হাইলাইটস দেখে লিটনের মনে হয়, ‘কী ব্যাটিং করি!’

তার সৌন্দর্যময় ব্যাটিংয়ে মুগ্ধ প্রায় সবাই, তবে তার নিজের মতে, আরও ভালো করার সুযোগ আছে।

শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদচট্টগ্রাম থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Jan 2023, 02:46 AM
Updated : 18 Jan 2023, 02:46 AM

দৃশ্যটি মাশরাফি বিন মুর্তজার সবশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের পরের সংবাদ সম্মেলনের। ওই ম্যাচে দেশের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ড গড়া লিটন দাসকে সঙ্গে নিয়ে আসেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। সেদিন মাশরাফি বলেন, ‘দুইজনের ব্যাটিং সবসময় ভালো লাগে আমার। একজন বিরাট কোহলি, আরেকজন লিটন দাস।’ 

মাশরাফিই প্রথম নন, শেষ তো ননই। লিটনের ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্যের অবারিত প্রশংসা করেছেন বিশ্বের অনেক খ্যাতিমান ধারাভাষ্যকার-বিশ্লেষক। ইয়ান বিশপ তো এনেছেন বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসার উপমা। অথচ নিজের ব্যাপারে লিটনের ভাবনা পুরোপুরি ভিন্ন। তার কি না নিজের ব্যাটিং দেখতে ভালো লাগে না!

ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোর খারাপ সময় পেরিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই দারুণ ছন্দে লিটন। যে কোনো সংস্করণে সমান তালে মুগ্ধতা ছড়ায় তার ব্যাট। যা চলমান এবারের বিপিএলেও। চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের বিপক্ষে ২২ বলে ৪০ রানের পর সিলেট স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে মঙ্গলবার খেলেন ৪২ বলে ৭০ রানের ইনিংস।

নান্দনিকতার দিক থেকে কোন শট এগিয়ে, তা নিয়ে তর্ক করা যেতে পারে। একেকটি শট যেন ছিল শিল্পীর তুলির ছোঁয়া। পরম যত্নে বলের গায়ে আদরমাখা স্পর্শে পাঠিয়ে দেন সীমানায়। আগ্রাসন ও সৌন্দর্যের অসাধারণ মিশেলে পরপর দুই ম্যাচে তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের জয়ে ম্যান অব দা ম্যাচ।

যার ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য নিয়ে সবার মুগ্ধতার শেষ নেই, সেই লিটন কি পরে নিজের ব্যাটিং দেখেন? সাগরিকায় মঙ্গলবার সিলেটের বিপক্ষে জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে তার কাছে রাখা হয় এই প্রশ্ন। লিটনের উত্তরে হাসির রোল উঠল সংবাদ সম্মেলনে।

“(নিজের ব্যাটিংয়ের হাইলাইটস) দেখি… কিন্তু দেখে মনে হয়, কী ব্যাটিং করি! এটা একেক জনের দৃষ্টিকোণ একেক রকম থাকে। তবে আমার কাছে মনে হয়, আরও ভালো করার সুযোগ আছে।” 

সিলেটের বিপক্ষে ম্যাচের চতুর্থ ওভারের ঘটনা। হাফ ভলি থেকে অনেকটা টেনে বলটি করেছিলেন মাশরাফি। খানিক এগিয়ে আলতো করে ব্যাট ছোঁয়ালেন লিটন। চোখের পলকে বলের ঠিকানা এক্সট্রা কভার সীমানায়। 

পরের বল আরও একটু টেনে দেন সিলেট অধিনায়ক। ডেলিভারি আগের চেয়ে ভালো হলেও লিটন খেললেন তার চেয়েও নিখুঁত শট। আগের চেয়ে আরও আলতো করে খেলে কভার দিয়ে মারলেন চার। 

প্রেসবক্সে তখন রীতিমতো তর্ক শুরু হয়ে যায়, এই সময়ে কভার ড্রাইভ সবচেয়ে ভালো খেলেন কে, বিরাট কোহলি, বাবর আজম নাকি লিটন দাস? এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে লিটনের নিজের পছন্দের শট কোনটি তা তো জানা সম্ভব!

এই প্রশ্ন রাখা হলে লিটন জানান ক্রিকেটের কঠিন শটগুলোর মধ্যে একটির কথা।

“স্ট্রেট ড্রাইভটা আমার পছন্দের শট। কিন্তু আমি (সেটা) খেলতে পারি না (হাসি)... সত্য কথা। আমি যখন স্ট্রেইট ড্রাইভ মারি, আমার কাছে খুব ভালো লাগে। অনেক সময় নিজেই বিস্মিত হয়ে যাই যে, আমি এই শটটা মারছি!”

যদিও তিনি বলছেন ‘খেলতে পারি না’, আদতে খুব একটা খারাপ খেলেন না। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই স্ট্রেইট ড্রাইভে পারদর্শিতা দেখান তিনি। নিজের দ্বিতীয় টেস্টে প্রথম ফিফটি করার পথে ইতিহাসের সেরা পেসারদের একজন ডেইল স্টেইনের বলে দৃষ্টিনন্দন এক স্ট্রেইট ড্রাইভ খেলেন তিনি। এরপর নানা সময়ে এই শট খেলতে দেখা গেছে তাকে। 

অবশ্য শুধু স্ট্রেইট ড্রাইভ বা কভার ড্রাইভ নয়, লিটনের হাতে আছে ক্রিকেট বইয়ের প্রায় সব শট। যেদিন ছন্দে থাকেন, উইকেটের চারদিকে এসব শটের পসরা সাজিয়ে বসেন। স্ট্রাইক রেট বাড়তে থাকে তরতরিয়ে। খেলেন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সব ইনিংস। বিপিএলেও সবশেষ তিন ম্যাচে দ্রুত গতিতে রান করেছেন লিটন। এর দুইটিতেই জিতেছে তার দল।

ইতিবাচক মানসিকতায় ব্যাটিংয়ের এই ঘরানা ধরে রেখেই এগোতে চান লিটন।

“আমার পঞ্চাশের যে ইনিংসগুলো, যেগুলো দলকে জেতাতে সাহায্য করেছে বা খেলার মোড় ঘোরাতে সাহায্য করেছে, সবগুলোই কম বলে খেলা। আমি কখনও ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টিতে বেশি বল নিয়ে ইনিংস খেলিনি।” 

“আমার মনে হয়, আমার ধরনটাই এমন, আক্রমণাত্মক খেলতে পছন্দ করি। কখনও এমন হয় না যে ৪০ বলে ৪০ করি। আমি ৪০ বল খেললে ৬০-৭০ রান হয়ে যায়। এতদিন ধরে যেভাবে সফল হয়েছি ওই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই। ওই ক্রিকেটটাই খেলতে চাই।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক