চট্টগ্রামে প্রতিবন্ধীর লাশ: খুনি শনাক্ত ‘খালি পা ও টিশার্টের লেখায়’

ওই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে খুন করা হয়েছিল তার রিকশাটি ছিনতাইয়ের জন্য। 

চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Nov 2022, 02:53 PM
Updated : 13 Nov 2022, 02:53 PM

চট্টগ্রামে চার দিন আগে ডোবা থেকে এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তারের পর পিবিআই জানিয়েছে, খালি পা ও টিশার্টের লেখা দেখে তাদের শনাক্ত করা হয়েছে।

অটোরিকশা ছিনতাই করতে খুন করে লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে এ মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন- পিবিআই।

গত ৯ নভেম্বর কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের রাস্তার পাশে একটি ডোবা থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ।

ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে শনিবার দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তারা হলেন- মো. আলাউদ্দিন (২৫) ও মো. শাকিল আহমদ (১৯)। তারা চট্টগ্রাম নগরীতে গাড়ি পরিষ্কারের কাজ করতেন।

আলাউদ্দিনের বাড়ি কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা আদর্শ পাড়ায় হলেও তিনি লালদিঘীর পাড় জামে মসজিদ সংলগ্ন পাবলিক টয়লেটের সামনে থাকতেন। আর লালদিঘী পাড়ে একটি আবাসিক হোটেলে থাকতেন শাকিল।

রোববার এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর বিশেষ পুলিশ সুপার নাঈমা সুলতানা বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী যে ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল, তার নাম মো. হাসান (৪৫)। নোয়াখালীর চরজব্বার উপজেলায় তার বাড়ি। চট্টগ্রামে তিনি থাকতেন নগরীর বাকলিয়া থানার রাজাখালী মাস্টার কলোনিতে। তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাতেন।

তিনি বলেন, গত ৭ নভেম্বর রাতে তাকে শিকলবাহা আদর্শ পাড়া এলাকায় যাওয়ার জন্য ভাড়া করেছিলেন গ্রেপ্তার দুজন। সেখানে নিয়ে তার কাছ থেকে রিকশা রেখে দেওয়ার চেষ্টা করলে ভিকটিম হাসানের সাথে আলাউদ্দিন ও শাকিলের হাতাহাতি হয়। এ সময় তারা রিকশায় থাকা বেল্ট গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করে লাশটি ডোবায় ফেলে দেয়। তার কাছ থেকে অটোরিকশা এবং মোবাইল নিয়ে চলে যায় দুজন।

পুলিশ সুপার নাঈমা বলেন, লাশের পরিচয় শনাক্তের পর তার মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে শনিবার লালদিঘীর পাড় এলাকা থেকে আলাউদ্দিন ও শাকিলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেখানো মতে কর্ণফুলী থানার ফকিরনির হাট এলাকা থেকে অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়।

হাসানের লাশ উদ্ধারের দিন কর্ণফুলী থানার ওসি দুলাল মাহমুদ বলেছিলেন, মৃত ব্যক্তির ডান হাত আগে থেকে ছিল না। বাম হাতটি কাপড়ের বেল্ট দিয়ে পেছন থেকে পেঁচিয়ে গলার সঙ্গে বাঁধা ছিল।

তখনই তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা ছিল পুলিশের। লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে কর্ণফুলী থানায় একটি হত্যা মামলা করে। যেটির তদন্তের দায়িত্ব নেয় পিবিআই।

যেভাবে শনাক্ত হয় খুনি

অভিযানের নেতৃত্বে থাকা পিবিআই পরিদর্শক ইখতিয়ার উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভিকটিমের মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে পুলিশ ৪৮টি স্থানের শতাধিক সিসি ক্যামেরার ভিডিও বিশ্লেষণ করে দুই আসামিকে শনাক্ত করে।

“ফুটেজে একজনের পরনে থাকা গেঞ্জিতে একটি লেখা দেখা যায়। আরেকজনের পায়ে স্যান্ডেল ছিল না। সেই সূত্র মিলিয়ে আলাউদ্দিন ও শাকিলকে শনাক্ত করা হয়।”

আরও বিবরণ দিয়ে ইখতিয়ার জানান, শিকলবাহার আদর্শ পাড়ায় যে স্থানে লাশ পাওয়া গেছে সেখানে একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে দুই যুবককে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় চড়ে যেতে দেখা গেছে। কিন্তু বের হয়ে আসার কোনো ভিডিও দেখা যায়নি।

“আমরা ভিকটিমের মোবাইলের লোকেশন নিয়ে দেখতে পাই লালদিঘী, কোতোয়ালি, শাহ আমানত ব্রিজ, শিকলবাহা, ফকিরনির হাট, কাফকো এবং নদী পার হয়ে পতেঙ্গার ১৫ নম্বর ঘাট হয়ে আবার লালদিঘীতে এসে মোবাইলটি বন্ধ করা হয়েছে।

“সেই সূত্র ধরে ৪৮টি স্থানের শতাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ শনাক্তের কাজ শুরু করলে কাফকো এবং ১৫ নম্বর ঘাট এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দুজনের স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। পরে সেটার সূত্র ধরে লালদিঘী এলাকায় দুজনকে ৭ নভেম্বর রাত দেড়টার দিকে লালদিঘী এলাকায় রিকশা খুঁজতে দেখা গেছে।”

তাদের মধ্যে একজনের পরনে থাকা গেঞ্জিতে ‘এভরিডে’ লেখা দেখা যায়। সেটি দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয় হত্যাকারীরা লালদিঘীর আশেপাশের এলাকা থেকে অটোরিকশাটি ভাড়া করেছেন এবং ওই এলাকায় তাদের অবস্থান।

যেভাবে মিলেছে নিহতের পরিচয়

পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, হাসানের ডান হাত নেই। দুদিন ধরে লাশ পানিতে পড়ে থাকায় বাম হাতের আঙ্গুলগুলো পচে গিয়েছিল। যে কারণে পরিচয় শনাক্তও করা যায়নি। তবে হাসান এক পিবিআই কর্মকর্তারই পূর্ব পরিচিত হওয়ায় লাশ চিনতে পারেন তিনি।

একই এলাকায় বাড়ি হওয়ায় হাসান ছিলেন পিবিআইর চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক আবু জাফর মো. ওমর ফারুকের পূর্ব পরিচিত। আর হাসানকে ফোনে দুই দিন ধরে না পেয়ে তার পরিবারের সদস্যরাও ফারুকের কাছে ফোন করেছিলেন।

ওমর ফারুক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হাসান নোয়াখালীতে সাইকেল চালিয়ে দুধ বিক্রি করতেন। ডান হাতে টিউমার হয়ে সেখান থেকে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ায় বছর চারেক আগে হাসানের সেই হাতটি কেটে ফেলা হয়। যার কারণে সে পেশা তাকে ছাড়তে হয়। পরে কিছু দিন নোয়াখালীতে ‘ক্যানভাসার’ হিসেবে কাজ করতেন।

“কিন্তু নিজে ও চার সন্তান এবং স্ত্রীর ভরণপোষনে আর্থিক টানাপোড়ন সৃষ্টি হওয়ায় চট্টগ্রামে চলে আসেন এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। নোয়াখালীর একই এলাকায় বাড়ি এক অটোরিকশা মেকানিক বাম হাতে চালাতে পারার মতো করে হাসানকে একটি অটোরিকশা তৈরি করে দিয়েছিলেন।”

ফারুক আরও বলেন, “গত ৮ নভেম্বর হাসানের ভাতিজা বাড়ি থেকে ফোন করে আমাকে জানায় দুই দিন ধরে হাসানকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি তাকে চট্টগ্রামে এসে বাকলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পরামর্শ দিয়েছিলাম।

“পরদিন অফিসে লাশ উদ্ধারের তথ্য পেয়ে ছবি মিলিয়ে দেখে হাসানকে চিনতে পারি। পরে হাসানের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। সেটির লোকেশন নিয়ে কাজ শুরু করে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়।”

সাড়ে ৭ হাজার টাকার জন্য ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা

পুলিশ জানায়, আলাউদ্দিন ও শাকিলের পরিচয় হয় ২০/২৫ দিন আগে। আলাউদ্দিন আগে গণপরিবহনে সহকারীর কাজ করতেন। গাড়িতে কাজ করতে তাকে আরকান সড়ক পরিবহন সমিতির সদস্য হতে হবে। সেজন্য তার সাড়ে ৭ হাজার টাকার প্রয়োজন। আর শাকিলও সেখানে কাজ করতে শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স করার ইচ্ছে ছিল।

মূলত সেই টাকা জোগাড় করতেই তারা অটোরিকশা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে বলে পিবিআইয়ের ভাষ্য।

পরিদর্শক ইখতিয়ার জানান, গ্রেপ্তার আলাউদ্দিনের বাড়ি শিকলবাহা আদর্শ পাড়া এলাকায়। তারা লালদিঘী এলাকা থেকে ৩০০ টাকায় হাসানের অটোরিকশাটি ভাড়া করে আদর্শ পাড়া পর্যন্ত। সেখানে গিয়ে দুজন ভাড়া পরিশোধ করে হাসানের অটোরিকশাটি রেখে দেওয়ার চেষ্টা করে।

“ধস্তাধস্তিতে হাসান রিকশায় থাকা কাঠ দিয়ে তাদের আঘাত করে। এসময় শাকিল সেটি নিয়ে উল্টো হাসানকে আঘাত করে।”

এ কর্মকর্তা আরও জানান, হাসানের ডান হাত না থাকায় তার অটোরিকশাটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল। সেটার বাম হাতে ব্রেক রেখে ডান দিকে একটি বেল্ট দিয়ে রিকশাটির হ্যান্ডেলের সঙ্গে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল নিয়ন্ত্রণের জন্য।

“সেই বেল্ট দিয়ে শাকিল হাসানের গলায় টান দেয়। এ সময় হাসান রাস্তায় পড়ে গেলে আলাউদ্দিন তার পা চেপে ধরে। মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা হাসানের লাশটি রাস্তার পাশে একটি ডোবার মধ্যে ফেলে দেয়। ধস্তাধস্তিতে আলাউদ্দিনের পায়ের স্যান্ডেল খুলে গেলে তিনি সেগুলো না নিয়ে চলে যান।”

৯ নভেম্বর সকালে দুর্গন্ধ ছাড়ানোর কারণে স্থানীয়রা লাশটি দেখতে পায় এবং পুলিশ সেটি উদ্ধার করে।
হাসানকে হত্যা করে অটোরিকশাটি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ফকিরনির হাট এলাকায় চলে যায় বলেও জানায় পুলিশ।

ইখতিয়ার বলেন, “সেখানে আলাউদ্দিনের পরিচিত এক ব্যক্তির কাছে অটোরিকশাটি বিক্রি করতে চাইলে তিনি তাদের ধাওয়া করেন। পরে কিছুদূর গিয়ে অটোরিকশাটি ফেলে তারা কাফকো এলাকায় চলে যান। সেখান গিয়ে নদী পাড় হয়ে পতেঙ্গা ১৫ নম্বর ঘাটে চলে আসে। সেখান থেকে লালদিঘীর পাড় চলে আসে।”

দুজনকে গ্রেপ্তারের পর ফকিরনির হাটে তাদের দেখানো স্থান থেকে অটোরিকশা এবং ঘটনার দিন তাদের পরনে থাকা শার্টও পুলিশ উদ্ধার করেছে। 

পুরনো খবর

Also Read: চট্টগ্রামে ডোবা থেকে লাশ উদ্ধার

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক