১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড: ছকের বাইরের গল্প বানিয়ে ভেনিসে জয় রুবাইয়াত হোসেনের

রুবাইয়াত বলেন, "প্রত্যাশার চেয়ে অনেক অনেক বেশি সাড়া আমরা পেয়েছি।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 13 Sep 2026, 01:52 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:58 AM

ইতালির ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসরে স্বাধীন চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্যানেল থেকে সেরা পরিচালকের পুরস্কার 'প্রেমিও বিসাতো দ’ওরো' অর্জন করেছেন বাংলাদেশি নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন।

‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমা পরিচালনার জন্য এই পুরস্কার পেলেন তিনি।

'অরিজোন্তি' বিভাগে মনোনীত সিনেমাটি স্বাধীন চলচ্চিত্র সমালোচকদের এই সম্মাননা পেয়েছে। শুক্রবার এই সম্মাননা গ্রহণ করেছেন রুবাইয়াত।

গ্লিটজকে শনিবার রুবাইয়াত বলেন, "ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আমাদের চলচ্চিত্রকে পুরস্কৃত করা, এটা জীবনের অন্যতম সুন্দর ও আনন্দের দিনগুলোর একটি। সিনেমাটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক অনেক বেশি সাড়া আমরা পেয়েছি।"

বাণিজ্যিক কোনো বিষয় বা অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তির স্বপ্ন থেকে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্মাণে রুবাইয়াত হাত দেননি বলে জানিয়েছেন।

তার কথায়, "সিনেমাটি আমি নিজের জন্য বানিয়েছিলাম, এটা ছিল একটা এক্সপেরিমেন্ট। সেখানে সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে জুরিদের কাছে সিনেমাটি এতখানি সমাদৃত হবে—তা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি প্রাপ্তি। আমরা যখন চলচ্চিত্র বানাই, তখন উৎসব বা অ্যাওয়ার্ডের চিন্তা করে বানাই না; ভালোবাসার জায়গা থেকেই বানাই।"

পুরস্কার নেওয়ার সময় জুরিদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে রুবাইয়াত বলেন, সাধারণত দক্ষিণ এশিয়া থেকে যেসব সিনেমা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে যায়, সেগুলোতে দারিদ্র্য বা বিষাদের গল্প থাকে। 

“কিন্তু জুরিরা আমাদের জানিয়েছেন, ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সেই চেনা ছকের বাইরে। এটি একটি উচ্চবিত্ত পরিবারের গল্প, যেখানে উদযাপনের পাশাপাশি ‘বডি হরর’ ঘরানার সুপারন্যাচারাল উপাদান রয়েছে। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে বানিয়েও যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে এমন স্বীকৃতি মেলে, সেটাই আসল সার্থকতা।"

ছয় দিনের উৎসবের অভিজ্ঞতা

গেল ৬ সেপ্টেম্বর ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়েছিল ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ চলচ্চিত্রের।

প্রিমিয়ারের দিনের কথা স্মরণ করে এই নির্মাতা বলেন, "আমার জীবনের অন্যতম সুন্দর ও আনন্দের দিনগুলোর একটি ছিল। সেদিন অনেক বেশি ব্যস্ত ছিলাম, আমি আসলে এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম। এখন আমার মনে হচ্ছে যে কেন আমি ওই দিনটা আরো এনজয় করি নাই!"

গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব চলছে শনিবার পর্যন্ত।

উৎসব ঘিরে নিজের অনুভূতি তুলে ধরে এই পরিচালক বলেন, "বিদেশে এত বড় একটি দল নিয়ে উৎসবে যাওয়ার ঘটনা সচরাচর ঘটে না। তবে আমি সবসময় চেয়েছি একটা পরিবারের মত আমরা সবাই মিলে একসাথে উদ্যাপন করব। রেড কার্পেটে সাউন্ড এডিটর থেকে শুরু করে অভিনয়শিল্পী—সবার উপস্থিতি আমি নিশ্চিত করেছি। সত্যি বলতে এটা জীবনের অন্যতম সুন্দর দিনগুলোর একটি ছিল।"

ভেনিসের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে রুবাইয়াত হোসেন বলেন, "এই ছয় দিনের সফরে অনেকগুলো আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল। আমার বোন ওর ছোট সন্তানকে লন্ডনে রেখে আমাকে সাপোর্ট করতে ভেনিসে এসেছিল, যেটা আমার কাছে খুব বিশেষ ছিল। এছাড়া ইতালিয়ান ফ্যাশন ব্র্যান্ড প্রাদার বিশেষ এক্সিবিশন ‘প্রাদাস্ফিয়ার’ এ আমন্ত্রিত হয়েছিলাম, সেখানে গিয়ে অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন এবং ফ্যাশন আইকন মিউচিয়া প্রাদার সঙ্গে আড্ডা ও সিনেমাটি নিয়ে আলোচনা করতে পারাটাও বড় প্রাপ্তি ছিল।"

তিনি বলেন, "আমার পর্তুগিজ চিত্রগ্রাহক লিওনর তেলেসকে প্রিমিয়ারের দিন দারুণ খুশি ও উচ্ছ্বসিত হতে দেখাটা ছিল দারুণ এক মুহূর্ত। পুরো শুটিংয়ে উনি খুব গম্ভীর ছিলেন, তবে প্রিমিয়ারের দিন তাদের এমন খুশি দেখতে পাওয়াটাই একজন পরিচালক হিসেবে সার্থকতা।"

দর্শকদের প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে রুবাইয়াত জানিয়েছেন, সিনেমাটির শেষ দৃশ্যে বহু মানুষ কেঁদে ফেলেছেন। সিনেমাটি দেখে বিভিন্ন জায়গায় মানুষ তাদের ভালো লাগার কথাগুলো বলেছেন প্রথম বাংলাদেশি সিনেমা হিসেবে এভাবে মানুষের মন জয় করাকে বিশেষ অনুভূতি হিসেবে দেখছেন তিনি।

সিনেমাটি নিয়ে রুবাইয়াত শিগগিরই উত্তর আমেরিকার টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।

চলতি বছরজুড়ে সিনেমাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যস্ততার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, "এরপর রয়েছে বিএফআই লন্ডন উৎসব।"

প্রায় দুই দশক ধরে এ সিনেমার ভাবনায় কাজ করছেন পরিচালক রুবাইয়াত। শৈশবে পার্লারের শোনা এক গল্প ও স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফিরত। সেই স্মৃতি থেকেই ঢাকার একটি বিউটি পার্লার, একটি বিয়ে আর ছোটবেলার এক ভয়ের গল্প ঘিরে নির্মিত হয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’।

এ বিষয়ে পরিচালক রুবাইয়াত বলেছিলেন, “সিনেমাটি দিয়ে আমরা বিউটি বলতে কী বুঝি, সেটাকে প্রশ্ন করতে চেয়েছি। রূপচর্চার এই প্রক্রিয়ার নিচে যে কতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে, তা দেখানোর চেষ্টা করেছি। সমাজ যেভাবে পার্লারের মাধ্যমে একটি মেয়েকে কৃত্রিম ছাঁচে নারী হিসেবে ম্যানুফ্যাকচার করে, সিনেমাটিতে সেটাই দেখানো হয়েছে।"

'দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড' সিনেমাটির আরেকটি বিশেষ দিক আছে। সেটি হল এর আবহ সঙ্গীত কম্পোজার ছাড়া প্রতিটি বিভাগের প্রধানই নারী। চিত্রগ্রহণ করেছেন পর্তুগালের লিওনর তেলেস (বার্লিনে গোল্ডেন বিয়ার বিজয়ী), প্রধান লাইটিং টেকনিশিয়ানকে ছিলেন ফ্রেদেরিকা আর গোমেজ, সম্পাদনায় ফ্রান্সের রাফায়েল মার্তা হোলগার এবং প্রোডাকশন ডিজাইনে ছিলেন ভারতের জোনাকী ভট্টাচার্য।

চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন চৌধুরী করিম। দেড় বছর এই প্রকল্পে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর অডিশনের মাধ্যমে তাকে প্রধান চরিত্রে বেছে নেওয়া হয়। 

সিনেমার অন্যান্য চরিত্রে আছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, আজমেরী হক বাঁধন ও দামীর খান।

‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড' এই বাংলাদেশি কলাকুশলীদের মধ্যে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন রাজীব রাফি, যাহিন শুহরাত ইসলাম ও সাদিয়া আনজুম। শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন সাদাব জাফর। সংগীত পরিচালনা করেছেন দামীর খান।

সিনেমাটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে, জার্মানি ও বাংলাদেশের খনা টকিজ।

চলতি বছরের মধ্যেই ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে সিনেমাটির আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ার সম্পন্ন হবে। আগামী বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সাধারণ দর্শকরা সিনেমাটি দেখতে পাবেন বলে জানিয়েছেন পরিচালক।