Published : 24 May 2026, 08:58 AM
চট্টগ্রামে এবার গতবারের চেয়ে বেশি পশু কোরবানি হতে পারে বলে আশা করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। তবে খামারিরা বলছেন, গতবারের কাছাকাছি সংখ্যাতেই পশু কোরবানি হতে পারে।
বড় খামারগুলোতে কোরবানির গরু-মহিষ বিক্রি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আর হাটগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসতে শুরু করেছে পশু।
তবে নগরীর হাটগুলোতে এখনো বেচাকেনা শুরু হয়নি। আর প্রান্তিক খামারিরা শঙ্কায় আছেন কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া নিয়ে।
২০২৪ সালে চট্টগ্রাম জেলায় গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য পশু মিলিয়ে মোট কোরবানি হয়েছিল ৮ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৮টি পশু। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮১ হাজার ৮৩১টিতে। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় গত বছর জেলায় ৩৬ হাজার ৬৩৭টি পশু কম কোরবানি হয়েছিল।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এবারের ঈদে চট্টগ্রাম জেলায় ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ৩৬ হাজার ৮৪০টি পশু বেশি কোরবানি হতে পারে।

এবার পশু কোরবানি বাড়বে কি না সেই হিসাব পাওয়া যাবে কোরবানির পর। তবে খামারিরা বলছেন, চাহিদা গতবারের মতই আছে।
নগরীর কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকায় সারা অ্যাগ্রো ফার্মস লিমিটেড নামের খামারটি নগরীতে অন্যতম বড় গরুর খামার। ঈদ উপলক্ষে এবার সেখানে ৫৫০টি গরু পালন করা হয়।
সারা অ্যাগ্রো ফার্মস লিমিটেডের কর্ণধার আলিফ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৫৫০টি গরুর মধ্যে বেশিরভাগই বিক্রি হয়ে গেছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় আমাদের খামারে গরু অবিক্রিত আছে আর মাত্র ২২টি।
“এবার গরুর চাহিদা গত বছরের মতই। খামারে ছোট ও মাঝারি গরু ছিল ২০০ এর মত। আর বাকিগুলো বড় আকারের গরু। সর্বনিম্ন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১২ লাখ টাকা দামের গরু আছে এবার।”
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১২ লাখ টাকায় উলবারি জাতের গরু ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
নগরীর বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় নাহার অ্যাগ্রোর ক্যাটল ফার্ম অংশে এবার কোরবানি উপলক্ষে ৫০০ গরু প্রস্তুত করা হয়েছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় খামারটিতে বিক্রির জন্য ১২টি গরু অবশিষ্ট ছিল।
নাহার অ্যাগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুর রহমান টুটুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খামার থেকে যারা গরু কিনে অভ্যস্ত, তারা প্রতিবছর খামার থেকেই কেনেন। খামারে চাহিদা আগের মতই।

“যেমন- গতবার যিনি দুটি গরু কিনেছেন, সেই ক্রেতা এবারও দুটি গরুই কিনেছেন। খামারের বিক্রি থেকে গরুর চাহিদা বেড়েছে কি না, সেটা যথাযথভাবে বোঝা যাবে না। সেটা বোঝা যাবে হাটের বেচাকেনার চিত্র দেখে।”
নগরীর উত্তর কাট্টলী এলাকায় সিটি অ্যাগ্রোতে এবার কোরবানি উপলক্ষে ১৫০টি গরু পালন করা হয়।
সিটি অ্যাগ্রোর স্বত্ত্বাধিকারী এবং চট্টগ্রাম ক্যাটেল ফার্মাস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এনামুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খামারগুলোতে গরু কেনাবেচা প্রায় শেষের পথে। চাহিদা গতবারের মত আছে। আমাদের খরচ অনেক বেড়েছে, তবে সে তুলনায় গরুর দাম তেমন বাড়েনি।
“গো খাদ্যের দাম, পরিবহন খরচসহ আনুষাঙ্গিক বিভিন্ন খরচ বাড়ায় গত কয়েক বছরে বেশকিছু খামারি আর টিকে থাকতে পারেনি। পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে যেসব গৃহস্থ গরু লালন-পালন করেন তারা ক্ষতির মুখে পড়লে আর টিকে থাকতে পারেন না।”
আগের বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে গরু কোরবানি কম হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে এনামুল বলেন, “অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতা কমেছে। ক্রেতাদের দরাদরিতে দেখে এবারও পরিস্থিতি গত বছরের মতই মনে হচ্ছে। কোরবানির পশুর চাহিদা খুব বেশি বাড়বে বলে মনে হয় না।
“প্রান্তিক পর্যায়ে গরু লালন কমেছে অনেক। তাই চট্টগ্রামে অতীতের তুলনায় কোরবানি উপলক্ষ্যে তৈরি করা গরুর সংখ্যাও কমে গেছে।”
তার কথার সত্যতা মেলে পরিসংখ্যানেও।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেবে, চট্টগ্রাম জেলায় ২০২৫ সালে কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৬২টি পশু। আর এবার কোরবানিযোগ্য পশু আছে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি। তার মানে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা এক বছরে কমেছে ৭৭ হাজার ৭১১।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মাদার্শা এলাকার খামারি আবদুল আজিজ প্রতি বছর কোরবানির কয়েক মাস আগে গরু কিনে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করেন।
আজিজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গুনিয়া থেকে কিনে চার মাস ধরে ১৬টি গরু লালন-পালন করেছি। ছোট ও মাঝারি আকারের এসব গরুর দাম সর্বনিম্ন ৮০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা।
“এই দামে বিক্রি করতে পারলে আমার হয়ত গরু প্রতি ১০ হাজার টাকা লাভ থাকবে। খাবার খরচ এখন অনেক বেশি। পরিশ্রমও বেশি। কিন্তু বাড়ি থেকে গরু বিক্রি করতে না পারলে আবার হাটে নিতে হবে। অন্য জেলা থেকে চট্টগ্রামে গরু আসে বলে সবসময় হাটের অবস্থা একরকম থাকে না। বাইরে থেকে বেশি গরু এসে গেলে কম দামে গরু ছেড়ে দিতে হয়। তখন লস হয়ে যায়।”
বাংলাদেশ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মো. রাকিবুর রহমান টুটুল বলেন, “আমরা যারা সমন্বিত খামারি অর্থাৎ মুরগি, দুধ উৎপাদন ও মাংসের জন্য গরু লালন সব একসাথে করি, তারা হয়তো কোনভাবে ক্ষতি পোষাতে পারে। তার পরও খরচ বাড়ায় এখন একটা গরু বিক্রি করে লাভ থাকে ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা।
“কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে একজন খামারি ক্ষতি পোষাতে পারেন না। একটা গরু যদি মারা যায় বা অসুস্থ হয়- তখন যে লস হয়, সেটা কাটিয়ে ওঠা প্রান্তিক খামারিদের পক্ষে সম্ভব না। একারণে খামারির সংখ্যা কমছে।”
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর অবশ্য বলছেন, এবার চট্টগ্রামে যে চাহিদা আছে তা দেশের অন্য জেলা থেকে গরু আসলেই মিটে যাবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় এবার কোরবানিযোগ্য গবাদি পশু আছে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি। আর জেলায় চলতি বছর জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি।

সে হিসাবে জেলায় ঘাটতি আছে ৩৫ হাজার ৫২০টি পশুর।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চট্টগ্রামে গত কয়েক বছর ধরে ৮ লাখের কিছু কমবেশি পশু কোরবানি হয়। এবছর চাহিদার চেয়ে ৩৫ হাজার কম পশু আছে জেলায়। সেটা অন্য জেলা থেকে আসা গরুতে মিটবে।
“চট্টগ্রামে প্রতি বছর কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, তিন পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজার জেলা থেকে গরু আসে। এবারও গরু আসতে শুরু করেছে। আশা করি, কোনো সংকট হবে না।”
চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলায় কোরবানির পশুর কোনো ঘাটতি নেই। বরং উপজেলাগুলোতে যত পশু কোরবানি হবে, তার চেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে।
বিপরীতে নগরীতে কোরবানি পশুর ঘাটতি আছে। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর পুরো নগরীকে তিনটি জোনে ভাগ করেছে।
গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য পশু মিলিয়ে নগরীর ডবলমুরিং জোনে সবচেয়ে বেশি ৬৩ হাজার ৬৮০টি কোরবানির পশুর চাহিদা আছে। বিপরীতে এই জোনে কোরবানির জন্য পশু প্রস্তুত আছে ১৬ হাজার ৬৬০টি। এখানে ঘাটতি ৪৭ হাজার ২০টি পশুর।
পুরো জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোরবানির পশু প্রস্তুত আছে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে, ৬২ হাজার ৩১০টি। আর সবচেয়ে কম গবাদি পশুর প্রাপ্যতা নগরীর কেন্দ্র কোতোয়ালী জোনে, মাত্র ৭ হাজার ৪৭২টি।
জেলায় কোরবানির যোগ্য পশুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে গরু। ৪ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৯টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছে এবার। এছাড়া ছাগল আছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টি। মহিষ আছে ৪৭ হাজার ৮৩৪টি এবং ভেড়া আছে ৪১ হাজার ৪২৩টি।
২০২৫ সালে জেলায় মোট ৭ লাখ ৮১ হাজার ৮৩১টি পশু কোরবানি হয়েছিল। এরমধ্যে গরু কোরবানি হয় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩টি। মহিষ কোরবানি হয়েছিল ৫০ হাজার ৪৮৮টি। এছাড়া ২ লাখ ১৫ হাজার ৭২৬টি ছাগল এবং ৪১ হাজার ৪০৯টি ভেড়াও কোরবানি হয় গত বছর।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৪ সালে জেলায় কোরবানি হয়েছিল ৮ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৮টি পশু।