০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ভাই: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসময়ের এক সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টা

মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তৌফিক ভাইয়ের ভালোবাসা এবং সাহসী উদ্যোগের উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে তার সম্পাদিত তিন খণ্ডের সংকলন গ্রন্থ—‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ: অন্তহীন যুদ্ধ—গৌরব, বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’।

তৌফিক ভাই: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসময়ের এক সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টা

নিভৃতচারী দুই বীরাঙ্গনাকে সম্মান জানিয়ে একাত্তরের ইতিহাসকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় স্থাপন; তৌফিক ইমরোজ খালিদীর পরিকল্পনায় এক অনবদ্য ও সাহসী প্রতিবাদ।

সালেক খোকন সালেক খোকন

Published : 03 Oct 2026, 10:03 AM

Updated : 03 Oct 2026, 10:24 AM

তার ছবির দিকে তাকাতে পারছি না—সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় ভেসে ওঠা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান সম্পাদক, আমাদের শ্রদ্ধেয় তৌফিক ইমরোজ খালিদী ভাইয়ের মুখটার দিকে বারবার চোখ গিয়েও থমকে যাচ্ছে। বুকের ভেতর জমাট বাঁধছে অবর্ণনীয় মনখারাপের মেঘ। সেই মেঘ যেন মাঝেমধ্যে পাহাড়সম ভার হয়ে চেপে বসেছে সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে।

মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে রাখা, নিঃশব্দে সাহস জুগিয়ে আগলে রাখা মানুষটা আর নেই—এই নির্মম সত্যিটা হৃদয়ে এমন শূন্যতার জন্ম দিয়েছে, যা বলে বোঝানো অসম্ভব। এক বিশাল মহীরুহ হঠাৎ উপড়ে পড়লে তার সুশীতল আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা ছোট চারাগাছগুলো যেমন সহসা অনাবৃত ও একাকী অনুভব করে, আমাদের অবস্থা ঠিক তেমনই।

তৌফিক ভাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শুধুই নন, আমার কাছে তিনি মুক্তিযুদ্ধের মানুষ। আমৃত্যু সরব ছিলেন রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী প্রশ্নে। ফলে চৌদ্দ বছর ধরে আমার করা তৃণমূলের মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। কোনো মাসে লেখা না দিলেই তৌফিক ভাই হোয়াটসঅ্যাপে নক করে জানতে চাইতেন লেখা বন্ধ কেন; কোনো সমস্যা থাকলে যেন তাকে জানাই। গবেষণার কাজে সাহসও দিতেন তিনি।

তার জানার ব্যাপ্তি ছিল অনেক। আলোচনা শুরু হলেই কয়েক ঘণ্টা কেটে যেত। নানা বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে ভাব ও বাক্য বিনিময় হতো অনেক। অনেক বিষয় অকপটেই তাকে বলতাম; কিন্তু রাগ করেননি কখনও। বরং বোঝার চেষ্টা করতেন।

এই প্রশ্রয়টা তৌফিক ভাই কেন আমাকে দিয়েছিলেন, শুরুতে তা জানা ছিল না। জানলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তিনি যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিলেন। শেষপর্যন্ত ওই বই তিন খণ্ডের এক আকরগ্রন্থে রূপ পেল। আমার জন্য তার ভালোবাসার কারণ ছিল এই মুক্তিযুদ্ধ; মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার গবেষণা।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তার মতো সাহসী সম্পাদক বাংলাদেশে দ্বিতীয়জন নেই—এটি হলফ করেই বলা যায়।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর প্রথম আঘাত আসে মুক্তিযুদ্ধের ওপর। যখন অন্য অনেক কিছু একাত্তরের গৌরবকে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল, তখন একাত্তরকে তুলে ধরেছে একমাত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কলম থামাইনি আমি। হুমকি ছিল, ছিল ভয়ও। কিন্তু তখন সাহস নিয়ে পাশে থেকেছেন তৌফিক ভাই এবং তার প্রতিষ্ঠান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তৃণমূলের গবেষণা থেকে আমার লেখা সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করেছে তারা, যার নেপথ্যের কারিগর ছিলেন তৌফিক ভাই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করার উৎসাহও পেতাম তার কাছ থেকে। খোঁজখবর নিতেন নিয়মিত, নানা পরিকল্পনাও করতেন।

Image

২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কার্যালয়ে সালেক খোকনের ‘গৌরব ও বেদনার একাত্তর’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

দারুণ আস্থা রাখতেন তৌফিক ভাই। ভালোবেসে কখনও কখনও তার সমালোচনা করলেও সঙ্গে থেকেছি সবসময়। এটি তিনিও খুব বুঝতেন।

গত বছর অক্টোবরের শেষের দিকের কথা। একদিন সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে ফোন আসে। প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী ভাই তখনই দেখা করতে বলেছেন; আমার সঙ্গে নাকি জরুরি কথা আছে।

কী কথা হতে পারে! ভাবনায় পড়ে গেলাম। বাসা কাছাকাছি হওয়ায় তখনই চলে যাই বিডিনিউজের অফিসে। সাংবাদিক রাজীব নূর আর জাহিদুল কবির ভাই বসে আছেন, তৌফিক ভাইয়ের কথা শুনছেন তারা। চোখেমুখে তার বেশ উচ্ছ্বাস। আমাকে দেখেই একটু হেসে বসতে বললেন। এরপর সরাসরি বললেন—‘মুক্তিযুদ্ধের একটি বই প্রকাশ করতে চাই ডিসেম্বরে। এমন বই, যে বই নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সত্য তুলে ধরবে। গবেষক হিসেবে এর যাবতীয় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিতে হবে আপনাকে।’

অবাক হয়ে তার দিকে খানিকটা তাকিয়ে রইলাম। দায়িত্বের কথা শুনে ভয়ও পেলাম। কেননা সামনে নির্বাচন, তাছাড়া ৫ অগাস্ট ২০২৪ তারিখের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা অনেকের কাছেই প্রায় অসম্ভব ব্যাপার ছিল। এ সময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই প্রকাশ ছিল সত্যিই খুব সাহসী কাজ। পাশাপাশি বিডিনিউজের জন্যও কাজটি ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও অলাভজনক। এসব জেনেও তৌফিক ভাই মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশ করার চিন্তায় অটল থাকলেন।

তা দেখে বলেছিলাম, এত গুরুদায়িত্ব আমার মতো সামান্য গবেষককে দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? তৌফিক ভাই অকপটে বললেন—‘মুক্তিযুদ্ধকে অন্তরে ধারণ করা সাহসী মানুষ এখন আপনিই।’ কথাগুলো এখনও যেন শুনছি আর চোখ দুটো ভিজে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধকে যখন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে, তখন তৌফিক ইমরোজ খালিদীই অভয় দিয়ে পাশে ছিলেন। এসব স্মৃতিও হয়তো একদিন ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবে।

ওইদিন দৃঢ়তার সঙ্গে তৌফিক ভাইকে বলেছিলাম—এই অসময়ে যে মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশ করার সাহস দেখায়, আমার কাছে সেটিও মুক্তিযুদ্ধ। আপনার সঙ্গে আছি।

তার নেতৃত্বে ও পরিকল্পনায় আমি ও রাজীব নূরসহ সাংবাদিকদের একটি টিম ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ: অন্তহীন যুদ্ধ-গৌরব বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’ নামের এ সংকলনের তিনটি খণ্ড প্রকাশ করি। প্রথম খণ্ড বের হয় ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে, দ্বিতীয় খণ্ড ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে এবং তৃতীয় খণ্ডটি ২৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে।

তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে এই সংকলন গ্রন্থ তিনটির নানা অধ্যায় নিয়ে পরিকল্পনা ও আলোচনা হয়েছে দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তার বাসায় বসে, বিডিনিউজের অফিসে। মুক্তিযুদ্ধের বই যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নির্মোহ হয়, তা যেন তৃণমূল ও জনযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরে—সেটিই ছিল তার ভাবনা।

‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ সংকলনের প্রতিটি খণ্ড প্রকাশের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা বা চিন্তা তিনি আমার ওপর নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিতেন। তবে চাইতেন বড় কোনো ব্যবসায়ী বা নামীদামি বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তি নন, মুক্তিযুদ্ধের বই মুক্তিযোদ্ধারাই উন্মোচন করুক; যা ওই সময় সত্যিই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।

সংকলনের প্রথম খণ্ড প্রকাশ করা হয় বিজয়ের মাসে, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে। তার কিছুদিন আগেই এক ইউটিউবার দুজন প্রকৃত বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে নানা অপবাদ ও বিভ্রান্তিমূলক মিথ্যা কাহিনি প্রচার করেছিল, যা ছিল নারী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি চরম অবমাননাকর। বিষয়টি আমাকে প্রবলভাবে ব্যথিত করে।

তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান নিয়ে আলাপ করার সময় ঘটনাটি তাকে জানালাম। তিনি ওই মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক ভিডিওটি দেখলেন, পাশাপাশি প্রকৃত সত্যটি জানলেন। অতঃপর বললেন, এ দুই বীরাঙ্গনাকে দিয়েই ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ সংকলন গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন করা হবে। তাই করা হলো।

দেশের স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ স্বীকার করা ওই দুই বীরাঙ্গনাকে এনে অনুষ্ঠান করে তিনি শুধু তাদের সম্মানিতই করলেন না, বরং একাত্তর নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতিবাদও কৌশলে জানিয়ে দিলেন; যা দেখে অভিভূত হয়েছিলাম।

ক্ষমতাসীনদের তোয়াজ করা তো দূরে থাক, সত্য প্রকাশের প্রশ্নে তৌফিক ভাই ছিলেন একেবারেই আপসহীন। আমার কাছে তৌফিক ভাই ছিলেন অসময়ে স্বপ্ন দেখা এক সাহসী মানুষ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সরব থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তাকে মামলা দিয়ে হয়রানি ও কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টা চলেছে; কিন্তু তবুও তিনি সত্য প্রকাশে পিছপা হননি।

আজকের সবকিছু আগামী ইতিহাসের অংশ হবে—এমন নয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তৌফিক ভাইয়ের ভালোবাসা এবং সাহসী উদ্যোগের উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে তার সম্পাদিত তিন খণ্ডের সংকলন গ্রন্থ—‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ: অন্তহীন যুদ্ধ—গৌরব, বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’।

আমার কাছে তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি অসময়ে দুঃসাহস নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শিকড়ের ইতিহাসের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ইতিহাসের গভীরে গিয়ে সত্যকে তুলে ধরার সাহস ও দায়বদ্ধতা নিঃসন্দেহে আরেক ইতিহাস হয়েই থাকবে।

বিদায়ী অভিবাদন, তৌফিক ভাই! আপনি আমাদের হৃদয়ে থাকবেন।

সালেক খোকন: লেখক ও গবেষক।