আক্ষেপের জাল ছিঁড়ে আবার জ্বলে উঠলেন তাইজুল

পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি তিনি খুব একটা পান না, দলের প্রয়োজনে তবু নিজেকে আরও একবার মেলে ধরলেন এই বাঁহাতি স্পিনার।

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনিসিলেট থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 Dec 2023, 02:05 PM
Updated : 1 Dec 2023, 02:05 PM

“ভালো লাগে… তবে বুড়া বানিয়ে দিয়েন না আবার…”-তাইজুল ইসলামের কথাটি শুনে হাসির রোল উঠল সংবাদ সম্মেলনে। তার বয়স এখন ৩১। একজন স্পিনারের জন্য এমন কোনো বয়স নয়। এই সংক্রান্ত কিছু তাকে বলাও হয়নি। তার কাছে প্রশ্ন ছিল, সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতিতে টেস্ট বোলিং আক্রমণের নেতা হিসেবে তার কেমন লাগে। তাইজুল হাসির ছলে যে উত্তর দিলেন, সেখানে মিশে থাকল শঙ্কার চোরাস্রোতও। 

এই দলের অভিজ্ঞতম বোলার বা বোলিং আক্রমণের নেতা, এসবের সঙ্গে বয়সও জড়িয়ে থাকে। আর বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতিতে তিরিশের পর বয়স বাড়তে থাকা মানে নানা প্রশ্ন আর সংশয়কেও সঙ্গী করে ফেলা। বুড়ো না বানিয়ে ফেলতে তাইজুলের অনুরোধ সেই ভয়ের জায়গা থেকেই।

এমনিতেই অবশ্য অনেক পারিপার্শ্বিকতা সঙ্গী করেই তাকে খেলতে হয় তাকে। সাকিব দলে থাকলে তাইজুলের চ্যালেঞ্জ একরকম, সাকিব না থাকলে আরেকরকম। সাকিব থাকলে একাদশে জায়গা পেতেই সংশয়ে থাকতে হয় তাইজুলকে। দুই বাঁহাতি স্পিনার শেষ পর্যন্ত একাদশে রাখা হলেও পাদপ্রদীপের আলো সাকিবের ওপরই থাকে বেশির ভাগটুকু। তাইজুলকে তখন সহকারীর ভূমিকায় থেকেই নিজেকে যতটা সম্ভব মেলে ধরতে হয়। দু-একটি ম্যাচ সেটি না পারলে বাদ পড়ার খড়গ অপেক্ষায় থাকে।

সাকিব যখন না থাকেন, তখন আবার তাইজুলই হয়ে ওঠেন মূল অস্ত্র। তখন দলের প্রত্যাশা পূরণের ভার বইতে হয় তাকে। নিউ জিল্যন্ডের বিপক্ষে চলতি টেস্ট সিরিজে যেমন, তার দিকেই তাকিয়ে ছিল দল। আগেও বহুবারের মতো, এবারও তিনি সেখানে সফল দারুণভাবে।

নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে চার উইকেট নিয়ে দলের সফলতম বোলার ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসেও যথারীতি চার উইকেট নিয়ে ফেলেছেন। শেষ দিনে কিউইদের শেষ তিন উইকেট থেকে আরও উইকেট নেওয়ার সুযোগ তার সামনে আছে। 

চতুর্থ দিনের শেষ সেশনে উইকেটের সহায়তা পেয়ে তাইজুল একরকম ভয়ঙ্কর হয়েই উঠেছিলেন নিউ জিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের জন্য। একটা সময় মনে হচ্ছিল, প্রতি বলেই যেন উইকেট পেয়ে যাবেন! ২০ ওভারে ৭ মেডেন নিয়ে ৪০ রানে তার শিকার ৪ উইকেট।

সাকিব না থাকায় তার ওপর যে বাড়তি দায়িত্ব, সেখানে তিনি সফল পুরোপুরি। দিনশেষে সংবাদ সম্মেলনে তার দিকে প্রথম প্রশ্নটিই ছুটে গেল সাকিবকে নিয়েই। তাইজুল বললেন, বরাবরের মতো নিজের কাজটা করেই সফল।

“আরেকজনেরটা তো আমি করতে পারব না। আরেকজন আবার আমারটা করতে পারবে না। আমি আমার পরিকল্পনাতেই থাকি। সাকিব ভাই থাকুক আর না থাকুক, আমার সঙ্গে আরও স্পিনাররা আছে। গেম বাই গেম পরিকল্পনা এরকম হয়- কেউ উইকেট নেবে, কেউ রান আটকে রাখবে। আমি রান আটকালে হয়ত মিরাজ বা নাঈম উইকেট পেত। যে থাকুক আর না থাকুক, আমরা ভালো খেলছি কি না, এটাই জরুরি।”

বাড়তি দায়িত্ব যে তাকে বাড়তি প্রেরণা জোগায়, সেটি ফুটে উঠছে পরিসংখ্যানেও। সাকিবের সঙ্গে ২৪ টেস্ট খেলে তার শিকার ৯৩ উইকেট। ৪ বার নিয়েছেন ইনিংসে ৫ উইকেট। সাকিবকে ছাড়া ১৯ টেস্ট খেলেই নিয়েছেন ৯২ উইকেট। ইনিংসে ৫ উইকেট এক্ষেত্র ৭ বার, ম্যাচে ১০ উইকেটও আছে এক দফায়। সাকিবকে ছাড়া খেলা ম্যাচগুলিতে তার বোলিং গড়ও ভালো।

সাকিব না থাকলে বাড়তি ওভার বোলিং করতে হয়, উইকেট বেশি পাওয়ার সম্ভাবনাও তাতে বাড়ে নিশ্চিতভাবেই। তবে বেশি বোলিং করেছেন বলেই যে বেশি উইকেট পেয়েছেন, তা নয়। স্ট্রাইক রেটও এখানেই তার বেশি ভালো! সাকিবের সঙ্গে খেলে গড়ে প্রতিটি উইকেট নেন তিনি ৬৬.৭ বলে। সাকিবকে ছাড়া তার প্রতিটি উইকেট আসে ৬০.৪ বলে।

সাকিবের পর দেশের সফলতম টেস্ট বোলারও তিনিই। এমনকি তার বোলিং গড় ও স্ট্রাইক রেটও প্রায় সাকিবের সমানই। কিন্তু দেশের ক্রিকেটে ঠিক তারকা খ্যাতি তিনি কখনোই সেভাবে পাননি। টেস্ট বিশেষজ্ঞ করে রাখা হয়েছে তাকে, এটি একটি কারণ। সার্বিকভাবে আরও দায়ী এই দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি। তার পারফরম্যান্স তাই প্রাপ্য স্বীকৃতি পায় না অনেক সময়ই।

দলের ভেতর কতটা মূল্যায়ন তাকে করা হয়, সেই প্রশ্নও উঠল। ৯ বছর ধরে টেস্ট খেলছেন তিনি, এত সাফল্য আর ধারাবাহিকতা, কিন্তু দলের ভেতর গুরুত্ব তিনি কতটা পান? তাইজুলের কথায় ফুটে উঠল অনেক দিকই।

“খুশি-অখুশির কিছু নাই। অবশ্যই একজন খেলোয়াড় যখন ৮-১০-১২ বছর খেলে, অভিজ্ঞতা থাকে… ক্রিকেটে এই অভিজ্ঞতা অনেক কাজে লাগে। অধিনায়ক কোচের উপর নির্ভর করে আমাকে কতটা প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রাধান্য দিলে অবশ্যই চেষ্টা করব সাহায্য করার। সবসময় আমার দরজা খোলা। যে কোনো দরকার হলে আমি করব।”

“গুরুত্ব পাই না, তা নয়। পাই। অনেকে অনেক সময় জানতে চায় কী করা যায়। আমি পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করি।”

চাইলে তার কথা আক্ষেপের সুর থেকে কিছুটা খুঁজে নেওয়া যায়। আরেকটি প্রশ্নের জবাবে অবশ্য আক্ষেপটুকু খুঁজে বা বুঝে নিতে হলো না, তিনি সরাসরিই বললেন।

দীর্ঘদিন তাকে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল।  অভিষেক ওয়ানডেতে হ্যাটট্রিক করার পরও এই সংস্করণে তার ক্যারিয়ার এগোয়নি। গত বছর দলে ফেরানোর পর প্রথম ওয়ানডেতেই ৫ উইকেট নেন তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজে। এরপর কিছুটা নিয়মিত হতে পারেন। তবে তখন তাকে লড়াই করতে হচ্ছিল নাসুম আহমেদের সঙ্গে। এক সিরিজে তাইজুল, আরেক সিরিজে নাসুমকে খেলানো হচ্ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে আবার তাকে বাদ দেওয়া হয়। বিশ্বকাপের পরও সামনের নিউ জিল্যান্ড সফরের ওয়ানডে দলে তাকে রাখা হয়নি।

ওয়ানডেতে সবশেষ ১৩ ম্যাচের কোনোটিতেই তিনি উইকেটশূন্য ছিলেন না। গতবছর দলে ফেরার পর ৯ ওয়ানডেতে তার শিকার ১৮ উইকেট। তার পরও দলে আর জায়গা মিলছে না। এটি নিয়ে খুব গভীরে না গেলেও নিজের খারাপ লাগাটা তিনি লুকালেন না।

“আফসোস তো সবারই থাকে… আমারও আফসোস আছে…। কালকে তো দল দিয়েছে (নিউ জিল্যান্ড সফরের), আপনি দেখেছেন…। এটা নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না।”

এই অভিমানের সুর, এটিই হয়তো তাইজুলের ক্যারিয়ারের প্রতীকি। পারফর্ম করেও তাতে থাকতে হয় আড়ালেই।