০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ভাই, শিরোনামজুড়ে শুধুই আপনি

“সত্য, সুন্দর ও সংবাদ বদলে দেওয়া যায় না”—চাপ আর প্রলোভন উপেক্ষা করে আধুনিক ও বস্তুনিষ্ঠ অনলাইন সাংবাদিকতার ভিত গড়া তৌফিক ইমরোজ খালিদীর স্মরণে শান্তা মারিয়া।

তৌফিক ভাই, শিরোনামজুড়ে শুধুই আপনি

তৌফিক ইমরোজ খালিদী

শান্তা মারিয়া শান্তা মারিয়া

Published : 03 Oct 2026, 12:24 PM

Updated : 03 Oct 2026, 12:24 PM

বিদেশে থাকি। দেশের ভালো-মন্দ সব সংবাদের জন্য মনটা উচাটন থাকে। সারাদিন কাজের পর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে অবশ্যই একবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ঘুরে নিই। কারণ, আমাদের প্রিয় প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী ভাই শিখিয়েছেন সঠিক তথ্য দ্রুততম সময়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে। তার এই নীতি ধারণ করেই আমি মনে করি, বাংলাদেশের সকল সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সবচেয়ে দ্রুত সবচেয়ে সঠিক তথ্য বিডিনিউজে পাওয়া যায়।

আজ বিডিনিউজের শিরোনামজুড়ে আছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। শুধু বিডিনিউজ নয়, দেশের সব সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম আজ তার চলে যাওয়ার শোকাবহ সংবাদকে ঘিরে। সচক্ষে খবরটি দেখেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না; মনে ভেসে উঠছিল কত কথা, কত স্মৃতি। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের বুদ্ধিদীপ্ত, স্মার্ট এবং প্রকৃত সাংবাদিক বলতে প্রথমেই আমি তাকেই বুঝি।

বিডিনিউজে আমি ‘গ্লিটজ’ পাতার বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছি কয়েক বছর। ২০১২ সালের শেষ দিকের কথা; আমি তখন সদ্য চীন থেকে ফিরেছি। চীন আন্তর্জাতিক বেতারের বিদেশি সংবাদ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছিলাম। পারিবারিক কারণে দেশে চলে আসতে হয়। যেদিন চীন থেকে ফিরলাম, তার পরদিনই বিডিনিউজে যাওয়া। সে সময়কার বার্তা সম্পাদক গাজী নাসিরুদ্দিন ভাই কথা বললেন, আলাপ করিয়ে দিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী ভাইয়ের সঙ্গে। পরদিন কাজে যোগ দিলাম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সেই থেকে আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠান।

কয়েক বছর সেখানে কাজের পর আমার কর্মক্ষেত্র পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আন্তরিকতার ঘাটতি হয়নি।

আমার ত্রিশ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে যাদের কাছ থেকে কাজ শিখেছি, তাদের মধ্যে শ্রদ্ধাভাজন তৌফিক ইমরোজ খালিদী প্রধান। স্মার্ট, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা কাকে বলে—সেটা তৌফিক ভাই খুব চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন তার জুনিয়র সহকর্মীদের। শুধু সহকর্মীদেরই নয়, পাঠককেও। বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতা, সত্যিকারভাবে দ্রুত নিউজ পাওয়া, তথ্যের সঠিকতা, পাঠকের আস্থাভাজন হওয়া, সিটিজেন জার্নালিজম—এসব কিছুই বাংলাদেশের এবং প্রবাসী বাংলাভাষী পাঠককে উপহার দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দ্বিভাষিক অনলাইন নিউজপেপার ও নিউজ পোর্টাল।

সত্যিকারের আধুনিক সাংবাদিকতা আমরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমেই প্রথম পেয়েছি। তবে এজন্য যথেষ্ট মাশুলও দিতে হয়েছে বিডিনিউজকে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের রোষানলে পড়তে হয়েছে; ব্যক্তিগতভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তৌফিক ভাইকে; অর্থসংকটেও পড়তে হয়েছে প্রতিষ্ঠানকে। তবু বিডিনিউজ যে টিকে গেছে, তার কারণ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সম্পাদকের সততা এবং সাংবাদিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা—যা পাঠকের কাছে আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক আলাপ হয়েছে। সবসময়ই দেখেছি তিনি মনেপ্রাণে একজন বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিক। আজকালকার দালাল ও ধামাধরা সাংবাদিক নামধারীদের ভিড়ে এক আশ্চর্য ব্যতিক্রমী পেশাজীবী মানুষ ছিলেন তিনি। সরকারের চাপ, ক্ষমতার প্রভাব, প্রলোভন—কোনো কিছুর বিনিময়েই তিনি সাংবাদিকতার আদর্শের সঙ্গে আপস করেননি।

আমি বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন পত্রিকায় সম্পাদকীয় ও ফিচার বিভাগে কাজ করেছি। ফলে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ করতে হয়েছে, রিপোর্টিং আর নিউজ ডেস্কের পিক আওয়ার দেখার সুযোগ খুব বেশি হয়নি। কিন্তু বিডিনিউজে একই ফ্লোরে একসঙ্গে কাজ করার ফলে সন্ধ্যায় নিউজরুমের আনন্দ, কাজের চাপ, উত্তেজনা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। কারণ বিকেলেই ছিল আমার কাজের মূল সময়। নিউজরুমের প্রাণ ছিলেন তৌফিক ভাই। কীভাবে এত কাজের ভিড়েও সজাগ ও তীক্ষ্ম নজর রাখতেন সবদিকে, সেটা সত্যিই বিস্ময়কর। কোনো একটি সংবাদের ‘নোজ’ কী হবে—সেটা তার চেয়ে ভালো আর কেউ ধরতে পারত না।

আমাদের মিটিংগুলোও বেশিরভাগই হতো সন্ধ্যায়। তখন তৌফিক ভাইয়ের ঝাড়িও খেতে হতো বৈকি। তবে তৌফিক ভাই বরাবর আমার লেখার প্রশংসা করেছেন, যেটা আমার বড় প্রাপ্তি। সত্যি বলতে কী, তৌফিক ভাই আমার প্রকৃতিটা ঠিক ধরতে পেরেছিলেন। তিনি বলতেন, ‘শান্তাকে একটা ল্যাপটপ আর ব্যাকপ্যাকসহ বিশ্বভ্রমণে পাঠিয়ে দিই। ও আমাজন অরণ্যে বা গোবি মরুভূমিতে বসে ট্রাভেলগ লিখে পাঠাক।’ আহা, সত্যি যদি এমন হতো! এডিটিং আর ম্যানেজমেন্ট আমার কখনও ভালো লাগে না—আপনি ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন।

তৌফিক ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছি কীভাবে আকর্ষণীয় শিরোনাম দিতে হয়, টিজার লিখতে হয়। শিখেছি প্রতিটি বিদেশি শব্দের উচ্চারণ যথাযথভাবে সেই দেশের সেই ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে পরিবেশন করতে হয়। রাজনীতি, সমাজনীতি, ইংরেজি সাহিত্যের বহু পাঠও তার কাছ থেকে গ্রহণ করেছি।

প্রতিষ্ঠানটি থেকে চলে যাওয়ার পরও সবসময় তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। লেখার সূত্রে এখনও বিডিনিউজ আমার আপন প্রতিষ্ঠান।

এই তো কিছুদিন আগেও কথা হয়েছে উইচ্যাটের মাধ্যমে। বলেছিলেন চীনে আসবেন। বিডিনিউজের বিংশতিতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের জন্য নানা পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছিলেন। আমি ঢাকায় থাকলে বিডিনিউজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যোগ দিয়েছি, কুয়াকাটায় আনন্দভ্রমণে অংশ নিয়েছি। সবসময় তার কাছ থেকে যে আন্তরিক শুভকামনা পেয়েছি, তা আমার জীবনের পরম সম্পদ।

তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে কত যে স্মৃতি। তার এমন আকস্মিকভাবে চলে যাওয়াটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। আন্তরিক শোক ও শ্রদ্ধা জানাই। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের এক নক্ষত্রের আলো যেন আজ নিভে গেল; কিংবা তৌফিক ভাই আজ দূর আকাশের তারা হয়ে গেলেন। তবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তার নাম চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবে।

তৌফিক ভাই আমাদের সবাইকে এবং বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতকে একটি মহৎ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলতেন, “সত্য, সুন্দর ও সংবাদ বদলে দেওয়া যায় না।” সংবাদকে বিকৃত করে নিজের স্বার্থে পরিবেশনের যে ধারা বাংলাদেশের অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিকও অনুসরণ করেছেন, সেই অসত্য ও অসাংবাদিকসুলভ আচরণকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন তৌফিক ভাই। তিনি দেখিয়েছেন, প্রমাণ করেছেন—সংবাদ পরিবেশনে সততা ও বস্তুনিষ্ঠতা চাই-ই চাই। কথা দিচ্ছি, আপনার এই আদর্শ আমি এবং আমরা সকলেই আজীবন ধারণ করব।

আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি। এই লেখাটি লিখছি আর চোখ দিয়ে জল পড়ছে। যাওয়ার এত কী তাড়া ছিল আপনার?

ওপারে ভালো থাকুন, প্রিয় তৌফিক ভাই। আবার দেখা হবে।

শান্তা মারিয়া: শিক্ষক, বাংলাভাষা বিভাগ, ইউননান বিশ্ববিদ্যালয়, চীন এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক কর্মী। ইমেইল: shantamariavalia@gmail.com