বিতর্ক-জেল-নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে বিপিএল দিয়ে নতুন পথের খোঁজে গুনাথিলাকা

বিপিএলে খেলতে আসা শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কথা বললেন অস্ট্রেলিয়ায় তার জেলে যাওয়া, ক্যারিয়ারজুড়ে মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক, নতুন স্বপ্ন এবং আরও অনেক কিছু নিয়ে।

শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদশাহাদাৎ আহমেদ সাহাদসিলেট থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 31 Jan 2024, 03:02 PM
Updated : 31 Jan 2024, 03:02 PM

দানুশকা গুনাথিলাকা আর বিতর্ক যেন সমার্থক। ক্যারিয়ারজুড়ে পারফরম্যান্সের জন্য যতবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন, এর চেয়ে বেশি হয়েছেন নানা সময়ে শৃঙ্খলা ভেঙে। তাকে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের ‘ব্যাডবয়’ তকমা দিলেও ভুল কিছু হয় না। সবশেষ ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে এক নারীকে যৌন নির্যাতনের মামলায় জেলেও যেতে হয়েছে তাকে। সিডনিতে প্রায় এক বছরের আইনী লড়াই শেষে শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরেছেন ক্রিকেট মাঠে। এবারের বিপিএলে খেলছেন তিনি দুর্দান্ত ঢাকার হয়ে। 

তুমুল প্রতিভাবান আর ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্যের কারণেই একের পর সুযোগ পেয়েছেন তিনি। কিন্তু ভুল পথে পা বাড়িয়েছেন বারবারই। ক্রিকেট থেকে নিষেধাজ্ঞা পেয়েছেন অন্তত চার দফায়। তিরস্কৃত হয়েছেন আরও কয়েকবার। মাঠে প্রতিপক্ষ ক্রিকেটারের সঙ্গে ঝামেলা পাকানো, মাঠের বাইরে দলের কারফিউ ভাঙা, এরকম নানা ঘটনায় জড়িয়েছেন বারবার। অস্ট্রেলিয়ায় নারী নির্যাতনের ঘটনায় তো রক্ষা পেয়েছেন সমূহ সবচেয়ে বড় বিপদ থেকে। 

শ্রীলঙ্কার হয়ে একশর বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ৩২ বছর বয়সী ক্রিকেটার এখন লড়াই করছেন ক্যারিয়ারের বাকি অধ্যায় নতুন করে সাজাতে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি শোনালেন মাঠের বাইরের কঠিন সময়ের মোকাবিলা করা, ক্রিকেটে ফেরা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ আরও অনেক কিছু নিয়ে।   

বিপিএল কেমন দেখছেন? 

দানুশকা গুনাথিলাকা: টুর্নামেন্ট সব মিলিয়ে ভালো লাগছে। যদিও আমরা প্রথম ম্যাচ জেতার পর তিনটি হেরেছি। তবে আমাদের দলটা খুব ভালো। আমাদের দলে সুপারস্টার নেই। তবে ভারসাম্য দারুণ। আমাদের কিছুটা স্মার্ট হতে হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলতে হবে। 

চার ম্যাচে তিনটিতে হারের পর এখন প্লে-অফের সম্ভাবনা কতটা ? 

গুনাথিলাকা: আমাদের এখনও ৮টি ম্যাচ বাকি আছে। অন্তত ৪-৫টি ম্যাচ জিততে হবে। যেটা বললাম, আমাদের দল ভালো। সবশেষ তিন ম্যাচে পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলতে পারিনি আমরা। তাই আমাদেরকে পরিস্থিতি আরও ভালো বুঝতে হবে এবং সে অনুযায়ী খেলতে হবে। তা করতে পারলে আমরা ম্যাচ জেতা শুরু করব। 

শুধু প্লে-অফ নয়, আমরা ফাইনাল জিততে পারব। আমাদের দল খুব ভালো। অন্য দলের মতো সুপারস্টার হয়তো নেই, তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার মতো অনেকেই আছে। তাই আমাদের এখন চৌকস হতে হবে। দলে বড়  তারকা থাকুক বা অনেক জুনিয়র ক্রিকেটার, মাঠে পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত ক্রিকেট খেলতে হবে।  

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ঠিক সময়ে সেরাটা দিতে পারাটাই তাহলে মূল ব্যাপার? 

গুনাথিলাকা: টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে যে কোনো কিছুই হতে পারে। যে কোনো দল জিততে পারে। সবসময়ই জয়ের সম্ভাবনা থাকে। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট হলো মূলত পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার ব্যাপার। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো কন্ডিশনে, যা অনেকটা শ্রীলঙ্কার মতোই। ব্যক্তিগতভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের উইকেট-কন্ডিশন সম্পর্কে আমার বেশ ভালো ধারণা আছে। আমি তিন মাঠেই খেলেছি।  

দলের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, আমি বলেছি যে, 'চলো পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলি।' নতুন বলে খেলা কিছুটা কঠিন। বিশেষ করে মিরপুরে।  আমি সেখানে ভালো শুরু করেছি। তবে আমাদেরকে সিলেটে অন্তত একটি ম্যাচ জিততে হবে, আবার ঢাকায় ফেরার আগে। মাঠে আমাদের কিছুটা চৌকস হতে হবে। আমাদের ভালো ক্রিকেটার আছে। আমরা ম্যাচ জিততে পারব। 

বিপিএলে আপনার শুরুটা বেশ ভালো হয়েছিল। এক ম্যাচ পর থুতনিতে বলের আঘাত পেলেন। অনেকগুলো সেলাই লেগেছিল... 

গুনাথিলাকা: হ্যাঁ, শুরুটা ভালো করেছিলাম। অস্ট্রেলিয়ার ঘটনার কারণে প্রায় দশ মাসের বিরতির পড়েছিল ক্রিকেটে। এই বিপিএল দিয়েই প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরেছি (দেশের বাইরে)। সেটিই ছিল আমার প্রথম ম্যাচ। চল্লিশ রানের মতো করেছিলাম।  

এরপর তো (থুতনি দেখিয়ে) এখানে বল লাগল। ২৪টি সেলাই লেগেছিল। দেখে হয়তো বোঝা যায় না। কোচ এবং অন্যরা আমাকে ওই ম্যাচে নামার কথা বলেছিল। কিন্তু আমি ৭৫ ভাগও ফিট ছিলাম না। চোয়াল খুব ব্যথা করছিল। বিশ্রাম দরকার ছিল। কারণ শতভাগ ফিট অবস্থায় না থাকলে খেলার কোনো মানে নেই।  

দশ মাস বিরতির কথা বললেন। অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরে ঘরোয়া ৫০ ওভারের টুর্নামেন্ট খেলেছেন। লম্বা একটা বিরতির পর আবার খেলা শুরুর সময় ভাবনা কী ছিল? ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন পরিকল্পনা কি করেছেন তখন? 

গুনাথিলাকা:  শ্রীলঙ্কার মেজর ক্লাব ক্রিকেট টুর্নামেন্টে কয়েক ম্যাচ খেলেছিলাম। ওই টুর্নামেন্টে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। এরপর এখানে আসার আগে আমি নিজেকে বললাম, 'ঠিক আছে যা হওয়ার হয়েছে, জাতীয় দলে ফেরার জন্য এটি (বিপিএল) ভালো সুযোগ।' টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও আছে সামনে আছে। এটিই আমার পরিকল্পনা। ভালো খেলে বিশ্বকাপ দলে যেন সুযোগ পেতে পারি।  

অস্ট্রেলিয়ার ঘটনার কথা বললেন আপনি। নিশ্চিতভাবেই সুখকর অভিজ্ঞতা নয়। ওই সময়টা নিয়ে কি বলবেন? 

গুনাথিলাকা: না… ঠিক আছে। অবশ্যই খুব খারাপ অভিজ্ঞতা ছিল। একইসঙ্গে ইতিবাচক বিষয়ও আছে। আমি অবশ্য এটিকে খারাপ বলব না। কারণ শেষ পর্যন্ত সব কিছু পরিষ্কার হয়েছে এবং আমার ওপর থাকা সব অভিযোগ ও মামলা সরে গিয়েছে। এখন আইনী খরচ ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছি। (আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া সরকারের কাছে আইনী লড়াইয়ের খরচ হওয়া অর্থ দাবি করেছেন তিনি)। 

ওই সময় ক্রিকেট নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন? 

গুনাথিলাকা: অস্ট্রেলিয়ায় আমার খুব ভালো সুযোগ-সুবিধা ছিল। নিয়মিতই অনুশীলন করতাম। জিমে সময় দিতাম। (নিষিদ্ধ থাকায়) কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলার সুযোগ ছিল না। তবে নিয়মিতই অনুশীলন করতাম, জিমে যেতাম, মাঝে মাঝে ক্লাব ম্যাচও খেলতাম। 

ব্যস্ত সূচির কারণে সাধারণত এত বড় বিরতি পাওয়া যায় না। তাই এই সময়টা কি আপনার জন্য নিজের খেলা আরেকটু উন্নত করার কোনো ধরনের সুযোগ এনে দিয়েছিল?  

গুনাথিলাকা: হ্যাঁ… বলা যায়। তখন অনুশীলন করতাম। সকালে উঠে জিমে যেতাম। এরপর দেড়-দুই ঘণ্টার অনুশীলন সেশন। আবার বিকেলে জিমে যেতাম। সপ্তাহে চার দিন অনুশীলন করতাম। এটিই আমার প্রাত্যাহিক রুটিন ছিল।  

অস্ট্রেলিয়ায় তখন শীতকাল হওয়ায় আমার জন্য কিছুটা কঠিন ছিল। ওই সময় তারা ক্রিকেট খেলে না তেমন। আমার মনে হয়, আমি খুশি। কারণ ব্যক্তিগতভাবে অনুশীলন করার জন্য ভালো একটা সময় পেয়েছি।  

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চোখ রাখার কথা বললেন আপনি। হাসারাঙ্গা ডি সিলভাকে অধিনায়ক করে ওই টুর্নামেন্টের জন্য হয়তো দল সাজানোর কাজে হাত দিয়েছে শ্রীলঙ্কা। যদি সুযোগ পান, তার আগ্রাসী নেতৃত্ব কি আপনার জন্য বাড়তি সুবিধা হতে পারে?  

গুনাথিলাকা: হাসারাঙ্গার সঙ্গে আমি অনেক খেলেছি। সবশেষ এলপিএলে তার অধিনায়কত্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ক্যান্ডি। আমি মনে করি, অধিনায়ক হিসেবে সে খুব ভালো। আমি নিশ্চিত সে ভালো করবে।  

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অবশ্যই কিছুটা আগ্রাসী হতে হবে। কারণ খেলা এখন খুবই গতিপূর্ণ। আধুনিক ক্রিকেট এটিই চায়। তাই অধিনায়ক হিসেবে এখানে আগ্রাসী হতে হয়। আর অধিনায়কের সমর্থন থাকলে যে কোনো পরিস্থিতিতে আগ্রাসী ব্যাটিং করাটাও সহজ হয়।  

কয়েক বছর ধরে আপনাদের দেশে এলপিএল চলছে। ওই টুর্নামেন্টের অগ্রগতি কেমন দেখছেন? 

গুনাথিলাকা: এলপিএল খুব ভালো করছে। সত্যি বলতে, আমার ধারণার চেয়েও ভালো এগোচ্ছে। অনেক ভালো ক্রিকেটাররা খেলছে। একইসঙ্গে উদীয়মান ক্রিকেটাররাও সুযোগ পাচ্ছে। সব দেশের লিগই এখন বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এসব লিগে সবাই খেলতে চায়। তাই এই টুর্নামেন্টগুলো রোমাঞ্চকর হয় এবং দলে সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়। সবাই ভালো খেলতে চায়। 

এলপিএল, বিপিএল বা অন্যান্য টুর্নামেন্টগুলো খেললে যেটা হয়, যখন কেউ জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ে যায়, এসব লিগে ভালো খেলে নিজ দেশে ফেরার দাবি জানাতে পারে। এখানে পারফর্ম করে জাতীয় দলের ফেরার জন্য ভালো মঞ্চ এসব লিগ। 

এলপিএলের প্রথম আসরে আপনি সর্বোচ্চ রান করেছিলেন। সেখান থেকে ক্যারিয়ারে নিশ্চয়ই আরও সামনে এগোনোর কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু মাঠের বাইরে নানান ঘটনায় প্রত্যাশামাফিক সব হয়নি। পেছন ফিরে তাকালে কী মনে হয়? 

গুনাথিলাকা: হ্যাঁ, মাঠের বাইরে আমার বেশ কিছু ঘটনা আছে। অন্যথায় আমার ক্যারিয়ারের অবস্থা হয়তো অন্যরকম থাকত। সেসব ঘটনায় আমার আক্ষেপ কাজ করে। তবে দিন শেষে ক্রিকেটের বাইরেও নিজের জীবন এগিয়ে নিতে হবে। যদি সেসব ঘটনা না আসত আমার জীবনে, তাহলে ভালো হতো। তাহলে হয়তো ক্রিকেটে আরও ভালো জায়গায় থাকতাম।  

আপনার জীবনে হওয়া সব কিছু বিবেচনা করলে এই বিপিএল তাহলে দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু? 

গুনাথিলাকা: হ্যাঁ,অবশ্যই!

 এই ইনিংসে তাহলে নতুন রূপে শুরু করতে চান? আপনার পরিকল্পনা কেমন? 

গুনাথিলাকা: যেমনটা বললাম, গত দশ মাস আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। এই সময়ে আমার মধ্যে উপলব্ধি এসেছে যে, অনেক ভুল করেছি। আমি বলব, এটি আমার জন্য ভালো শিক্ষা ছিল। একইসঙ্গে বলব, এমন অবস্থা থেকে ফিরে যদি আবার দেশের হয়ে খেলতে পারি, এটিও ভালো অর্জন হবে আমার জন্য।  

আমি এই চ্যালেঞ্জটা নিতে চাই। তাই কঠোর পরিশ্রম করছি এবং জাতীয় দলে ফেরার জন্য লড়ছি। এটিই আমার মূল লক্ষ্য। মনোযোগের পুরোটা জুড়ে এখন এটি। আবার জাতীয় দলে ফিরতে চাই, দেশের জন্য খেলতে চাই। 

ঢাকা দলে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটার আছে বেশ কয়েকজন। আপনি ছাড়াও লাসিথ সামারাকুন, লাসিথ ক্রুসপুলরা আছেন। স্বদেশি ক্রিকেটাররা থাকায় মানিয়ে নেওয়া সহজ হয় নিশ্চয়ই? 

গুনাথিলাকা: তাদের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক, ভাইয়ের মতো। নিজ দেশের ক্রিকেটার আশপাশে থাকা সবসময়ই ভালো। এছাড়া তাসকিন আহমেদসহ অনেকের সঙ্গে আমি অনেক দিন ধরে খেলছি। বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটারকে আমি চিনি। আমি বাংলাদেশ পছন্দ করি। বিশেষ করে ঢাকা। খুব ভালো জায়গা।