দেশের মাঠে বাংলাদেশের সেরা জয়

ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ, তবে নানা পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় এগিয়ে রাখতে হচ্ছে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিলেট টেস্টের জয়কে।

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনিসিলেট থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 Dec 2023, 10:03 AM
Updated : 2 Dec 2023, 10:03 AM

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সেরা জয় কোনটি?

উত্তর খুঁজতে খুব বেশি ভাবতে হবে বলে মনে হয় না। টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশের জয় এমনিতেই ধরা দেয় কালেভদ্রে। ১৩৯ ম্যাচে জয় তো মোটে ১৯টি। এর মধ্যে মনে রাখার মতো জয় আরও কম। একদম এক হাতের আঙুল গুনেই বলে দেওয়া যায়। 

সেখান থেকে সবচেয়ে সেরা জয়টি বেছে নেওয়া খুব কঠিন নয়। গত বছরের জানুয়ারিতে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টের জয় এতটাই অভাবনীয় ছিল যে, চোখ বন্ধ করেই ওই ম্যাচের কথা বলে দেওয়া যায়। বাংলাদেশের সেরা টেস্ট জয় নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। 

দ্বিতীয় সেরা জয় নিয়ে এতটা নিশ্চিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মিরপুরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়কে দ্বিতীয় সেরা বলতে পারেন কেউ, কারও কাছে মনে হতে পারে একই আঙিনায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়টিই এগিয়ে। এরকম অভিজাত ও বনেদি টেস্ট সংস্কৃতির দেশের বিপক্ষে যে কোনো জয়ই আসলে বিশেষ কিছু। স্রেফ অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড বলেই জয়গুলির ওজন বেড়ে যায় অনেকটা। 

এই দুই জয়ের আনন্দময় স্মৃতির সঙ্গে সুখের অনুরণন জোগায় কলম্বো টেস্টের জয়ও। বাংলাদেশের শততম টেস্টে ২০১৭ সালে পি সারা ওভালে শেষ ইনিংসে রান তাড়ায় ওই জয়টিও দারুণ স্মরণীয়। 

দ্বিতীয় সেরা জয় নিয়ে এতদিন মূলত এই তিন জয়েরই ঠোকাঠুকি ছিল। এখন সেখানে ডঙ্কা বাজাচ্ছে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে এই সিলেট টেস্টের জয়। 

এই আওয়াজের একটু ভেতরে গেলে, এই টেস্টের প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে টেস্টের প্রতিটি দিনের শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করলে, এই জয়টিকেই বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সেরা জয় মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। 

মিরপুরের ওই দুটি জয় ও কলম্বোর জয়ের সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটে ছিল সুখের প্রবাহ। ওয়ানডেতে তখন দারুণ খেলছিল দল। টেস্টের সেটির প্রভাব ছিল। দলটা ছিল থিতু। দেশের ক্রিকেটে ছিল না অস্থিরতা। অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা নিজেদের সেরা সময়ে ছিলেন। তাদের ফর্ম ছিল উত্তুঙ্গ। দলীয় আবহে মধুর হয়ে বাজছিল কয়েকজন তরুণের আগমণী সঙ্গীতও। 

এবার চিত্র পুরো উল্টো। ওয়ানডেতেই দলের অবস্থা সঙ্গীন। সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপে স্রেফ ভরাডুবি হয়েছে দলের। সেটির প্রভাবে উত্তাল গোটা দেশের ক্রিকেটই। শুধু দল নয়, ক্রিকেট ব্যবস্থাই মনে হচ্ছিল যেন ছন্নছাড়া। মাঠের বাইরে এত কিছু চলছিল যে মাঠের ক্রিকেটে সেসবের প্রভাব পড়াটাই ছিল স্বাভাবিক। 

দলের শক্তির ঘাটতি তো ছিলই। চোটের কারণে নেই অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। পারিবারিক কারণে নেই সহ-অধিনায়ক লিটন কুমার দাস। তামিম ইকবাল তো অনেক দিন ধরেই অনিয়মিত। পেস আক্রমণের মূল দুই অস্ত্র ইবাদত হোসেন চৌধুরি ও তাসকিন আহমেদও মাঠের বাইরে চোটের কারণে। এই দলটা তাই অনেকটাই খর্বশক্তির। 

নিউ জিল্যান্ড সেখানে এক গাদা অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ও বিশ্বের সেরা কয়েকজনকে নিয়ে গড়া পূর্ণশক্তির দল। লম্বা বিশ্বকাপে সেমি-ফাইনালে খেলার পরও মূল ক্রিকেটারদের কাউকে তারা বিশ্রাম দেয়নি। সবটুকু মনোযোগ এই সিরিজে দিয়েছে। কারণটাও বোধগম্য। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন তারা। এবারও টেস্টের বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু করতে চেয়েছে বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ থেকে পূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে। 

দুই দলের শক্তির তারতম্য এবং দুই দেশের ক্রিকেটের সাম্প্রতিক অবস্থার বিবেচনায় বাংলাদেশের এই জয় বিশেষ কিছু। 

এরপর তো উইকেট-কন্ডিশনের প্রসঙ্গ আসেই। সিলেটে আবহাওয়া এখন খুবই আরামদায়ক। দিনে রোদের তেজ নেই তেমন। বিকেল-সন্ধ্যায় তো শীত অনুভূত হয় বেশ। প্রচণ্ড গরমে কাবু হওয়া বা কন্ডিশনের চ্যালেঞ্জ নেই নিউ জিল্যান্ডের জন্য। 

উইকেট থেকেও বাংলাদেশ নেয়নি খুব বেশি ফায়দা। এখানেই মূলত আরও বেশি করে পেছনে পড়ে যাচ্ছে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয়। ওই দুই ম্যাচে মিরপুরের ২২ গজে বল ঘুরেছে লাটিমের মতোই। শুধু ভয়ঙ্কর টার্নিং উইকেটই নয়, বাউন্সও ছিল অসমান। ব্যাটসম্যানদের জন্য ওসব উইকেটে খেলাটা অনেকটা জুয়ার মতো। 

এমনিতে দেশের মাঠে কখনও কখনও কোনো দলের বিপক্ষে ওরকম উইকেটের কৌশল বেছে নেওয়ায় খুব অন্যায্য কিছু নেই। বাংলাদেশকেও তো ইংল্যান্ড-নিউ জিল্যান্ডে গেলে সবুজ ঘাসের পিচে খেলতে হয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় বাউন্সি উইকেটের চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়। বাংলাদেশও নিজেদের শক্তি আর প্রতিপক্ষের দুর্বলতা ভেবে উইকেট বেছে নিতেই পারে। 

কিন্তু এবার সিলেটের উইকেট মোটেও মিরপুরের প্রতিচ্ছবি ছিল না। এখানে প্রথম দিন থেকে টার্ন করেছে বটে। তবে তা ভয়ঙ্কর কিছু নয়। উইকেট মন্থরও ছিল, তবে এমন নয় যে শট খেলা যায় না। ম্যাচের তিন পেসার টিম সাউদি, কাইল জেমিসন ও শরিফুল ইসলাম তো নতুন বলে সিম মুভমেন্ট ও সুইং আদায় করে নিতে পেরেছেন দুই ইনিংসেই। 

প্রথম দিন থেকেই উইকেটে চিড় কিছুটা দেখা গেছে। ধারণা করা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে এসব ফাটলের পরিধি বাড়তে পারে আরও। কিন্তু আদতে তা ততটা বাড়েনি। 

সবচেয়ে বড় কথা, অসমান বাউন্স তেমন ছিল না। মাঝেমধ্যে দু-একটি বল বাড়তি লাফানো ও বেশি নিচু হয়েছে বটে, তবে টেস্টজুড়ে বেশির ভাগ সময়ই বাউন্স ছিল ধারাবাহিক। 

স্কিল থাকলে, নিবেদন দেখাতে পারলে যে এখানে রান করা যায়, তা তো কেন উইলিয়ামসন, নাজমুল হোসেন শান্তরা দেখিয়েছেন। এমনকি চতুর্থ দিন বিকেলে বা শেষ দিন সকালে ড্যারিল মিচেল যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন, খুব একটা অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায়নি তাকে। 

নিউ জিল্যান্ড দল থেকেও উপযুক্ত সার্টিফিকেটই পেয়েছে এই উইকেট। তৃতীয় দিনের খেলা শেষে কাইল জেমিসন, চতুর্থ দিন শেষে এজাজ প্যাটেল এবং ম্যাচে শেষে কিউই অধিনায়ক টিম সাউদি স্পষ্টই বলেছেন, উইকেট ভালো ছিল। 

এই উইকেটে মূল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে ম্যাচ জুড়ে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সই। ব্যাটে-বলে শ্রেয়তর পারফরম্যান্সেই এসেছে এই জয়। মিরপুরের স্পিন স্বর্গে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের চেয়ে সিলেটের জয় এখানেই এগিয়ে থাকবে। 

২০১৭ সালে পি সারা ওভালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের ম্যাচটিতেও অবশ্য ব্যাটে-বলে পারফরম্যান্স দারুণ ছিল। ৫ দিন জুড়ে অনেক পরীক্ষায় উতরে তবেই জয় এসেছিল। সেবার টস হেরেছিল বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কা আগে ব্যাট করে ৩৩৮ রান করেছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ১২৯ রানের লিড নিয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে দিমুথ কারুনারাত্নের সেঞ্চুরিতে ভালো শুরু করেছিল লঙ্কানরা। এক পর্যায়ে তাদের রান ছিল ১ উইকেটে ১৪৩। সেখান থেকে বোলাররা ঘুরে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত শেষ দিনে প্রবল চাপের মধ্যে রান তাড়ায় ধরা দেয় ৪ উইকেটের জয়। 

ওই সিরিজে প্রথম ম্যাচে বাজেভাবে হেরে পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সিরিজ ড্র করা জয়টি এসেছিল। নানাভাবেই তাই দ্বিতীয় সেরা জয়ের দাবি করতে পারে ওই ম্যাচ। 

তবে ওই শ্রীলঙ্কা দলের যে শক্তি ও মান ছিল, সেই তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে এবার নিউ জিল্যান্ডের এই দল। বিশেষ করে ব্যাটিং সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতায়। তাছাড়া প্রস্তুতি, পরিকল্পনা, ভাবনা, সব দিক থেকেই দারুণ পেশাদার এক দল এই নিউ জিল্যান্ড।

 এবারের এই জয় তাই এগিয়ে থাকছেই।

এখানে যদিও টস ভাগ্যকে পাশে পেয়েছিল বাংলাদেশ। তবে আগে ব্যাট করেও প্রথম ইনিংসে বড় ব্যবধান তারা গড়তে পারেনি। বরং ছোট্ট হলেও লিড পেয়েছিল নিউ জিল্যান্ডই। সেখান থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো ব্যাট করে ও পরে বোলারদের দারুণ পারফরম্যান্সে নিশ্চিত হয়েছে বড় জয়। 

এছাড়াও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৮টি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪টি জয় এসেছে। আফগানিস্তান, আয়ার‌ল্যান্ডের বিপক্ষে প্রত্যাশিত জয়ই ধরা দিয়েছে। এসবের কোনোটিই আসলে সেরার লড়াইয়ে আসার মতো নয়। 

নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয়কে তাই দ্বিতীয় সেরা জয় বলাই যায়। সেরা জয়টি তো মাউন্ট মঙ্গানুইতে। দেশের মাঠে সেরা সিলেটের জয়। 

হাতছানি আছে এখন আরও বড় কিছুর। মাউন্ট মঙ্গানুইতে জয়ের পর ক্রাইস্টচার্চে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি করে টেস্ট জিতলেও আরেকটিতে হারায় সিরিজ হয়েছিল ড্র। এবার মিরপুরে জিতে বা ড্র করে যদি সিরিজ জেতা যায়, নিঃসন্দেহে সেরা সিরিজ জয়ও হবে। শান্ত-তাইজুলদের তাই ডাকছে ইতিহাস।