Published : 30 Nov 2024, 07:43 PM
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ না হতে ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। বলেছেন, “তিন-চার মাসে সব ঠিক হবে, সেই আশাবাদ একটু উচ্চাভিলাষী।”
শনিবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত বাণিজ্য সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি।
অবশ্য অর্থনীতিতে ‘কিছুটা স্থিতিশীলতা’ আসার দাবিও করেছেন উপদেষ্টা।
গত ১৫ বছরে অর্থনীতির ‘ব্যাপক ক্ষতি’ হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “তা শুধুমাত্র প্যালিয়েটিভ জোলাপ আর প্যারাসিটামল দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে উপকারী হবে।”
টাকা ছাপানোর ব্যাখ্যা
বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে ছাপিয়ে টাকা দেবে না- এমন অবস্থান নেওয়ার চার মাস যেতে না যেতেই কেন সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা ছাপানো হয়েছে, সে বিষয়েও বক্তব্য রাখেন অর্থ উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “গভর্নর দিতে চান নাই, আমি বলেছি দাও। একুট স্থিতিশীল করি।
“পত্রিকায় আবার লেখা হল, নতুন মুদ্রা ছাপানো হবে। টাকা তো ছাপাতে হবেই, টাকা তো এমনিতেই নষ্ট হয়ে যায়। এমন ভাব বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়েছে, এর আগে ৬০ হাজার কোটি টাকা যেভাবে ছাপিয়েছে, সেটা ঠিক না।”
বেসরকারি খাতে ঋণ সরবরাহ কোনোভাবেই কমানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন সালেহউদ্দিন। তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে কেউ টাকা পাচার করতে পারবে না।”
অবস্থার দ্রুত উন্নয়ন হবে: বাণিজ্য উপদেষ্টা
সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারের সাথে বেসরকারিখাতের সমন্বয় আবশ্যক এবং বিদ্যমান অবস্থার দ্রুত উন্নতি হবে।”
আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের বাণিজ্য সম্প্রসারণে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মত প্রকাশ করে তিনি বলেন, “কেননা এলডিসি পরবর্তী সময়ে আমরা বেশ কিছু অগ্রাধিকার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে, এর পাশাপাশি সহায়ক নীতিমালার কোন বিকল্প নেই।”
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগামী বছরের শুরুতেই নীতি সুদ হার এবং সুদহার ক্রমান্বয়ে হ্রাসকরণের পাশাপাশি সরকারি ব্যয় হ্রাস, বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, পণ্য ব্যবস্থাপনায় চাঁদাবাজি রোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।”
‘কঠিন সময়’
সম্মেলনে ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে অর্থনীতি নিয়ে কঠিন বাস্তবতা উঠে আসে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার মেনুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।”
আমদানি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, “পাশাপাশি কমেছে উৎপাদিত পণ্যের মূল্যসংযোজন।
“গ্যাসের সংকটের অভাবে আমরা ফেব্রিক্স তৈরি করতে পারছি না। ফলে এ ধরনের পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় হচ্ছে।”
ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মোক্তাদির বলেন, “সম্প্রতি বাংলাদেশ কঠিন সময় পার করলেও কিছু ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যার সুফল আসবে।
“শিল্পকারখানায় অস্থিরতা কোনোভাবেই কাম্য নয়, তাই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন সুনির্দিষ্ট সময়সীমাসহ রোডম্যাপ থাকতে হবে।”
দেশে বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তাই কয়লার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিলেই শিল্প খাতে আরও বেশি হারে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে।”
প্রাণ আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সিইও আহসান খান চৌধুরী বলেন, “ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনের নিরিখে এলসি খুলতে না পারলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান দুটোই ব্যাহত হবে।”
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হলেই ব্যবসার উন্নয়ন আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ঋণের সুদের হার হ্রাস কমানো প্রয়োজন বলে মত দেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস অ্যাসোসিয়েশন- বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা বেশ পিছিয়ে রয়েছি। এক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।”
ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সভাপতি সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন সরকারের পক্ষ হতে এখনও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়নি, তবে দ্রুতই এটি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।”
তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিই যথেষ্ট নয়, বরং পণ্যের সাপ্লাই চেইনে চাঁদাবাজি বন্ধসহ বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।”
বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির সভাপতি আব্দুল হাই সরকার বলেন, “আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”
“জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত ছাড়া শিল্প উন্নয়ন সম্ভব নয়, এ অবস্থার উন্নয়ন জরুরি”- এই বিষয়টিও স্মরণ করান তিনি।
ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-ফিকির সভাপতি জাভেদ আখতার বলেন, “বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা, ধারাবাহিকতা ও সক্ষমতা একান্ত অপরিহার্য।”
মুক্ত আলোচনায় ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান রোমো রউফ চৌধুরী, ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ, রিজওয়ান রাহমানও অংশ নেন।
বক্তারা ব্যবসায়ীদের হয়রানি রোধ, ভোটের স্বার্থে পকেট অ্যাসোসিয়েশন তৈরি বন্ধ করা এবং হোল্ডিং ট্যাক্স না বাড়ানোর দাবি জানান।
ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী, সহ-সভাপতি মো. জুনায়েদ ইবনে আলী, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, প্রাক্তন সভাপতিসহ বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।