Published : 10 Feb 2026, 03:16 PM
অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিজের কাজের মূল্যায়নে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ নম্বর দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেছেন, “অনেক উদ্যোগ শুরু করা গেলেও সবকিছু শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও জনগণের স্বার্থে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছাড়াই কাজ শুরু করা হয়েছে, সেটিই বড় অর্জন।”
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমি খুব প্রাগমেটিক মানুষ। নিজেকে ১০০ নম্বর কেন দেব? আমাদের অনেক ইচ্ছা ছিল, অনেক কাজ শুরু করেছি; কিন্তু সব শেষ করে যেতে পারিনি। সে কারণেই আমি নিজেকে ৭০ বা ৮০-এর বেশি দিতে রাজি নই।
“অন্তর্বর্তী সময়ে অর্থনীতি পরিচালনা করা সহজ ছিল না। কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে।”
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কর সংস্কারের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই দায়িত্ব ছাড়তে হচ্ছে মন্তব্য করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “এনবিআরকে কার্যকর করতে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হলেও নীতিগত সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। পলিসি ডিভিশনগুলো যদি আরও আগে থেকে পুরোপুরি কাজ শুরু করতে পারত, তাহলে ফলাফল আরও ভালো হতো।”
তবে কর নীতিমালার একটি গাইডলাইন রিপোর্ট রেখে যাচ্ছেন জানিয়ে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যা পরবর্তী সরকারের জন্য সহায়ক হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক খাতে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কেবল আইনে গভর্নরের মর্যাদা বাড়ালেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। অপারেশনাল সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা জরুরি।”
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চার বছর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বড় কোনো সরকারি হস্তক্ষেপের মুখে পড়েননি।
ব্যাংক খাতে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে মন্তব্য করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “খেলাপি ঋণ, আস্থাহীনতা ও সীমিত ক্রেডিট সাপ্লাই অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে আমানত কিছুটা বেড়েছে, তবু পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।”
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান। ব্যবসা ও শিল্প সচল না হলে কর্মসংস্থান আসবে না। কর্মসংস্থান না হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে না।
“মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যার সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় জড়িত।”
পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আদালতকেন্দ্রিক জটিলতা ও দীর্ঘদিনের সমস্যার কারণে সংস্কার কার্যক্রম ধীরগতির হয়েছে। তবে ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ইকুইটি ও বন্ড মার্কেট উন্নয়ন অপরিহার্য।
“বিশ্বের সব দেশেই প্রাইভেট সেক্টরের জন্য শেয়ার ও বন্ড মার্কেট গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়।”
অর্থ পাচার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “কোন কোন দেশে, কারা অর্থ পাচার করেছে—সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অংক বলা কঠিন।বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের মতো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
“বেসটা তৈরি হয়েছে। পরবর্তী সরকার যদি সিরিয়াস হয়, তাহলে এই তথ্যগুলো কাজে লাগাতে পারবে।”
ভবিষ্যৎ সরকারের উদ্দেশে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “নতুন করে সব আবিষ্কার করার দরকার নেই। আমরা যা করেছি, সেটাকে কনসলিডেট করুন। ভালো জিনিসগুলো ধরে রাখুন। সবচেয়ে জরুরি হলো সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো।”
নিজের জবাবদিহিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক আগেই সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতার আশঙ্কাও দেখছেন না তিনি।
গণমাধ্যমের উদ্দেশে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “সমালোচনা করবেন, কিন্তু পুরো চিত্রটা দেখবেন। ১৭–১৮ মাসে কিছুই করা হয়নি—এমন বলা ঠিক নয়।
“অনেক কাজ শুরু হয়েছে, যেগুলোর ফল সামনে দেখা যাবে।”