Published : 30 Jun 2026, 04:05 PM
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় এবারও সংকোচনমূলক নীতি বহাল রেখে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেখানে নীতি সুদহার আগের মতই ১০ শতাংশ রাখা হয়েছে।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে সংবাদ সম্মেলনে নতুন অর্থবছরের প্রথমার্ধের এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন।
ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান মুদ্রানীতির বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন। পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় তিনি বলেন, আগামী মুদ্রানীতিও ‘সংকোচনমূলক ধারা’ বজায় রাখা হবে। নীতি সুদহারে কোনো পরিবর্তন না এনে ১০ শতাংশ বহাল থাকবে।
নতুন মুদ্রানীতিতে চাহিদা কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হারও অনেক কমানো হয়। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা জুন শেষে সাড়ে ৮ শতাংশ হওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। তবে গত এপ্রিল শেষে এ খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে।
একই সঙ্গে নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ছয় মাসে সার্বিকভাবে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। চলমান মুদ্রানীতিতে এ হার সাড়ে ১১ শতাংশ। এর বিপরীতে গত এপ্রিল শেষে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
নতুন মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। চলমান মুদ্রানীতিতে এ হার ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। এর বিপরীতে গত এপ্রিল শেষে ঋণ প্রবাহ ছিল ৩০ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যান্য সুদহারের মধ্যে স্টান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) রেট সাড়ে ১১ শতাংশ ও স্টান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) আগের মতই সাড়ে ৭ শতাংশ একই রাখা হয়েছে।
নতুন মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ মূলত সেবাখাত নির্ভর হয়ে গেছে। শিল্প ঋণে প্রবৃদ্ধি সেভাবে হয়নি।
আগামী ছয় মাসের মুদ্রানীতিতে শিল্প ঋণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় কৃষি ও এসএমই খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন গভর্নর।
এদিকে অর্থনীতি সচল করতে বন্ধ কারখানা চালু করাসহ ৬০ হাজার কোটি টাকার যে বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, সেসব কোম্পানির সবগুলোকে ঋণ না দেওয়ার কথাও সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন তিনি।
মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘‘এবার আমরা কিন্তু অনেক শর্ত দিয়েছি। চাইলেই সব বন্ধ কোম্পানি ঋণ নিতে পারবেন না। যাদের জ্বালানি, বিদ্যুত-গ্যাসের সমস্যা রয়েছে, তারা পাবেন না। কারণ তারা তো ঘুড়ে দাড়াতে পারবেন না।
‘‘যাদের শুধু অর্থ সংকট রয়েছে, কোম্পানি ভালো করার সুযোগ দেখা যাবে ব্যাংকগুলো তাদেরই ঋণ দেবে।’’
খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের বারবার সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নে গভর্নর বলেন, ‘‘অতীতে ঋণ প্যাকেজের সুবিধা দেওয়া নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। আমরা সেসব সমালোচনা পর্যালোচনা করেছি। হয়ত কোনো সমস্যা ছিল, তাই যথাযথ ফল সেভাবে আসেনি।’’
তিনি বলেন, ‘‘অন্য কোনো কারণে যদি বন্ধ হয়ে থাকে, যেমন জ্বালানি, মার্কেটিং কিংবা ম্যানেজমেন্ট ফেইলর-সেগুলোর সমাধান করে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ দিতে হবে ব্যাংকের। এটি এমন না যে, কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে-কেউ আসলে তাকে টাকা দিয়ে দিতে হবে।’’

মোস্তাকুর রহমান গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত প্রথম মুদ্রানীতি, যেখানে সরকারের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সহায়ক অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করার জন্য তারল্য নিয়ন্ত্রণের কৌশল সাজানো হয়েছে।
সরকারের আর্থিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে কী পরিমাণ অর্থের সরবরাহ থাকবে, সেটির সম্ভাব্য পরিকল্পনা থাকে মুদ্রানীতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাস অন্তর মুদ্রানীতি ঘোষণা করে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত সর্বশেষ মুদ্রানীতির ধারাও ছিল সংকোচনমূলক, তখনও নীতি সুদহার ১০ শতাংশ ছিল।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়াতে শুরু করে। তারপরও ২০২৪ সালে মূল্যস্ফীতি দুই অংক ছড়িয়ে যায় এবং ওই বছর জুলাই মাসে রেকর্ড ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়।
ওই মাস থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্ধীদের আন্দোলন পরের মাসে অভ্যুত্থানের রূপ নিলে ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরোমাত্রায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেওয়া হয়। তাতে মূল্যস্ফীতিও কমে আসতে শুরু করে। তবে এখনো তা ৯ শতাংশের উপরে রয়েছে।
ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, “বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ ধরা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে মূল্যস্ফীতিও অন্তত সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।”