Published : 20 Jan 2024, 08:40 AM
বন্দর নগরী চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের দুই অংশকে যুক্ত করেছে দেওয়ানহাট রেল সেতু, যার নিচ দিয়ে চলে গেছে সবগুলো আন্তঃনগর রেললাইন।
সেতুটির পিলারে ধরেছে ফাটল, খসে পড়ছে পলেস্তারা, পিলারের ফাঁকা অংশে বেড়ে উঠেছে গাছ। অর্ধ শতাব্দীতে বড় কোনো সংস্কার না হওয়া সেতুতে কার্পেটিং করে করে জমেছে দেড় ফুটের আস্তরণ।
এতে কেবল সেতুর ওজন আর ঝুঁকিই বেড়েছে। বয়স ৫০ পেরুনো ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এ সেতু দিয়েই চলছে শহরের বেশিরভাগ ভারী যানবাহন। নিচ দিয়ে ট্রেন গেলে কেঁপে ওঠে সেতু।
সেতুটি ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। আপাতত সেতুতে ভারী গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণে ‘হাইট বার’ চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি)।
চট্টগ্রাম এলিভিটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের আওতায় নতুন সেতু নির্মাণের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) অনুরোধ করেছে সিসিসি। এতে আশ্বাসও মিলেছে। তবে কবে নাগাদ এই নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হবে তা এখনও নির্ধারণ হয়নি।
নগরীর টাইগারপাস ও দেওয়ানহাট অংশের মধ্যে আগে সড়ক যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ট্রেন চলাচলের কারণে যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় ১৯৭৩-৭৪ সালে এই রেলসেতু তৈরি করা হয়। ১২২০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৬০ ফুট প্রস্থের সেতুটি সড়ক ও জনপথ বিভাগ তখন নির্মাণ করেছিল রেলওয়ের অর্থায়নে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে শুরু করে সারা দেশের নানা গন্তব্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা ছয়টি রেললাইনের সবকটি গেছে এই সেতুর নিচ দিয়ে। অল্প কয়েকটি লোকাল ট্রেন ছাড়া বাকি সব ট্রেন চলে এই পথ ধরে।
চট্টগ্রাম বন্দর এবং শিল্পাঞ্চল কেন্দ্রিক পণ্য ও যাত্রী চলাচলের জন্য এখনো মূল সড়ক যোগাযোগ নগরীর উত্তর-দক্ষিণমুখী। তাই এ সেতুর উপর দিয়েই বেশিরভাগ যানবাহন চলাচল করে।
এই পথে ক্রমবর্ধমান যান চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই বিমানবন্দর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করেছে সিডিএ। এক্সপ্রেসওয়েটি চলে গেছে দেওয়ানহাট রেলসেতুর পাশ দিয়েই।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি গত কয়েক বছর ধরে জরাজীর্ণ এই সেতুটি ভেঙে নতুন নেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপিও দিয়েছে সংগঠনটি।
কমিটির মহাসচিব এইচ এম মুজিবুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শহরের প্রধান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এরকম একটা ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর উপর ভর করে চলতে পারে না।
“সেজন্য আমরা এই সেতুটি ভেঙে নতুন একটি ছয় লেনের সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর আমরা স্মারকলিপিও দিয়েছি। টাইগারপাস থেকে পলোগ্রাউন্ড হয়ে মামা-ভাগিনার মাজার পর্যন্ত একটা বিকল্প রাস্তা চালু করে নতুন সেতুর কাজ শুরু করলে ভালো হবে।”
সিডিএর বোর্ড সদস্য নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান বলেন, “যে কোনো সেতু নির্মাণ করা হয় ১০০ বছরের পরিকল্পনা মাথায় রেখে। কিন্তু দেওয়ানহাট সেতুটি অলরেডি মেয়াদোত্তীর্ণ। কারণ এতে অংসখ্য ফাটল এসেছে।
“এর কয়েকটি কারণ আছে। যখন সেতুটি নির্মাণ হয় তখন এত উন্নত প্রযুক্তি ছিল না। ট্রেন চলার সময় সেতুতে প্রচুর কম্পন হয়। আর সিটি করপোরেশন প্রতিবছর শুধু কার্পেটিং করতে থাকায় সেতুর উপরের অংশে প্রায় দেড় ফুটের বেশি কার্পেটিং করে ফেলেছে। এতে সেতুর ওয়েট অনেক বেড়ে গেছে। এই সেতুটি ভেঙে ফেলতে হবে।”
সেতুটি ভেঙে ফেলার কথা বলছে নগরীর সড়ক ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সিসিসিও।
সিসিসির প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, “১৯৭৩-৭৪ সালে নির্মিত সেতুটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন সেতু করতে আমরা রেলওয়ে এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু রেলওয়ে বলছে, রেললাইনের উপর দিয়ে গেলেও সেতুটি তারা তৈরি করেনি।
“আর সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলছে, নগরীতে কোনো নির্মাণ কাজ এখন আর তারা করে না। সিডিএকে আমরা অনুরোধ করেছি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের আওতায় একটি নতুন সেতু করে দিতে। তাদের সে সুযোগ আছে।”
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান।
তিনি বলেন, “দেওয়ানহাট সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ। সিটি করপোরেশন আমাদের অনুরোধ করেছে সেখানে নতুন একটি সেতু নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য। আমরা মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইব। অনুমতি ও বরাদ্দ পেলে তখন কাজ করা যাবে।”
নির্মাণ কাজের জন্য পুরনো সেতুটি ভেঙে ফেললে নগরীর যান চলাচলের জন্য বিকল্প যে সড়ক আছে তা পর্যাপ্ত কিনা সে প্রশ্নও রয়েছে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের জন্য করা সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন অনুসারে, নগরীর টাইগারপাস থেকে বিমানবন্দর অংশে ২০২৩ সালে দিনে গড়ে ৭৩ হাজার যানবাহন চলাচল করেছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে হবে ১ লাখ ৪ হাজার।
ধসের আশঙ্কায় থাকা ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন ‘লং ভেহিক্যাল কভার্ড ভ্যান’, ট্রাক, বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িসহ সব রকমের যানবাহন চলাচল করছে।
জানতে চাইলে সিসিসির প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, “কিছুদিন পর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হবে। তখন সেটি একটি বিকল্প হবে। এছাড়া আরো কিছু সড়ক আছে। সেগুলো ব্যবহার করতে হবে।
“আপাতত ঝুঁকি কমাতে সেতুতে ভারী গাড়ি যাতে না ওঠে সেজন্য আমরা হাইট বেরিয়ার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগকে চিঠিও দিয়েছি।”
চট্টগ্রাম বন্দর এবং শিল্পাঞ্চল কেন্দ্রিক পণ্য ও যাত্রী চলাচলের জন্য এখনো মূল সড়ক যোগাযোগ নগরীর উত্তর-দক্ষিণমুখী।
নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) মো. তারেক আহম্মেদ বলেন, “দেওয়ানহাট রেল সেতুর দুই পাশে দুটি হাইট বার দেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশন আমাদের চিঠি দিয়েছে। কিন্তু সেতুর মুখে হাইট বার দিয়ে সেতুতে ভারী যানবাহন চলাচল ঠেকানো গেলেও সেসব গাড়ি চলাচলে সমস্যা হবে।
“তাই আরো আগে থেকে ভারী গাড়িগুলো অন্য পথে ডাইভার্ট করতে হবে। এজন্য একটি হাইট বার দিতে হবে আগ্রাবাদে জামান হোটেলের সামনে। এতে ওই পথে আসা ভারী যান এক্সেস রোড ধরে চলে যেতে পারবে। আরেকটি হাইট বার দিতে হবে চৌমুহনী অংশে সড়কের পশ্চিম পাশের মুখে। এটা জানিয়ে আমরা সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছি।”
নতুন সেতু নির্মাণ করতে চাইলে বিকল্প সড়ক ব্যবস্থা চালু করতে হবে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।