রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ব্যাটিং ব্যর্থতায় হেরে বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ

ছোট লক্ষ্য পেয়েও ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় জিততে পারল না বাংলাদেশ, নাসিম শাহর ছোট ভাই উবাইদ শাহর বিধ্বংসী বোলিংয়ের ম্যাচে পাকিস্তান জিতে গেল ৫ রানে।

ক্রীড়া প্রতিবেদক
Published : 3 Feb 2024, 03:39 PM
Updated : 3 Feb 2024, 03:39 PM

লেংথ থেকে অনেকটা লাফিয়ে ওঠা ডেলিভারি সামলানোর চেষ্টা করলেন মারুফ মৃধা। কিন্তু তার ব্যাটে ছোবল দিয়ে বল আঘাত করল স্টাম্পে। বাঁধনহারা উল্লাসে মেতে উঠলেন পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা। তাদের গর্জন আর উদযাপনের পাশেই মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন মারুফ। উইকেটের অন্য প্রান্তে তখন বিষন্ন চেহারায় শূন্যে তাকিয়ে বাংলাদেশের আরেক ক্রিকেটার রোহানাত দৌলাহ বর্ষণ। ধারাভাষ্য কক্ষে ইয়ান বিশপ দারুণ ফুটিয়ে তুললেন মুহূর্তটি, “একদিকে আনন্দের জোয়ার, আরেক দিকে হতাশার স্রোত।” 

শেষ জুটিতে বর্ষণ ও মারুফের দৃঢ়তায় ম্যাচটি পৌঁছে গিয়েছিল রোমাঞ্চকর নাটকীয়তার চূড়ান্ত মোড়ে। সেখানে মোহাম্মদ জিশানের ওই ডেলিভারিতে মারুফের আউটেই ম্যাচের সমাপ্তি। দক্ষিণ আফ্রিকার বেনোনিতে ৫ রানে হেরে যুব বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে খেলার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের। দারুণ জয়ে শেষ চারে পৌঁছে গেল পাকিস্তান। 

মারুফকে অবশ্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে না কোনোভাবেই। বাংলাদেশের মূল ব্যাটসম্যানরাই যে মুখ থুবড়ে পড়েছেন বাজেভাবে! 

সেমি-ফাইনালে যেতে হলে এই ম্যাচে শুধু পাকিস্তানকে হারালেই যথেষ্ট হতো না, রান রেটের চ্যালেঞ্জেও জিততে হতো বাংলাদেশকে। রোহানাত দৌলাহ বর্ষণ ও শেখ পারভেজ জীবনের দুর্দান্ত বোলিংয়ে সমীকরণ সহজ হয়েই গিয়েছিল। পাকিস্তান অলআউট হয়েছিল ১৫৫ রানেই।

রান তাড়ায় ৩৮.১ ওভারের মধ্যে জিতলেই সেমি-ফাইনালে চলে যেত বাংলাদেশ। কিন্তু সেটুকুও করতে পারলেন না ব্যাটসম্যানরা। ৩৫.৫ ওভারে ১৫০ রানেই শেষ ইনিংস। 

শেষ জুটিতে যখন বর্ষণের সঙ্গে জুটি বাঁধেন মারুফ, তখনও জয়ের জন্য ২৯ রান প্রয়োজন বাংলাদেশের। দুজনই মূলত পেসার হলেও চাপের মধ্যে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিংয়ে জাগিয়ে তোলেন জয়ের সম্ভাবনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হলো না অল্পের জন্য।

আগুনে বোলিংয়ে ৪ উইকেট নেওয়ার পর ব্যাটিংয়ে দশে নেমে ২১ রানে অপরাজিত বর্ষণ। কিন্তু তার এমন বীরোচিত পারফরম্যান্স বিফলে গেল। তাকে ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নায়ক উবাইদ শাহ।

পাকিস্তানের জাতীয় দলের পেসার নাসিম শাহর ছোট ভাই উবাইদ গতি ও বাউন্সের ঝড় তুলে ৫ উইকেট নেন ৪৪ রানে। ফিল্ডিংয়ে দুটি ক্যাচ ছাড়লেও পুষিয়ে দেন তিনি বল হাতে। ১৭ বছর বয়সী এই ফাস্ট বোলারই ম্যাচের সেরা।

উবাইদের দুটি ছাড়াও আরও দুটি ক্যাচ হাতছাড়া করে পাকিস্তান, সহজ একটি রান আউটও করতে পারেনি তারা। তবে দুর্দান্ত তিনটি ক্যাচও আবার নেয় তারা।

বেনোনির উইলোমুর পার্কে তাজা ঘাসের ছোঁয়া থাকা উইকেটে টস জিতে আগে বোলিংয়ের সুবিধা পায় বাংলাদেশ। নতুন বলের দুই পেসার মারুফ ও ইকবাল হোসেন ইমন আঁটসাঁট শুরু করলেও উইকেট এনে দিতে পারেননি। তবে নবম ওভারে আক্রমণে এসেই ছাপ রাখেন বর্ষণ। ৩৪ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙেন তিনি নিজের প্রথম ওভারেই।

দুর্দান্ত প্রথম স্পেলে আরও একটি উইকেট শিকার করেন তিনি। এরপর আরিফুল ইসলামের দারুণ সরাসরি থ্রোয়ে রান আউট হয়ে যান পাকিস্তানি অধিনায়ক সাদ বেইগ।

অফ স্পিনার শেখ পারভেজ জীবন আক্রমণে এসে আরও চেপে ধরেন পাকিস্তানকে। উইকেট ধরা দিতে থাকে নিয়মিত। গড়ে ওঠেনি বড় কোনো জুটি। সাতে নামা আরাফাত মিনহাসের ৩৪ রানই দলের সর্বোচ্চ। ৫৬ বল আগেই শেষ হয়ে যায় পাকিস্তানের ইনিংস।

২৪ রানে ৪টি করে উইকেট নেন বর্ষণ ও জীবন দুজনই।

রান তাড়ায় সহজাত আগ্রাসী ব্যাটিংয়েই শুরু করেন জিশান আলম। তবে যথারীতি ইনিংস বড় করতে পারেননি তিনি। চারটি চারে ১২ বলে ১৯ করে বিদায় নেন তিনি তৃতীয় ওভারেই।

আরেক ওপেনার আশিকুর রহমান শিবলি বিদায় নেন ৪ রানেই। গত এশিয়া কাপে অসাধারণ পারফর্ম করা ব্যাটসম্যান বিশ্বকাপে ৫ ম্যাচে ফিফটি করতে পারলেন না একটিও। দুই ওপেনারকেই ফেরান উবাইদ।

তিনে নেমে চৌধুরি মোহাম্মদ রিজওয়ান শুরুটা ভালো করলেও থমকে যান ২০ রানে। আরিফুল ইসলাম ১২ বলে কোনো রান করতে না পারার পর ছক্কা মারেন দারুণ এক পুল শটে। একটু পর দৃষ্টিনন্দন এক ছক্কা মারেন তিনি সোজা ব্যাটে। কিন্তু ১৪ রানেই তার ইনিংস থামে পয়েন্টে দারুণ ক্যাচের শিকার হয়ে।

এরপর দুবার জীবন পেয়েও আহরার আমিন ফেরেন ১১ রানেই। স্লিপে অসাধারণ ক্যাচ নেন শামিল হুসাইন।

৮৩ রানে ৬ উইকেট হারানো দলকে লড়াইয়ে ফেরান শিহাব জেমস ও অধিনায়ক মাহফুজুর রহমান রাব্বি। দুই দফায় জীবন পেয়ে এগিয়ে যান শিহাব। কিন্তু সম্ভাবনাময় জুটি থামে ৪০ রানে।

শিহাবের সহজ ক্যাচ হাতছাড়া করার পরের ওভারেই বল হাতে তাকে ফিরিয়ে ৫ উইকেট পূর্ণ করেন উবাইদ। পরের ওভারে বাংলাদেশ অধিনায়ককে ফিরিয়ে দেন আলি রাজা।

আজান আওয়াইসের সরাসরি থ্রোয়ে রান আউট হন দশম ব্যাটসম্যান ইকবাল। এরপর শেষ জুটির লড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের উৎসব আর বাংলাদেশের বেদনা।

২০২০ সালে যে দেশে বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশের যুবারা, সেই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেই এবার বিদায় সেমি-ফাইনালের আগে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর: 

পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯: ৪০.৪ ওভারে ১৫৫ (শামিল ১৯, শাহজাইব ২৬, আজান ৬, সাদ ৯, আহমাদ ১১, আরশাদ ৭, মিনহাস ৩৪, আশফান্দ ১৯, উবাইদ ১, জিশান ৪, রাজা ০*; ইকবাল ৭-০-৪৫-০, মারুফ ৬-০-২৪-০, রোহানাত ৮-১-২৪-৪, জীবন ১০-৩-২৪-৪, রাব্বি ৭.৪-০-২৭-১, আরিফুল ১-০-৪-০, জিসান ১-০-৬-০)। 

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯: ৩৫.৫ ওভারে ১৫০ (আশিকুর ৪, জিশান ১৯, রিজওয়ান ২০, আরিফুল ১৪, আহরার ১১, শিহাব ২৬, জীবন ২, রাব্বি ১৩, ইকবাল ০, রোহানাত ২১*, মারুফ ৪; উবাইদ ১০-১-৪৪-৫, আহমাদ ৫-১-১৮-০, রাজা ১০-১-৪৪-৩, জিশান ৮.৫-১-২৭-১, আশফান্দ ১-০-৬-০, মিনহাস ১-০-১০-০)। 

ফল: পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দল ৫ রানে জয়ী।

ম্যান অব দা ম্যাচ: উবাইদ শাহ।