, না! কিসের জন্য আমাকে বলবে মডেলিং করতে? আমাকে কোনোদিন বলেওনি কেউ। কিন্তু বাইরে করেছি, একদম ইউরোপে।”

'ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট' 

জীবনের মূলমন্ত্র কী জানতে চাইলে বিবি রাসেল বলেন, "আমার জীবনের মূলমন্ত্র একটাই, যেহেতু এখন আমি বুঝি, কেন আমি পড়তে গেলাম, কেন আমার ঝোঁক ছোট থেকেই এমন ছিল।

“আমার ফিরে আসার প্রধান উদ্দেশ্য হল কাজের মাধ্যমে মানুষকে সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট এনে দেওয়া। আমার একটা স্লোগান আছে– 'ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট'।”

‘ম্যাডোনার কাছেও আমার গামছা আছে’

বিবি রাসেল বলেন, তার কাজের সময়জুড়ে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পণ্য হল গামছা।

বিবি রাসেলের গামছা কীভাবে দেশে-বিদেশে পরিচিতি পেল জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমি অনেক থ্যাঙ্কফুল তিনজন স্প্যানিশ আমার গামছাটা উঠিয়েছে। আন্তোনিও বান্দেরাস, কুইন সোফিয়া, আর ইউনেস্কোর চার বছর ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন ফেদেরিকো মায়র। ম্যাডোনার কাছেও আমার গামছা আছে। তুমি যদি ইন্ডিয়ায় যাও, সবার কাছে আমার গামছা আছে, মানে ফিল্ম স্টার।”

বলিউডে কার কার কাছে তার গামছা আছে জানতে চাইলে বলেন, “ফিল্ম স্টার শাহরুখ, টাবু এদের কাছে আছে।”

চিত্রনায়িকা চম্পা ভারতের অনেক অভিনয়শিল্পীর কাছে তার গামছা পৌঁছে দিয়েছেন বলে বিবি রাসেল জানান। 

‘বাংলা ভাষা ভুলে যাব?’ উচ্চারণ বিতর্কে বিবি রাসেলের জবাব  

বিবি রাসেলকে অনেকে 'বিদেশি মনোভাবাপন্ন' বলেন, এটা তিনি কীভাবে দেখেন?

জবাবে বিবি রাসেল বলেন, "বিদেশিদের মতন করে কথা বলি কি না জানি না, কিন্তু আমি বলতে চাই, সবার একটা নিজস্ব স্টাইল আছে কথা বলার। হয়ত দেখতে আমি লম্বা, চোখগুলি ছোট, চিকবোন আছে, যেটা টিপিক্যাল না।

“আমার কাছে অনেক সময় কোনো একটা ইয়াং ছেলে মেয়ে আসল দেখা করতে, তারা সমানে ইংলিশে কথা বলে ভুলভাল। আমি জিজ্ঞাসা করি কেন এমন বল? তখন আমাকে বলে, আপনি বাংলা বলতে পারেন? আমি বলছি আমি তো একদম বাংলা মিডিয়ামে পড়া মেয়ে। নিজের ভাষা ভুলে যাব?"  

মাতৃভাষা প্রতি অনুরাগের কথা জানিয়ে বিবি রাসেল বলেন, "যে নিজের ভাষা ভালো করে বলতে পারে না, তার পক্ষে অন্য কোনো ভাষা বলা সম্ভব না। আমার একটা নিজস্ব স্টাইল আছে। হয়ত বাংলা লেখা মানে তোমার যেটা পাঁচ মিনিটে হবে, আমার ওইটা হয়ত সারাদিন লেগে যাবে, কেন না আমি অনেক খুঁতখুঁতে পারফেক্ট বাংলা লিখতে চাই।”

দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ, ঘুমের ওষুধ ছাড়াই নির্ভার   

বিবি রাসেল বলেন, তিনি একদম একা থাকেন।

“আমার ছেলেরা বাইরে, বোনরা বাইরে, মা-বাবা তো মারা গেছেন। আমি এই বয়সে সিক্সটিন আওয়ারস কাজ করি, কিন্তু নিশ্চয় আমার ভালো লাগে। এখন পর্যন্ত ঘুমাবার জন্য কোনো ঘুমের ওষুধ খাই না। আমি কোনো ডাক্তারও দেখাই না, আমি ভাবি, মরে গেলে মরে যাব।”

‘বিবি প্রোডাকশন’ এর পরিচিতির পেছনে গ্রামের তাঁতী ও কারিগরদেরই কৃতিত্ব দিয়েছেন বিবি রাসেল।

তিনি বলেন, “গ্রামের মানুষেরা আমাকে যেটা দিয়েছে, আমি তো অকৃতজ্ঞ না। তো আমি যদি তাদেরকে আরেকটু না উঠাতে পারি, আরেকটু কিছু দিতে পারি, সে জন্য আমি দিনরাতই রিসার্চ করি। আজকে আমার পাঁচ টাকাকে কি করে ইউজ করব, এটার প্ল্যান করে নিই। যারা আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে, যারা আমাকে আজকে তৈরি করেছে, তাদেরকে আরেকটু দিতে ট্রাই করব।"