টস জয় ও বড় ইনিংসের জন্য অধিনায়ক চেয়েছিলেন দোয়া, কিন্তু ক্রিকেট মাঠের লড়াইয়ে তো প্রয়োজন হয় স্কিল, মানসিকতা, টেম্পারমেন্টের মিশেলে পারফর্ম করার, যেখানে ব্যর্থ বাংলাদেশ।
Published : 25 Oct 2023, 09:26 AM
আউট হওয়ার পর ব্যাট দিয়ে স্টাম্পে প্রায় মেরেই বসেছিলেন সাকিব আল হাসান। হুট করে তার হয়তো মনে হলো, এটা মিরপুর নয়, মুম্বাই। নিজেকে সামলে বাংলাদেশ অধিনায়ক মাঠ ছাড়লেন চরম হতাশায়।
এমন হতাশার মুহূর্ত অবশ্য বারবারই এলো তার জন্য। নিজের বোলিংয়ের সময় হতাশায় মাথার ওপরে হাত রাখলেন। সতীর্থদের বোলিং দেখে তার শরীরী ভাষায় ফুটে উঠল হতাশা। সব মিলিয়ে আরব সাগরের পাড়ে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে হতাশার সাগর বয়ে গেল যেন সাকিব ও বাংলাদেশ দলের জন্য। একটু স্বস্তির পরশ শুধু মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরি।
ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক অনুরোধ করেছিলেন, “দোয়া করবেন যেন টস জিততে পারি।” ব্যাটসম্যানদের টানা ব্যর্থতার প্রসঙ্গেও তিনি বলেছিলেন, “দোয়া করবেন যেন বড় রান করতে পারি।”
অধিনায়কের চাওয়ার পর দেশজুড়ে বিশেষ দোয়ার আয়োজন বা মিলাদ মাহফিল হয়েছে কি না, জানা নেই। তবে দোয়ার কমতি থাকার কথা নয়। এদেশের মানুষ যতটা ক্রিকেট পাগল, সব বয়সের সবার যতটা ক্রিকেট উন্মাদনা, দোয়া তারা প্রতিনিয়তই করেন। অধিনায়ক মজা করেই দোয়ার আর্জি জানান বা সত্যিই মন থেকে, ক্রিকেট অনুসারীদের দোয়া তাদের সঙ্গে থাকে সবসময়ই।
তবে ক্রিকেট খেলাটা তো দোয়া দিয়ে চলে না! এখানে দাওয়া লাগে। স্কিল, মানসিকতা, টেম্পারমেন্ট লাগে। জয়ের তীব্র ক্ষুধা লাগে। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার, নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার তাড়না লাগে। ঐক্যবদ্ধ পারফরম্যান্স লাগে। উজ্জীবিত প্রচেষ্টা লাগে।
বাংলাদেশের হারটা অপ্রত্যাশিত নয়। এই দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে বড় পরাজয়ও বিস্ময়কর নয়। তবে এমন অসহায় আত্মসমর্পণ হতাশাজনক। লড়াইয়ের তাড়না না থাকাটা বিস্ময় জাগানিয়া। বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা এক দল ক্রিকেটারের মধ্যে কিছু একটা করার তেষ্টা কেন থাকবে না!
দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাতে হলে টস জিতে আগে ব্যাটিং করতে হবে এবং মোটামুটি একটা সংগ্রহ গড়ে তাদেরকে চাপে ফেলার (পড়ুন তাদের চোক করার) অপেক্ষা করতে হবে। আগে ব্যাট করে রানের জোয়ার বইয়ে দেওয়া দলটি এভাবেই হেরে গেছে নেদারল্যান্ডসের কাছে। এই মন্ত্র মোটামুটি এতটাই স্বীকৃতি পেয়ে গেছে যে, সাকিবের মতো বাস্তববাদী ক্রিকেটারও টস জয়ের দোয়া চেয়ে রাখেন!
সেই টসটা বাংলাদেশ হেরেছে। ম্যাচ কি তখনই শেষ? বাংলাদেশের শুরুটা তো তা বলছে না। টস হেরে আগে বোলিংয়ে নামলেও দক্ষিণ আফ্রিকাকে উড়ন্ত সূচনা পেতে দেয়নি বোলাররা। শূন্য রানে জীবন পাওয়া রিজা হেনড্রিকসকে দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বোল্ড করে যখন হৃতিক রোশানের ‘এক পাল কা জিনা’ গানের ভঙ্গিতে নাচলেন শরিফুল ইসলাম, গোটা দলও যেন নেচে উঠল আনন্দে। নতুন বলে দুর্দান্ত বোলিং করা মেহেদী হাসান মিরাজ যখন ফেরালেন রাসি ফন ডার ডাসেনকে, তার খ্যাপাটে উদযাপনের সঙ্গে তেতে উঠল দলের সবাই।
৮ ওভারের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার দুই উইকেট নেই, রানরেট পাঁচের নিচে, এর চেয়ে কাঙ্ক্ষিত শুরু আর কী হতে পারে!
এরপর প্রয়োজন ছিল এই মোমেন্টামকে সঙ্গী করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে চাপে ফেলা। হলো উল্টো। একটু একটু করে ফাঁস আলগা করলেন কুইন্টন ডি কক ও এইডেন মার্করাম।
গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের অফ স্পিনে ওয়ানডেতে চারবার আউট হয়েছেন ডি কক। রাভিচন্দ্রন অশ্বিন ও আকিলা দানাঞ্জয়ার স্পিনে তিনবার করে। সেই ‘ম্যাচ আপ’ ভাবনায় মিরাজকে টানা সাত ওভারের স্পেল করালেন সাকিব। ডি কক একবার ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে একটি ছক্কা মারলেন বটে। আর খুব বেশি ঝুঁকি নিলেন না মিরাজের বলে। একদম ঠাণ্ডা মাথায় কাটিয়ে দিলেন।
মার্করামের জন্য শর্ট কাভারে দুটি ফিল্ডার রেখে বোলিং করে গেলেন সাকিব ও নাসুম আহমেদ। এই চ্যালেঞ্জও ঠাণ্ডা মাথায় উতর গেলেন মার্করাম।
এই সময়টাতেই চূড়ান্ত ব্যর্থ বাংলাদেশ। চাপে থাকা ব্যাটসম্যানদের আরও চেপে ধরতে পারেনি বোলাররা। মিরাজের প্রথম স্পেল ছাড়া আর কোনো বোলার ধারাবাহিকভাবে ভালো জায়গায় বল রাখতে পারেননি। দুটি-তিনটি বল ভালো করে পরেরটিই দিয়েছেন আলগা। তাতে চাপও হয়ে যায় আলগা।
মুস্তাফিজুর রহমান থেকে শরিফুল ইসলাম, সাকিব থেকে নাসুম, সবাইকে এই দায় দেওয়া যায়। হাসান তো চূড়ান্ত হতাশ করেন। নিজের প্রথম দুই ওভারে রান দেন ২২। বাধ্য হয়ে ২০ ওভারের মধ্যে সাত বোলার ব্যবহার করেন অধিনায়ক।
আলগা বোলিংয়ের সেই প্রবণতা বাড়তে থাকে সময়ের সঙ্গে। শরীরী ভাষা পতনের দিকে যেতে থাকে প্রতিটি ওভারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। বড় শটের চেষ্টায় মার্করাম উইকেট বিলিয়ে দিলে ১৩১ রানের জুটি ভাঙে বটে। কিন্তু বাংলাদেশ দলের মনোবল তখন যেন আর অবশিষ্ট কিছু নেই। সবাই ধরেই নিয়েছেন, বড় স্কোর হবেই।
বাড়তি কিছুর চেষ্টা বা তাড়নাই দেখা গেল না। ডি কক ও হাইনরিখ ক্লসেন তাই তাণ্ডব চালালেন। বাংলাদেশ অবশ্যই আগেই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। কে কোথায় বল করছেন, কেমন পরিকল্পনা, সেসবের ঠিক নেই। কিছু ভালো বলেও অবশ্য তারা মার খেয়েছেন। তাতে তাদের বোলিং হয়ে পড়েছে আরও এলোমেলো। ইয়র্কার দিতে গিয়ে হাফভলি পড়েছে। মুস্তাফিজ তো ফুল টসের পর ফুল টস দিয়ে গেছেন।
রান যখন ৩৮২, বাংলাদেশের তা নাগালের অনেক অনেক বাইরে। প্রথম ইনিংস শেষের আগেই আসলে ম্যাচ শেষ।
এরপরও দেখার ছিল, বাংলাদেশ লড়াই কতটা করতে পারে। এই ব্যাটিং উইকেটে কতটা জবাব দিতে পারে। কত দূর তারা যেতে পারে। কতটা অভিপ্রায় বা তাড়না দেখাতে পারে।
সেই জবাব পাওয়া হয়ে যায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই। ১৫ ওভার শেষে বাংলাদেশের রান ৫ উইকেটে ৫৮!
এই স্কোরের চেয়েও বড় সমস্যা ছিল খেলার ধরন। পাহাড়সম রান তাড়ার চেষ্টাই তো দেখা গেল না দুই ওপেনারের ব্যাটে। প্রথম ৫ ওভারে বাউন্ডারি আসে মোটে ২টি। রানরেট ছিল চারের কম।
একটু মন্থর শুরুর পর দুই ওপেনারের দায়িত্ব ছিল উইকেট ধরে রেখেই রানের গতি বাড়ানো। তারা ব্যর্থ সেখানেও। তানজিদ হাসান ও নাজমুল হোসেন শান্ত বিদায় নেন টানা দুই বলে। শরীর তাক করে বোলিংয়ের যে কৌশল নেন ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি লম্বা পেসার মার্কো ইয়ানসেন, সেটির জবাব দিতে পারেননি দুজনের কেউ।
এই বছর দেশের সফলতম ওয়ানডে ব্যাটসম্যান শান্ত বিশ্বকাপে ফিফটি দিয়ে শুরুর পর ব্যর্থ হলেন টানা চার ম্যাচে। এর মধ্যে দুটিই গোল্ডেন ডাক।
আরেক ওপেনার লিটন কুমার দাস এক প্রান্তে টিকে ছিলেন বটে। তবে ছিলেন অনেকটা না থাকার মতোই। অবিশ্বাস্যভাবে, প্রথম ২৮ বলে তার স্রেফ তিনটি স্কোরিং শট ছিল। তিনটি বাউন্ডারি। বাকি ২৫ বল ডট!
এরপর জেরল্ড কুটসিয়ার বলে একটি ছক্কা মেরেছেন বটে। তবে রান-বলের টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত কমাতে পারেননি। ইনিংস বড়ও করতে পারেননি। দৃষ্টিকটূ ইনিংস খেলে বিদায় নেন ৪৪ বলে ২২ রান করে।
৩৮৩ রান তাড়া করা ওপেনারের ব্যাটিং এমন!
অধিনায়ক সাকিব তো দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলে বিদায় নিয়েছেন আগেই। মুশফিকুর রহিমও উইকেট হারান আপার কাটে ছক্কার চেষ্টায়। সব মিলিয়ে লড়াইয়ের আশা ধুলিস্যাৎ।
লড়াই করলেন কেবল মাহমুদউল্লাহই। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয়, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরাজয়, দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড় জয়- এরকম নানা কিছুর চোখরাঙানির মধ্যে তিনি দলকে একটু ভদ্রস্ত পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। লোয়ার অর্ডারদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই চালিয়ে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি তিনি উপহার দেন।
তার জন্যও নিশ্চয়ই দোয়া অনেকের ছিল। কিন্তু তার জানা ছিল দাওয়া। সেটির প্রয়োগ করেছেন বলেই তিনি পেরেছেন।
সেই দাওয়া এখন প্রত্যেকের বের করতে হবে নিজের জন্য। বের করতে হবে দল হিসেবেও। বাংলাদেশের মতো দলে, যেখানে পার্থক্য গড়ার মতো ক্রিকেটার খুব বেশি নেই, সেখানে প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ পারফরম্যান্স। এই ছন্নছাড়া অবস্থা থেকে প্রয়োজন গুছিয়ে ওঠা। নিজেদের অনুপ্রাণিত করার পথ বের করা।
দলীয় পারফরম্যান্সের পূর্ণতা না দেখাতে পারলে স্রেফ দোয়ার ভেলায় সাফল্যের ঠিকানা মেলে না।