Published : 27 May 2025, 08:44 AM
প্রতিদিন সকালে উঠে পেটের তাগিদে পথে নামলেই মিলছে কারো না কারো আন্দোলনের খবর। সামনে বাজেট, এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীরাও মাঠে নেমে গেছেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা হবে জুনের ২ তারিখ। আর এই বাজেট তৈরির কাজে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দারুণ ব্যস্ততা যায় এ সময়টায়।
এর মধ্যে এনবিআরের কর্মকর্তারাও আন্দোলনে নেমেছেন। সরকারি চাকরির অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চলছে সচিবালয়ে। ঢাকা দক্ষিণে সিটি করপোরেশনে মেয়র পদ নিয়েও বেশ কিছুদিন ধরে অচল নগর ভবন।
এনবিআরের কর্মকর্তারা গেল রোববার কর্মবিরতির কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও চেয়ারম্যানকে অপসারণের দাবিতে তাদের ‘অসহযোগ’ চলছে।
এদিকে অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ‘পদত্যাগের ভাবনার’ খবর রাজনীতির অঙ্গনেও অস্থিরতা বাড়িয়েছে। শনি ও রোববার সদুই ডজন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ম্যারাথন বৈঠক করেছেন তিনি।
সেসব বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলো ইউনূস সরকারকে সমর্থনের কথা জানিয়ে এলেও যার যার দাবিতে অনড় থাকার কথাই বলেছে। সব মিলিয়ে অস্থিরতা কাটার লক্ষণ রাজনীতিতে নেই।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অনির্বাচিত সরকার বাজেট দেবে এবার। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও জুলাই অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতির চাকা আর পুরোদমে সচল হতে পারেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন আন্দোলনে বাজেট প্রণয়নে খুব বেশি প্রভাব হয়ত পড়বে না, কিন্তু এই ধারা চলতে থাকলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাতে অর্থনীতি ভুগবে, ভুগবে মানুষ। দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও সংস্কারেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সামনের বাজেটের কাজ তো হয়ে যাওয়ার কথা। বাজেটের সংখ্যাগুলো তো নির্ধারিত। ভেটিংয়ে তো খুব একটা পরিবর্তন হয় না। মন্ত্রণালয়গুলোতে আলোচনার পর্ব শেষ। সেজন্য বাজেট প্রস্তুতিতে এটার প্রভাব খুব একটা পড়ার সুযোগ নেই।
“তবে, এত নানা প্রকারের আন্দোলন প্রতিদিনই রাজপথে, এত মানুষের দুর্ভোগ, এগুলো তো অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। আন্দোলনের যতই যৌক্তিকতা থাকুক, আমরা তো দেখছি যৌক্তিক-অযৌক্তিক সব ক্ষেত্রেই মানুষ রাজপথে নেমে পড়ছে। তিন-চার ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এভাবে অর্থনীতির হাঁটুটা ভেঙে যায়, দুর্বল হয়ে যায়। রাজপথটা একেবারে শেষ অবলম্বন হওয়া উচিত।”

চলমান যত আন্দোলন
গত ১২ মে রাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভাগ করে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অধ্যাদেশ জারি করে সরকার।
পরদিন থেকে তা বাতিলের দাবিতে অবস্থান ও কলমবিরতি কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন দেশের প্রধান রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাটির কর্মীরা।
তাদের আন্দোলনের মুখে অর্থ মন্ত্রণালয় এখন বলছে, এনবিআর বিলুপ্ত নয়, বরং এ প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বাধীন ও বিশেষায়িত’ বিভাগের মর্যাদায় উন্নীত করা হবে।
সেজন্য ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ওই অধ্যাদেশে সংশোধন করা হবে। এনবিআর, রাজস্ব সংস্কার বিষয়ক পরামর্শক কমিটি এবং ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে বলে মন্ত্রণালয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এরপর আন্দোলন প্রত্যাহার করে এক বিবৃতিতে পরিষদ নেতারা বলেছেন, তাদের দাবি ‘যৌক্তিক’ প্রমাণিত হয়েছে।
তবে, এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবি না মানায় সোমবার নতুন করে তিন দিন সময় বেঁধে দিয়েছে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষদ নেতারা বলেছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের প্রতি কর্মীদের ‘বিশ্বাস ও আস্থার চরম সংকট’ তৈরি হয়েছে। সুতরাং আগামী ২৯ মের মধ্যে তাকে অপসারণ করতে হবে।

এদিকে সরকারি চাকরি আইন সংশোধনের অধ্যাদেশ জারির প্রতিবাদে সচিবালয়ে বিক্ষোভ করছেন কর্মচারীরা।
রোববার রাতে ওই অধ্যাদেশ জারির পর সোমবার খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে কর্মচারীরা সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের পাশে বাদামতলায় জড়ো হতে থাকেন।
এ সময় তারা ওই অধ্যাদেশকে ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ আইন পাস করার জন্য সচিবালয়ে দায়িত্বরত ছয় চুক্তিভিত্তিক সচিবের নিয়োগ বাতিলেরও দাবি জানান তারা।
বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদ সরকারি চাকরি আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ আকারে জারি করার প্রস্তাবে সায় দেয়।
এর প্রতিবাদে রোববার সকাল থেকে দিনভর সচিবালয়ে বিক্ষোভ করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা সেখানে মিছিলও করেন।
তাদের আপত্তির মধ্যেই রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রোববার রাতে অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
এদিকে, বিএনপি নেতা ইশরাক হোসনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে শপথ পড়ানোর দাবিতে ১৪ মে থেকে নগর ভবন অবরুদ্ধ করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তার অনুসারীরা।
তিন দফা দাবি আদায়ে আন্দোলনে নেমেছেন প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরাও। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের সংগঠনগুলোর মোর্চা-প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের ব্যানারে এ কর্মসূচি চলছে।
আন্দোলনকারী সহকারী শিক্ষকদের তিন দফা দাবি হল- সহকারী শিক্ষক পদকে এন্ট্রি পদ ধরে একাদশ গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, চাকরির ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার জটিলতা নিরসন ও প্রধান শিক্ষকের শতভাগ পদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতিসহ দ্রুত পদোন্নতি।
এদিকে, মঙ্গলবার থেকে সারাদেশে কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

রাজস্ব আদায়ে বিপুল ঘাটতি
জুলাই-অগাস্টের রাজনৈতিক ডামাডোল সামলে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি এলেও ঘাটতিতে লাগাম টানতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
অগাস্টের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকার রাজপথ দখল হয়ে থাকছে। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরে তো বটেই, সামনের বাজেটেও রাজস্ব লক্ষমাত্রা অর্জিত হবে কিনা সেটি নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর নানা পদক্ষেপের পরও চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি ছাড়িয়ে গেছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা।
ফেব্রুয়ারি শেষে এ ঘাটতি ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে, এক মাসে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস (জুলাই-এপ্রিল) শেষে রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা।
দশ মাস শেষে আয়কর, ভ্যাট কিংবা শুল্ক, কোনো খাতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি সরকারি এই সংস্থা।
অর্থ বছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের ১০ মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৪২ কোটি টাকা।
সেই হিসেবে আদায় গত বছরের তুলনায় বেশি। কিন্তু ঘাটতির বিষয়টা ভাবাচ্ছে অর্থনীতিবিদদের।

বাজেট প্রণয়ন কতদূর?
আন্দোলন কর্মসূচির জন্য বাজেট কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে এনবিআরের নীতি শাখার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, প্রথম থেকেই বাজেট কার্যক্রম আন্দোলন কর্মসূচির আওতামুক্ত ছিল, বিষয়টি জানানো হয়েছিল।
“পরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মিটিংয়ের মধ্য দিয়ে ১৯ মে বাজেটের সবকিছু মৌখিক অনুমোদন মিললে আমাদের দিক থেকে আর কাজ থাকে না। ফলে কর্মসূচির মধ্যে আলাদা করে বাজেট কার্যক্রম আওতামুক্ত বলা হয়নি।”
বাজেটের কাজ কতদূর এগিয়েছে জানতে চাইলে আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, “শুল্ক, আয়কর ও ভ্যাটের সবকিছু আলাদাভাবে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিং হয়ে গেছে। সোমবার অর্থ আইনে যেসব পরিবর্তন হয়েছে, তা তিন অনুবিভাগ মিলে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে গেছে।
“এরপর এটা আইন উপদেষ্টার কাছে যাবে। সেখান থেকে উপদেষ্টা পরিষদ হয়ে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য যাবে। আমাদের দিক থেকে কিছু আর নাই। রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দিলে পরে বিজি প্রেস থেকে ছাপানো হবে।”

আন্দোলনের প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে
বাজেট প্রণয়নে প্রভাব না পড়লেও এভাবে প্রতিদিনই আন্দোলন চললে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সুনির্দিষ্টভাবে কোনো আন্দলনের কথা বলছি না। কিন্তু, বাজেট যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে একটা ইতিবাচক পরিবেশ অবশ্যই লাগবে। যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মসৃণভাবে চলতে পারে।
“এটা যাতে নিশ্চিত করা যায়, সেজন্য সকল অংশীজনের সাথে একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ড করতে হবে। তার ব্যত্যয় হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।”
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং-সানেম এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাজেট ফর্মুলেশনে হয়ত কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ, বাজেট ফর্মুলেশন তো সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হয়।
“কিন্তু যেটা উদ্বেগের সেটা হচ্ছে, যদি অস্থিরতা চলে প্রশাসনে এবং বিভিন্ন জায়গায়, সেক্ষেত্রে অর্থনীতির যে তার স্বাভাবিক গতিপথে ফিরে আসার সম্ভাবনাগুলো, সেগুলো তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, আমাদের অর্থনীতি ইতোমধ্যে যথেষ্ট রকম সংকটের মধ্যে আছে।”
তিনি বলেন, “বাজেটে হয়ত কিছু উদ্যোগ নেওয়া হবে অর্থনীতির গতি ফেরাতে। কিন্তু যে অস্থিরতাগুলো বিভিন্ন স্তরে দেখছি, রাজনীতিতে, প্রশাসনে এমনকি শ্রমিক পর্যায়ে, ফ্যাক্টরি পর্যায়ে। ল অ্যান্ড অর্ডার সিচুয়েশনও বিভিন্ন জায়গায় ঠিকমত হয়নি। এগুলো অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।”
সেলিম রায়হানের মতে, আন্দোলনের ফলে অন্য সংস্কারের মত অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগগুলোও আগাবে না। এটাকে তিনি সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করেন।
“আপনি দেখলেন যে এনবিআরের সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে কিরকম হল। এখন আবার আগের নীতিতে ফিরে যেতে হচ্ছে। অন্যান্য সংস্কারের ক্ষেত্রেও আমরা দেখছি খুব বেশি আগাতে পারছে না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এ অধ্যাপক বলেন, “এটার বড় কারণ হচ্ছে একদিকে সংস্কার যেমন খুব গুরুত্বপূর্ণ, আরেক দিকে সংস্কারবিরোধী শক্তিগুলোও খুব সক্রিয় বিভিন্নভাবে। তাদেরকেও যে একটা জায়গায় বা কমন প্ল্যাটফর্মে এনে আলাপ আলোচনা করার ক্ষেত্রে সংস্কারের ডিজাইনটা যেভাবে হওয়া দরকার, সেক্ষেত্রেও আমার মনে হয়েছে কিছু-কিছু ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা হয়েছে। প্রশাসনেও সেভাবে আত্মবিশ্বাস ফেরেনি। যে কারণে আমরা বিরোধটা বেশি দেখছি।
“এই অর্থবছরে তো বেশি সময় নেই। কিন্তু এই সমস্ত কিছুতে আমার কাছে মনে হয় সামনের অর্থবছরে বেশ বড় একটা প্রভাব ফেলবে।”