সিলেটে হৃদয়, জাকিরদের সাফল্যের রেসিপি জানালেন মাশরাফি

তরুণদের ইচ্ছেমতো খেলার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে পুরোপুরি সমর্থন দেওয়া হচ্ছে, বললেন সিলেট অধিনায়ক।

ক্রীড়া প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 Jan 2023, 04:42 AM
Updated : 11 Jan 2023, 04:42 AM

বিপিএলে টানা চার ম্যাচ জিতেছে একটি দল, সেখানে বিদেশিদের অবদান সামান্য। চার ম্যাচের প্রতিটিতেই ম্যাচ সেরা দেশের ক্রিকেটার। প্রতি ম্যাচেই জয়ে মূল ভূমিকা দেশের তরুণ ক্রিকেটারদের। আগের কোনো বিপিএলে যা দেখা যায়নি, সিলেট স্ট্রাইকার্সে এবার দেখা যাচ্ছে তেমন কিছুই। চমকপ্রদ এই পরিবর্তন ও পারফরম্যান্সর পেছনে দলের আবহ ও পরিবেশ বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন সিলেটের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। 

বিপিএলে এবারই প্রথম সিলেটের কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজিতে খেলছেন মাশরাফি। তার নেতৃত্বে বদলের ছাপ সিলেটের ভাগ্যেও। বরাবরই যে দল পয়েন্ট তালিকার তলানির দিকে থাকে, সেই সিলেট এবার মাশরাফির নেতৃত্বে শুরু করেছে টানা চারটি জয় দিয়ে।

মাশরাফি নেতৃত্ব দিচ্ছেন সামনে থেকেই। ৭ উইকেট নিয়ে এখনও পর্যন্ত যৌথভাবে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি তিনি। তবে মাঠের সাফল্যে তিনি আসলে পার্শ্বনায়ক। উইকেটের সামনে-পেছনে ও ড্রেসিং রুমে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন মুশফিকুর রহিম। লঙ্কান অলরাউন্ডার থিসারা পেরেরা ও পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ আমিরও রাখছেন অবদান। তবে প্রতিটি ম্যাচেই সিলেটের সাফল্যের মূল নায়ক তরুণরা। 

অভিজ্ঞ রুবেল হোসেনকে না খেলিয়ে প্রথম ম্যাচে রেজাউর রহমান রাজার ওপর আস্থা রাখেন মাশরাফিরা। তরুণ এই পেসার ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হন সেদিন। পরের তিন ম্যাচেই ম্যান অব দা ম্যাচ ব্যাটসম্যান তৌহিদ হৃদয়। এবারের বিপিএলের বিস্ময় বলা যায় তাকে। ম্যাচের পর ম্যাচ অবিশ্বাস্য ব্যাটিং করে চলেছেন, বিপিএলে আগে যে রূপে কখনোই দেখা যায়নি দেশের কোনো তরুণ ব্যাটসম্যানকে। 

জাতীয় দলের পারফরম্যন্সে প্রবল সমালোচনার মধ্যে থাকা নাজমুল হোসেন শান্ত সিলেটে দলে নিজের ভূমিকা ঠিকঠাক পালন করে রান করে চলেছেন ধারাবাহিকভাবে। সিলেটের জয়ে বড় অবদান রাখছেন জাকির হাসানও। গত মাসে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্ট সিরিজে ধৈর্য ও স্থিরতা দিয়ে নজর কাড়া এই তরুণ বিপিএলে এসে টি-টোয়েন্টির দাবি মিটিয়ে বিধ্বংসী ব্যাটিং করে চলেছেন। 

সব মিলিয়ে এই সিলেট দলের ‘নিউক্লিয়াস’ তরুণরাই। তৌহিদ হৃদয় দুই দিন ম্যাচ সেরা হয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, দল থেকে কোচ-অধিনায়ক তাদেরকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। মঙ্গলবার ঢাকা ডমিনেটর্সের বিপক্ষে জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে সেটিরই বিস্তারিত তুলে ধরলেন মাশরাফি। 

“আমাদের তরুণ ক্রিকেটার যারা আছে, ওদেরকে চাপে না ফেলে এই স্বাধীনতা দেওয়া আছে যে, ওরা যেভাবে চায় নিজেদের মেলে ধরতে পারে। এটাও সত্যি যে ওরা বেশ কিছুদিন ধরে খেলছে। ‘এ’ দলে খেলেছে, এইচপিতে খেলেছে, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে খেলেছে ওরা সবাই। এই ধারণা তাই ওদের আছে যে কীভাবে খেলতে হবে। আর এই উইকেটে ওরা খেলেছেও অনেক।” 

“ওদেরকে যেটা বলা হয়েছে যে, উইকেট বুঝে টি-টোয়েন্টি যেভাবে খেলা উচিত, সেভাবে যেন খেলে। ওই স্বাধীনতা ওদের শুরু থেকেই দিয়েছি। আমাদের থেকে ওদের ওপর কোনো চাপ নেই।” 

বাংলাদেশের ক্রিকেটের শীর্ষ পর্যায়ে প্রায় দুই যুগের পথচলা মাশরাফির। দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির ভেতর-বাহির তিনি খুব ভালো করেই জানেন। সেই নেতিবাচকতার ছোঁয়া থেকে তিনি দূর রাখতে চান তরুণদের। 

“আমাদের দেশে তরুণ ক্রিকেটারদের ওই সুযোগটাই কম থাকে, সাবলিল যে খেলাটা, সেটার। বাইরে যদি দেখেন, সুযোগ পায়। তারা জানে যে কী করতে চাচ্ছে একটা তরুণ ক্রিকেটারকে নিয়ে। আমার কাছে মনে হয়, আমরা জানি না আমাদের তরুণদের আমরা কীভাবে দেখতে চাই সামনে তাকিয়ে। আমি সবসময় বলে আসছি, ভালো ক্রিকেটার তৈরি করতে গেলে ভালো কোচ প্রয়োজন। একটা ক্রিকেটারকে কীভাবে সেট করবে, তার সামর্থ্য কতটুকু, এটা কোচদেরও বুঝতে হবে।” 

স্বাধীনতা ও পূর্ণ সমর্থন পেলে তরুণটা কতটা নিজেদের মেলে ধরতে পারে, এর উজ্জ্বল উদাহরণ এবার হৃদয়। তাকে সম্ভাবনাময় ব্যাটসম্যান মনে করা হচ্ছে অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায় থেকেই। কিন্তু সম্ভাবনা রূপ পাচ্ছিল না পারফরম্যান্সে। টি-টোয়েন্টির জন্য তাকে খুব উপযুক্তও মনে করা হচ্ছিল না। গত বিপিএলে তিনি স্রেফ ১৩৬ রান করেন ১০ ইনিংস খেলে। গড় ছিল ১৭, স্ট্রাইক রেট ৯৭.৮৪। 

সেই হৃদয় এবার তিন ইনিংসেই করে ফেলেছেন ৬৬ গড়ে ও ১৬৬ স্ট্রাইক রেটে ১৯৫ রান! গত কিছুদিনে নিজের টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের উন্নতির জন্য অনেক কাজ করেছেন তিনি। ঘাম ঝরানোর সঙ্গে যোগ হয়েছে সিলেট দলের সামগ্রিক সমর্থনও। মাশরাফি শোনালেন সেই গল্প। 

“হৃদয়কে আমরা আমরা ওর মতো ছেড়ে দিয়েছি। আগের ম্যাচে দেখুন, উইকেটে গিয়ে প্রথম বলে ছক্কা মেরেছে। আমি ওকে পুরো ব্যাক আপ করেছি। ওই শটে যদি আউট হতো, আমরা ওকে কিছুই বলতাম না। এভাবে পাশে থাকা প্রয়োজন। আমাদের দল থেকে, বিশেষ করে আমি যতক্ষণ আছি, ওই সুযোগটা দিয়েছি যে, ও যেন যেভাবে চায়, সেভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারে। একটা ক্রিকেটার প্রতিদিন ভালো খেলবে না।”

“আমি নিশ্চিত, হৃদয় যেভাবে খেলছে, নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে নিজেও বুঝতে পারছে। অন্যদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওর নিজে বোঝা যে একটা করতে পারে। এই সুযোগগুলো দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।” 

জাকির এখনও পর্যন্ত বড় রানের ইনিংস খেলতে পারেননি। তবে ২১ বলে ২৭, ১০ বলে ২০, ১৮ বলে ৪৩ রানের কার্যকর কয়েকটি টি-টোয়েন্টি ইনিংস খেলে তিনি ভূমিকা রেখেছেন ম্যাচের মোমেন্টাম বদলে দিতে বা ধরে রাখতে। টুর্নামেন্টে তার স্ট্রাইক রেট এখন ১৭৫! 

মাশরাফি বললেন, হৃদয়ের মতো জাকিরকেও সেই স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।  

“জাকিরকে আগের দিন আমরা বলেছি জুটি গড়তে। কিন্তু ও উইকেটে গিয়ে একটি চার মারল, ছয় মারল। ওর কাছে মনে হয়েছে, উইকেট ভালো, চান্স নিতে পারবে, আমরাও ব্যাক আপ করছি। উইকেট খারাপ হলে যদি ১০ বলে ১০ করে, তাহলেও সমস্যা নেই। আমার কথা হচ্ছে, এই জায়গাটা তৈরি করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।” 

বিপিএলের অন্যান্য আসরে বেশির ভাগ সময়ই দেখা যায়, তরুণরা দলে থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পায় না। সিলেট এবার এখানেও ব্যতিক্রম। নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়মিত ওপেন করাচ্ছে তারা। প্রথম ম্যাচে তিনে খেলেছেন জাকির। পরের তিন ম্যাচে তিনে হৃদয়, চারে জাকির। প্রথম ম্যাচের পর থেকে মুশফিকুর রহিমকে তার সহজাত পজিশন চারে না খেলিয়ে নামানো হচ্ছে পাঁচে। 

মুশফিকের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান, বিপিএলে যিনি দারুণ সফল, তার পজিশন নিচে নামিয়ে দেওয়ার কাজটি সহজ নয়। মাশরাফি বললেন, তরুণদের ওপরে জায়গা দিতে মুশফিক নিজেই বড় ভুমিকা পালন করেছেন ব্যাটিং অর্ডারের কম্বিনেশনের কথা ভেবে। 

“এখানে মুশফিক অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। মুশফিক সাধারণত চারে খেলে। কিন্তু সে ফ্লেক্সিবল ছিল। নাহলে আসলে এটা কঠিন হতো। সিদ্ধান্তটি নিতে সে নিজেই সহজ করে দিয়েছিল। ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশন রাখার পরামর্শও মুশফিকই দিয়েছিল।” 

“এবার পাশের উইকেটগুলোই বেশি খেলা হচ্ছে, মাঝের উইকেটে হচ্ছে না। বেশির ভাগ ম্যাচেই এক পাশে সীমানা ছোট থাকছে। ডান-বাঁ কম্বিনেশন উইকেটে থাকলে সুবিধা হয়। এটা মুশফিকের জন্যই সম্ভব হয়েছে এবং সে-ই এখানে নেতৃত্ব দিয়েছে সত্যি কথা বলতে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক