Published : 09 May 2026, 01:41 AM
রাজধানীতে পাঁচ বছর ধরে অটোরিকশা চালান এনামুল হক, বাজারের উত্তাপে এখন যার সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
তিনি বলছিলেন, আগে সামান্য কিছু সঞ্চয় করতে পারলেও এখন প্রতি মাসেই ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে তাকে।
বৃহস্পতিবার শেওড়া থেকে গুলশানে যাওয়ার সময় ৪০ বছর বয়সী এনামুল বলেন, এই পেশায় আয় যে খুব কম তাও নয়, প্রতিদিন সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। মালিককে ২ হাজার টাকা দেওয়ার পর কোনো দিন দেড় হাজার টাকা, কোনো দিন দুই হাজার টাকা থাকে।
স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে বাড্ডার ভাড়া বাসায় সংসার পাতা এই অটোচালক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “এখন খুব কষ্ট হচ্ছে, স্যার। আর চলছে না। হিসাব মেলাতে পারি না। এক কেজি চাল কিনতেই ৭০ টাকা লাগে। বাজারে সব কিছুর দাম অনেক বেশি।”

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস মূল্যস্ফীতি ও মজুরি সূচক প্রকাশ করে তাতে দেখা যাচ্ছে, শুধু এনামুল নয় দেশের সব শ্রমজীবী মানুষ, এমনকি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রকৃত আয় ‘কমছে’।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে থাকায় প্রকৃত মজুরির ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। এ কারণে বাস্তবে আয় বাড়লেও সঞ্চয় করা বা জীবনযাত্রার বাড়তি চাহিদা মেটানো তো দূরে থাক, সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।
দেশে মূল্যস্ফীতি ও মজুরি সূচক প্রকাশ করে বিবিএস। সংস্থাটি মাঠপর্যায় থেকে বিভিন্ন খাদ্য পণ্য ও সেবার দাম সংগ্রহ করে। সেই দামের ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হিসাব কষে তা প্রকাশ করা হয়।
একইভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত দিনমজুর ও শ্রমিকদের মজুরি বা বেতন-ভাতার হিসাব নিয়ে মজুরির হার প্রকাশ করে বিবিএস।
খরচ করার সামর্থ্য কমছে
টানা চার বছর দুই মাস বা ৫০ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে দেশে সার্বিক মূল্যম্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। কিন্তু পরের মাসে ফেব্রুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধি হারকে ছাপিয়ে যায় মূল্যস্ফীতি। সে মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ; তখন মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
তখন থেকেই উল্টোপথে চলছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই দুই সূচক। অর্থাৎ এই দীর্ঘ সময় ধরে মজুরি বাড়ার চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বেশি।

বিবিএসের এই তথ্যই বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মজুরি বৃদ্ধির বাড়তি টাকা দিয়েও দিনমজুর ও শ্রমিকদের সংসারই চলছে না, সঞ্চয় করা বা জীবনযাত্রার বাড়তি চাহিদা মেটানো তো দূরে থাক। পণ্য ও সেবার বাড়তি দাম খেয়ে ফেলছে বাড়তি আয়ের টাকা।
বুধবার এপ্রিল মাসের মূল্যস্ফীতি ও মজুরি সূচক প্রকাশ করেছে বিবিএস; তাতে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির পারদ আবার চড়েছে; ছাড়িয়েছে ৯ শতাংশ। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (গতবছরের একই মাস) অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এই সূচক ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে উঠেছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত-এ দুই উপখাতেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
টানা চার মাস বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠেছিল। মার্চ মাসে তা কমে ৯ শতাংশের নিচে, অর্থাৎ ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়ায়। কিন্তু এপ্রিলে ফের ৯ শতাংশ ছাড়াল।
অন্যদিকে এপ্রিলে মজুরি সূচকও কিছুটা বেড়ে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ।
সাধারণত মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি থাকে। মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার বেশি হলে জীবনযাপনের ব্যয় মেটাতে ধার-দেনা করতে হয় না। আর যদি মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি হয়, তাহলে হয় মানুষ ধার-কর্য করে সংসার চালায়, না হয় প্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ বাধ্য হয়ে মানুষকে কম খেতে হয়।
বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করলে এভাবে বলা যায়, এপ্রিল মাসে দেশে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মানে হল—২০২৫ সালের এপ্রিলে চাল, ডাল, তেল, লবণ, পোশাক, বাসাভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা খরচসহ জীবনযাপনের খরচ চালাতে যদি ১০০ টাকা খরচ হতো, তাহলে এ বছরের এপ্রিলে সেই খরচ বেড়ে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪ পয়সা।
এবার দেখা যাক, এই বাড়তি খরচ সামাল দিতে মানুষের আয় কতটা বাড়ল।
বিবিএস বলছে, জাতীয় মজুরি বেড়েছে বা বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর মানে—২০২৫ সালের এপ্রিলে যদি কারও আয় ১০০ টাকা হয়, তাহলে এপ্রিল মাসে তা বেড়ে হয়েছে ১০৮ টাকা ১৬ পয়সা।
ফলে আয় খানিকটা বাড়লেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় একই পণ্য ও সেবার জন্য বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অথবা খরচের ফর্দ কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
আয় বাড়লেও খরচ যখন তার তুলনায় বেশি বাড়ে, তখন ‘প্রকৃত’ আয় কমে যায়। বাংলাদেশে ঠিক তাই ঘটছে, যা ৫০ মাস আগে দেখা যায়নি।

এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন অর্থনীতি গবেষক সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও মজুরি সূচকের তথ্য নিয়ে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলেও কিন্তু আমরা উদ্বেগজনক একটি তথ্য দেখতে পাচ্ছি। সেটি হচ্ছে— মূল্যস্ফীতি প্রকৃত মজুরির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ বাস্তবে আয় বাড়লেও মূল্যস্ফীতি তা খেয়ে ফেলছে।
“বাজারের খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বাড়ছে না। দীর্ঘ সময় ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি। মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। খরচ করার সামর্থ্য কমছে। অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। অনেকের তো সঞ্চয়ও নেই।”
ইরান যুদ্ধোর কারণে জ্বালানি সংকটের মধ্যে এপ্রিলের মাঝামাঝি সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেকখানি বাড়ায়। যদিও মে মাসে জ্বালানি তেলের দাম আর বাড়েনি। তবে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, যা আরেক দফা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সম্ভবত মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রেখেছে, বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান।
তার মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন, উৎপাদন, সেচ, সংরক্ষণ ও বিতরণ খরচ বেড়ে যায়, যা দামে প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, “এপ্রিলের মূল্যস্ফীতির চিত্রে গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর চাপ বিশেষভাবে স্পষ্ট। এই বৃদ্ধি গ্রামীণ দরিদ্র, ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের জন্য বড় সংকট তৈরি করছে। কারণ তাদের আয় অনিশ্চিত, সঞ্চয় সীমিত এবং বাজার থেকে কেনা খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি।”
“তাই গ্রামীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো নয়, কৃষি উপকরণের দাম, পরিবহন ব্যয়, স্থানীয় বাজার তদারকি এবং গ্রামীণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে,” বলেন তিনি।

দেশে মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান কত?
বিবিএস প্রতি মাসে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি কৃষিশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, বিড়িশ্রমিক, জেলে, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিকসহ ৪৪ ধরনের পেশাজীবীর মজুরির তথ্য সংগ্রহ করে মজুরি হার হিসাব করে। এসব পেশাজীবীর মজুরি খুব কম এবং দক্ষতাও কম। শুধু দৈনিক ভিত্তিতে মজুরি পান—তার ভিত্তিতে কোন মাসে মজুরি হার কত বাড়ল, তা প্রকাশ করে বিবিএস।
বিবিএস যে ৪৪ ধরনের পেশাজীবীর মজুরির তথ্য নেয়, তার মধ্যে ২২টি শিল্পখাতের এবং ১১টি করে কৃষি ও সেবাখাতের পেশা। বেতনভোগী কিংবা উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের বিবিএসের মজুরি সূচকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
সংস্থার ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের চূড়ান্ত ফলাফল গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশ করা হয়। তাতে দেখা যায়, দেশে কর্মে নিয়োজিতদের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। আর ১৬ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন।
পল্লী এলাকায় বা গ্রামাঞ্চলে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন ৮৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ, শহরে ৭৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুল শ্রমশক্তি এখনো সুরক্ষাহীন, সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত।
উল্টোপথে দুই সূচক
সাধারণত প্রতি মাসে যত মূল্যস্ফীতি হয়, এর বেশি হারে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধির হারকে টপকে যায় পর এখন পর্যন্ত আর মূল্যস্ফীতির নাগাল পায়নি।
বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, ওই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ।
এরপর আর কোনোমাসেই মূল্যস্ফীতিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি মজুরি। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মজুরি বৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘর ছোঁয়। অন্যদিকে, মার্চের পর থেকে ওই বছরের পরের নয় মাসে মূল্যস্ফীতি ৭ থেকে ৮ শতাংশের ঘর পেরিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায়।
২০২৩ সালের মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে দাঁড়ায়, যা ছিল এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অর্থনীতির সংকটের মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়, যা পরবর্তীতে সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে রূপ নেয়। ব্যাপক সংঘর্ষ, প্রাণহানি, ইন্টারনেট বন্ধ এবং কারফিউর মধ্য দিয়ে ৫ অগাস্ট আওযামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
আন্দোলনের ওই মাসে অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি এক ধাক্কায় বেড়ে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠে যায়। অবশ্য পরের মাস অগাস্টে কমে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে আসে।
জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পরের কয়েক মাস সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করছিল। ১০ দশশিক শূন্য ৩ শতাংশ সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে শেষ হয়েছিল অভ্যুত্থান আর অস্থিরতার সে বছরটি।

তার ছয় মাস পর, অর্থাৎ গত বছরের জুনে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল; যা ছিল ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২২ সালের জুলাইয়ে এর চেয়ে কম মূল্যস্ফীতি হয়েছিল।
তারপর আবার বাড়লেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরটিও শুরু হয়েছে এক অংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ে। এ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। পরের মাস অগাস্টে এই হার ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমে আসে। সেপ্টেম্বরে কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অক্টোবরে আবার কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে।
এর পর থেকে আবার চড়তে থাকে; নভেম্বরে ওঠে যায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। ডিসেম্বরে আরো একটু বেড়ে হয় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। ফেব্রুয়ারিতে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে। মার্চে কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নামলেও সবশেষ এপ্রিলে ফের ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
মূল্যস্ফীতির হারের এমন ওঠা-নামার মধ্যেও মজুরি সূচক ৯ শতাংশে পৌঁছতে পারেনি।
আন্দোলনের বছরে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১২ শতাংশে ওঠে গেলেও মজুরি বৃদ্ধির হার কিন্তু ৯ শতাংশের ঘরেও পৌঁছায়নি। বছরটি শেষ হয়েছিল ৮ দশমিক ১৪ শতাংশে রেখে।
বিবিএসের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধির হার কিছু বেড়ে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশে ওঠে। ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ৮ দশমিক ১২ শতাংশে নেমে আসে। মার্চে মজুরি সূচক বেড়ে হয় ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। এপ্রিলে আরও কিছুটা বেড়ে ৮ দশমিক ১৯ শতাংশে ওঠে। মে মাসে তা আরও বেড়ে ৮ দশমিক ২১ শতাংশ হয়। তবে জুনে কমে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশে নেমে আসে।
অন্যদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মজুরি সূচক অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। অগাস্টে ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ; সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ০২ শতাংশ।
এরপর অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ০১, ৮ দশমিক ০৪ ও ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ।
চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৮। ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ৮ দশমিক ০৬ শতাংশে নেমে আসে। মার্চ মাসে বেড়ে ৮ দশমিক ০৯ আর এপ্রিলে আরও কিছুটা বেড়ে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছায়।

বিবিএসের তথ্যই বলছে, টানা ৫০ মাস মূল্যস্ফীতি যে হারে ওঠা-নামা করেছে, যে হারে মজুরি বাড়েওনি, আবার কমেনি, বাড়া-কমার পার্থক্য ছিল সামান্য। কিন্তু এ সময় কখনো ডিমের দাম বেড়েছে, সবজির দাম কমতে দেখা গেছে কম। বরং মাছ, মুরগি, গরুর মাংসের দাম বেড়েছে।
ঢাকা স্কুল অব ইকনোমিকসের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। মাঝে কিছুদিন ডিমের দাম কম থাকলেও এখন আবার বেড়েছে। ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবকিছুর দামের ওপর পড়েছে।”
কৃষি অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, “সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে—আমাদের প্রধান খাদ্য পণ্য চালের দামও ঊর্ধ্বমুখী। কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমার হিসাবে এবার ১০ শতাংশ বোরো উৎপাদন কম হবে। এতে চালের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।”
সুদহার বাড়ালেও কমছে না মূল্যস্ফীতি
মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছুদিন ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির পারদ কাঙ্খিত মাত্রায় নামছে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নীতি সুদহার বাড়ানোর পথে হাঁটে।
২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসে সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতিতেও নীতি সুদহার (পলিসি রেট বা রেপো রেট) ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ।
এরপর ৩১ অগাস্ট ঘোষিত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতেও নীতি সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়। তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
মূল্যস্ফীতি যতদিন ৭ শতাংশের নিচে না নামবে, ততদিন নীতি সুদহার কমবে না বলে মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় স্পষ্টভাবে বলে দেন তখনকার গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তিনদিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি আহসান মনসুর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্যও আঁটসাঁট মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নেমে না আসায় নীতি সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেপোর মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো একদিনের জন্য টাকা ধার নেয়। একে বলা হয় ব্যাংকিং খাতের নীতি উপাদান (পলিসি টুলস)। এর সুদহারকে বলা হয় নীতি সুদহার বা রেপো রেট। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে।
রেপোর সুদ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর তহবিল পাওয়ার খরচ আরও বাড়ে। তাতে ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সুদহার বেড়ে যায়।
এই হার অপরিবর্তিত রাখার মানে হল, বাজারে মুদ্রাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত সুদহারের লাগাম শিথিল করছে না।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির লাগামা টেনে ধরতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে; কোনো কোনো পণ্যের শুল্ক শূন্য করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে সুদহার ১০ শতাংশে রেখে এবং পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েও মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যাচ্ছে না।
ঢাকা স্কুল অব ইকনোমিকসের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে হলে শুধু কঠিন মুদ্রানীতি দিয়ে হবে না, বাজার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।”