আরেক স্বপ্ন পূরণ: দুয়ার খুলল বঙ্গবন্ধু টানেল

চট্টগ্রাম বন্দর নগরীকে চীনের সাংহাই এর আদলে গড়ে তোলার যে উচ্চভিলাসী লক্ষ্য সরকারের ছিল, তার একটি বড় পদক্ষেপের বাস্তবায়ন হল নদী তলদেশে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেল উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে।

চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 Oct 2023, 05:51 AM
Updated : 28 Oct 2023, 05:51 AM

পূর্ণ হল আরেকটি স্বপ্ন; সুড়ঙ্গপথে মিলন ঘটল কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়ের; চট্টগ্রামবাসীর সঙ্গে ইতিহাসের সাক্ষী হল বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম তীরে একটি ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনী ফলক উন্মোচনের পর পরই আতশবাজি ফোটানো হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন।

পতেঙ্গা প্রান্তে প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে বরণ করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ।

প্রধানমন্ত্রী টানেল উদ্বোধনের পর গাড়িতে চড়ে টানেল ধরে রওনা হন আনোয়ারা প্রান্তে। পেছনে অনেকগুলো বাসে ছিলেন তার সফরসঙ্গীরা।

টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে পৌঁছে প্রথম যাত্রী হিসেবে সেখানে টোলে দেন সরকারপ্রধান। টোল কালেক্টর ঝুমুর আক্তার প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে টাকা নিয়ে রশিদ দিলে হাত তুলে তা দেখান শেখ হাসিনা।

টানেলের আনোয়ার প্রান্তে বেরিয়ে নদীতে আরেকটি ফলক উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে কোরিয়ান ইপিজেড মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভায় ভাষণ দেবেন।

শনিবার উদ্বোধন হলেও টানেলটি রোববার সকাল থেকে যান চলাচলের উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

এ টানেলের মাধ্যমে শিল্পঘেরা কর্ণফুলীর দুই পাড়ের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হচ্ছে, সংযোগ হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের। তাতে গতি পাবে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য।

কর্ণফুলী নদীর একপাড়ে বন্দর নগরী, অন্যপাড়ে আনোয়ারা উপজেলার শিল্প এলাকা। ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ গড়ার উচ্চাভিলাসী লক্ষ্য নিয়ে বানানো এই টানেলের মাধ্যমে এই দুই পাড় যুক্ত হচ্ছে। পথ খুলছে বিশ্বমানের যোগাযোগের।

চট্টগ্রাম বন্দর নগরীকে চীনের সাংহাই এর আদলে গড়ে তোলার যে উচ্চভিলাসী লক্ষ্য সরকারের ছিল, তার একটি বড় পদক্ষেপের বাস্তবায়ন হল নদী তলদেশে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেল উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানেল উদ্বোধন উপলক্ষে এক বাণীতে বলেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’ বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর নিচে প্রথম সড়ক টানেল। দেশপ্রেমিক জনগণের আস্থা ও অকুণ্ঠ সমর্থনের ফলেই আজকে উন্নয়নের এ নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে।

“আগামী দিনেও গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন পূরণে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাব।”

উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা সেরে আনোয়ারায় কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড) মাঠে এক জনসভা স্থলের উদ্দেশ্যে যাবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শাখা এ সমাবেশের আয়োজন করছে। সেখানে ভাষণ দেবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে বন্দর নগরীকে সাজানো হয়েছে মনোরম সাজে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে নগরী ও আনোয়ারা প্রান্তের রাস্তাঘাট।

পতেঙ্গা প্রান্তে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে স্থাপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নান্দনিক ম্যুরাল। সঙ্গে আছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সাম্পান।

আনোয়ারায় জনসভার স্থলে নৌকার আদলে তৈরি মঞ্চে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শুরু হয়েছে জনসভা। সকাল থেকে উত্তর, দক্ষিণ ও নগরী থেকে হাজারো মানুষ দলে দলে জনসভায় যোগ দিতে মাঠে সমবেত হয়েছেন। 

টানেলের আদ্যোপান্ত

লুসাই পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী কর্ণফুলীর দুই প্রান্তকে যুক্ত করতে টানেল নির্মাণে প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের জন্য ২০১৪ সালের ১০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বেইজিংয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

সেই শুরু, তারপর প্রায় ৯ বছরের পরিক্রমায় সম্পূর্ণ হয়েছে টানেলের নির্মাণ কাজ।

২০১৫ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার দুই বছর পর ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু হয়।

২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় টানেল প্রকল্প এলাকার কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে সুইচ টিপে আনুষ্ঠানিকভাবে এ খনন কাজের উদ্বোধন করেন।

এর আগে ২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের নবগঠিত মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে টানেলটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামকরণের প্রস্তাব দেন মহিউদ্দিন পুত্র মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই টানেলে প্রতিটি সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। টানেলের পূর্ব ও পশ্চিম ও প্রান্তে থাকছে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। এ ছাড়া ৭২৭ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ওভারব্রিজ রয়েছে আনোয়ারা প্রান্তে।

বন্দরনগরীর পতেঙ্গা নেভাল অ্যাকাডেমির পাশ দিয়ে নদীর তলদেশে ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরতায় নেমে যাওয়া এই পাতাল পথ কর্ণফুলীর ওপারে আনোয়ারায় সিইউএফএল ও কাফকোর মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে আবার ভূপৃষ্ঠে উঠেছে।

৩৫ ফুট প্রশস্ত ও ১৬ ফুট উচ্চতার টানেলে দুটি টিউব যানবাহন চলাচলের জন্য এখন পুরো প্রস্তুত। টিউব দুটির একটির সঙ্গে অপর টিউবের দূরত্ব ১২ মিটারের মত। প্রতিটি টিউবে দুটি করে মোট চারটি লেইন আছে।

বঙ্গবন্ধু টানেল চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দুই তীরের চিত্র পাল্টে দেবে এবং এখানকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রসার ঘটবে বলে আশাবাদী সরকার, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সমাজ ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে যুক্ত করবে এই সুড়ঙ্গপথ। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামর সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগ আরও সহজ হবে।

নদীর দক্ষিণে আনোয়ারায় রয়েছে কোরিয়ান ইপিজেড, চায়না ইপিজেড, সিইউএফএল ও পারকি সমুদ্র সৈকত। কর্ণফুলী পেরিয়ে আনোয়ারা দিয়েই বাঁশখালী, কক্সবাজার, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাবে।

কর্ণফুলী নদীর দুইপাড়ে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ গড়ে তুলতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার।

এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে একটি নতুন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বানানো হয়েছে এ টানেল।

নির্মাণ কাজ করেছে চীনা কোম্পানি ‘চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ (সিসিসিসি)। প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান সুযোগ সুবিধা বাড়াতে এবং প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দরের নির্মাণ কাজ ত্বরান্বিত করতেও এই টানেল ভূমিকা রাখবে বলেও সরকার আশা করছে।

টানেলের উত্তরে নগরীর দিক থেকে আউটার রিং রোড, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কাঠগড় সড়ক, বিমানবন্দর সড়ক এবং পতেঙ্গা বিচ সড়ক দিয়ে টানেলে প্রবেশ করা যাবে।

বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে টানেল প্রকল্পের শুরুর দিকে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। অনুমোদনের দুই বছর পরে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শুরু হলে ব্যয় বাড়িয়ে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা করা হয়। পাশাপাশি মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২২ বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

পরে খরচ বেড়ে হয় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। মেয়াদ চলতি বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

করোনাভাইরাস মহামারীর সময় টানেলের কাজ কিছুটা গতি হারায়। মহামারীর কারণে টানেলের বিভিন্ন সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আনাসহ নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান।

খনন শুরুর পর কারিগারি কারণেও কিছুটা সময় বেশি লাগে। প্রথম টিউবটি খননে ১৭ মাস সময় লাগলেও দ্বিতীয় টিউবটি খননে আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মাত্র ১০ মাসে তা শেষ করা হয়।