বাণিজ্যে অর্থপাচার ‘নিয়ন্ত্রণে’ এসেছে: বাংলাদেশ ব্যাংক

ব্যাংকার্স সভায় ব্যাংকগুলোকে তারল্য ব্যবস্থাপনায় সতর্ক হতে বলেছেন গভর্নর।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 31 Jan 2024, 05:39 PM
Updated : 31 Jan 2024, 05:39 PM

নানামুখী পদক্ষেপ ও কড়াকড়ির সুফল হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার ‘অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে’ আসার দাবি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিদেশি মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা মধ্যে গত দেড় বছর ধরে আমদানি-রপ্তানির তথ্য যাচাই বাছাই করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তদারকির কারণে ‘মানিলন্ডারিং নগন্য’ পর্যায়ে নামার কথা বুধবার বলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক।

এদিন ব্যাংক নির্বাহীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এজন্য ব্যাংকারদের ধন্যবাদ দিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন মুখপাত্র।

সভা শেষে মেজবাউল হক বলেন, “ট্রেডবেজড মানিলন্ডারিং কমিয়ে আনার যে উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়েছে, তা এখন অনেক কমেছে। আগে যে পরিমাণ মিসম্যাচ ছিল, এখন তা নেই। একেবারে নেগলিজেবল পর্যায়ে চলে এসেছে।“

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে ব্যাংকিং চ্যানেলে ‘আন্ডার ও ওভার ইনভেয়েসের’ মাধ্যমে অর্থপাচারের অভিযোগ বহু পুরনো। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও এ নিয়ে কথা বলে আসছিল।

বছর দেড়েক আগে বৈদেশিক মুদ্রা বাজার অস্থির হলে ডলারের যোগান বাড়াতে আমদানি-রপ্তানির তথ্য যাচাইয়ে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক। পণ্যমূল্যের চেয়ে ২০০ শতাংশ বেশি দেখিয়ে অর্থ পরিশোধ করার তথ্যও উঠে আসে তদন্তে।

আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ এর প্রধান মাসুদ বিশ্বাস এবং গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার একাধিক সভায় তা বলেছেন।

গত ২০২৩ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া বৈদেশিক বাণিজ্যে নজরদারির ক্ষেত্রে এমন কড়াকড়ি এখনও চালাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেড় বছর পর এখন এ বিষয়ে অগ্রগতি হওয়ার কথা বলল বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম মিলনায়তনে ব্যাংকার্স সভায় সভাপতিত্ব করেন আব্দুর রউফ তালুকদার। প্রতি তিন মাস অন্তর এ সভা হওয়ার কথা থাকলেও এবার তা হয় পাঁচ মাস পর।

একীভূত হবে দুর্বল ব্যাংক

সভায় ব্যাংক খাতের সুশাসন, তারল্য পরিস্থিতির উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার যোগান বাড়ানো, অফশোর ব্যাংকিং পরিচালনায় নতুন আইন তৈরি, দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

র্দুবল ব্যাংক নিয়ে আলোচনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ‘‘গভর্নর সব ব্যাংকারদের জানিয়েছেন কোন কোন সংস্কারের মধ্যে দিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। যাদের অবস্থা একেবারেই দুর্বল তাদের ঋণ বিতরণ, আমানত সংগ্রহ থেকে শুরু করে কার্যক্রমের উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। আবার কোনো কোনো ব্যাংককে একীভূত করেও দেওয়া হতে পারে।’’

আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে এসব ব্যাংক শাস্তির আওতায় আসবে না জানিয়ে তিনি বলেন, একীভূতের জন্য আইন হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন তা প্রয়োগে যেতে পারে।

টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল আর্থিক খাতের সংস্কার। দ্বাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণেও আর্থিক খাতের সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‍ঋণ কর্মসূচির শর্ত মেনে আর্থিক খাতের নানামুখী সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেই সংস্কারের আওতায় গত ডিসেম্বরে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে আনার ‍উদ্যোগ আসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে। শুরুতে ১০টি ব্যাংকের তালিকা করে এগুলো নিয়ে কাজ করার কথা জানানো হয়।

‘প্রমোম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ)’ নামের একটি কাঠামোর আওতায় কোন ব্যাংক কোন ক্যাটাগরিতে যাবে এবং কীভাবে বিশেষ নজরদারি করা হবে তাও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য একটি কমিটিও গঠন করে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা হচ্ছে।

পিসিএর আওতায় চলতি বছর সময় দিয়ে বলা হয়, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন মূল্যায়ণ করে একীভূতকরণ বা বিভিন্ন শ্রেণিতে তালিকা করে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এমন আলোচনার মধ্যে বুধবার অনিয়মের কারণে ঋণ সংকটে জর্জরিত পদ্মা ব্যাংকের পর্ষদ থেকে চেয়ারম্যানের পদ ছাড়লেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। এর আগে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুরোধে গত ডিসেম্বরে দুর্দশাগ্রস্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের পর্ষদ বাতিল করে নতুন পর্ষদ সাজায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

তারল্য ব্যবস্থাপনায় সর্তকতা

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলমান নীতিসুদ হার বাড়িয়ে বেশ কিছু দিন ধরে তারল্য সংকোচনের ধারা বজায় রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য ব্যাংকগুলোকে তারল্য ব্যবস্থাপনায় সতর্ক হতে গভর্নরের আহ্বান জানানোর তথ্যও দেন মেজবাউল হক।

বৈঠকের পর ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, ‘‘আমাদেরকে বাংলাদেশ ব্যাংক যেই ফ্রেমওয়ার্ক দিয়েছে সে অনুযায়ী ব্যাংক পরিচালনা করা হবে। ঋণ খেলাপিদের ধরতে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। সুশাসন ফেরাতে পদক্ষেপ সব ধরনের পদক্ষে নিতে গভর্নর নির্দেশ দিয়েছেন।’’

আরেক নির্বাহী মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘মার্জারসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ দুর্বল ব্যাংকগুলো যাতে ভালো ব্যাংকের সাথে মার্জ করে ভালো কিছু হয় সেই চিন্তা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’’