Published : 25 Aug 2026, 09:51 PM
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘স্থিতিশীলতার লক্ষণ’ দেখা গেলেও সামগ্রিক কর্মকাণ্ড এখনও ধীর বলে মনে করছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)।
দেশের সবচেয়ে পুরনো এবং শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য সংগঠনটি বলেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাথমিক হিসাবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে; যা আগের আর্থিক বছরের (২০২৪-২৫) বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। জুন মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ ছিল; যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে।
অন্যদিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের ইতিবাচক ধারার কারণে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় আছে। এর ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আরও জোরদার হয়েছে।
এমসিসিআইয়ের ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির এই চিত্র উঠে এসেছে। মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাময়িক হিসাবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়েছে। আগের অর্থবছরে যা ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধি দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার তুলনায় এখনো কম।
এই আর্থিক বছরের শেষ প্রান্তিকে (চতুর্থ প্রান্তিক, এপ্রিল-জুন) অর্থনীতি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও সামগ্রিকভাবে তা দুর্বলই ছিল। উচ্চ সুদের হার ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণের প্রবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা সীমিত ছিল। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতও ছিল চাপের মধ্যে। পাশাপাশি রাজস্ব সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিও অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
সামগ্রিকভাবে, এই প্রান্তিকটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমন্বয় থেকে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি পর্যায়কে নির্দেশ করে। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক খাতের স্থিতিস্থাপকতা বা সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আগামী দিনে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বৃদ্ধি করা এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
রেমিটেন্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাপ কাটেনি দাবি করে এমসিসিআই বলছে, এ পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ফেরানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো, এসবই এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে সামগ্রিকভাবে এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে মনে করছে এমসিসিআই। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ, অর্থনীতির এই পুনরুদ্ধারকে টেকসই করতে মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটাতে হবে। বাড়াতে হবে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ। সেই সঙ্গে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও তা এখনও বড় উদ্বেগের বিষয়। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে, মে মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়েছে। তবে খাদ্যবর্হিভূত পণ্য ও জ্বালানির দামের চাপ এখনো মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।
এরই মধ্যে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। তাতে দেখা যায়, জুলাই মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ জুনের চেয়ে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি বেশ খানিকটা কমেছে।
এমসিসিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈদেশিক খাত অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে। এপ্রিল-জুন সময়ে দেশে ৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। জুন শেষে মোট রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে, মে শেষে যা ছিল ৩৪ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
তবে রপ্তানি খাতে সেই স্বস্তির প্রতিফলন দেখা যায়নি। জুনে রপ্তানি আয় অনেকটা বেড়ে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন উঠলেও পুরো অর্থবছরে রপ্তানি আয় কমেছে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ।
দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল। এর বড় নজির বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের ধীরগতি বলেও মনে করছে এমসিসিআই। সংগঠনটি বলছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুন মাসের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
রাজস্ব ও সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও চাপ আছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। তবে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার চেয়ে আদায় কম হয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা বা ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ।
একই সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমেছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
তবে বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক হিসাবে বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে তথ্য দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। তবে এই উদ্বৃত্তের বিপরীতে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে।
নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ দশমিক ০২ শতাংশ কমে নেমেছে ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে।