Published : 15 Sep 2025, 10:13 AM
টসের সময় হাত মেলালেন না দুই অধিনায়ক। এই নিয়ে ঢাক গুড়গুড় চলল ম্যাচজুড়ে। ম্যাচের পরেও সেটির পুনরাবৃত্তি। দুই দলের ক্রিকেটারদের সৌজন্যমূলক করমর্দন দেখা গেল না। সেটির প্রতিবাদে পুরস্কার বিতরণী আয়োজন বয়কট করলেন পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলি আগা। সেই মঞ্চেই ভারতীয় অধিনায়ক তুলে আনলেন পেহেলগাম হামলার প্রসঙ্গ। জয় উৎসর্গ করলেন ভারতের সশস্ত্র বাহিনীকে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানো হলো ম্যাচ রেফারিকে নিয়েও।
সব মিলিয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের ক্রিকেটীয় লড়াইয়ে দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম হয়ে উঠল যেন যুদ্ধের ময়দান!
গত এপ্রিলে কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর নানা ঘটনাপ্রবাহে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল দুই দেশের। সেই যুদ্ধ পরে থেমে গেলেও উত্তেজনার রেশ রয়েই যায়। সেটির জের ধরেই এবার এশিয়া কাপ নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। ভারতের রাজনীতিবিদদের অনেকে ও বেশ কজন সাবেক ক্রিকেটার ভারতীয় বোর্ডের প্রতি আহবান জানান এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলতে।
কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডে সাবেকদের টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রাথমিক পর্বের ম্যাচ বর্জন করার পর সেমি-ফাইনালও বয়কট করে ভারত। এশিয়া কাপে শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি। মাঠের ক্রিকেট এবার হলো বটে। পেহেলগাম হামলার পর দুই দল মুখোমুখি হলো প্রথমবার। তবে সেখানে লাগল যুদ্ধের আঁচ।
ম্যাচে পাকিস্তানকে ৭ উইকেটে উড়িয়ে দেয় ভারত। কিন্তু ম্যাচের পর ক্রিকেটীয় আলোচনা গৌণ হয়ে পড়ে।
টসের সময় দুই অধিনায়কের হাত না মেলানোর ব্যাপারটি তো নজর কাড়েই। তবে বিতর্কের বিস্ফোরণ শুরু হয় মূলত ম্যাচের পর ক্রিকেটাররা হাত না মেলানোয়। ছক্কায় ম্যাচ শেষ করে সুরিয়াকুমার সোজা হাঁটা দেন ড্রেসিং রুমের পথে। পাকিস্তানের কোচ মাইক হেসন পরে সংবাদ সম্মেলনে জানান, তার দল হাত মেলানোর জন্য অপেক্ষা করছিল, কিন্তু ভারতের কাছ থেকেই মেলেনি সাড়া।
হাত না মেলানো নিয়ে নানা প্রশ্ন-কৌতূহলের মাঝেই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নিজেদের মনোভাবের একটি বার্তা জানিয়ে দেন সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ। সঞ্চালক সাঞ্জায় মাঞ্জরেকারের প্রশ্নোত্তর পর্ব যখন শেষ, তখন ভারতীয় অধিনায়ক নিজেই মাইক্রোফোন চেয়ে নিয়ে তুলে আনেন পেহেলগাম হামলার প্রসঙ্গ।

“একটু সময় চেয়ে নেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত উপলক্ষ এটিই। পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হওয়া মানুষগুলোর পরিবারের পাশে আছি আমরা। তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি আমরা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, জয় উৎসর্গ করতে চাই সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি, যারা অনেক সাহসিকতার ছাপ রেখেছেন। আশা করি, তারা আমাদের সবাইকে প্রেরণা জুগিয়ে যাবেন এবং আমরা যখনই মাঠে নেমে সুযোগ পাব, তাদের মুখে হাসি ফোটানোর আরও বেশি উপলক্ষ বয়ে আনব।”
পরে সংবাদ সম্মেলনে সুরিয়াকুমার স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেন, হাত না মেলানোর ব্যাপারটি তাদের পরিকল্পনারই অংশ।
“আমাদের সরকার ও বিসিসিআই (বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া)- আমরা আজকে একাত্ম ছিলাম। আমরা এখানে এসেছি এবং একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি (হাত না মেলানোর)। আমরা এখানে এসেছি স্রেফ খেলতে। আমার মনে হয়, উপযুক্ত জবাব আমরা দিয়েছি।”
সৌজন্যমূলক করমর্দন প্রত্যাখ্যান করা খেলাটির চেতনার পরিপন্থী কি না, এমন প্রশ্নে ভারতীয় অধিনায়কের সোজাসুজি জবাব, “জীবনে কিছু কিছু ব্যাপার খেলার চেতনাকেও ছাপিয়ে যায়। পুরস্কার বিতরণীতেও এটা বলেছি, পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার শিকার সবাই ও তাদের পরিবারের পাশে আছি আমরা এবং আমাদের সংহতি প্রকাশ করছি।”
ভারতের হাত না মেলানোর প্রতিবাদে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে যাননি পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান। পরে সংবাদ সম্মেলনে কোচ
“খেলা শেষে আমরা হাত মেলাতে তৈরি ছিলাম। অবশ্যই আমরা হতাশ যে আমাদের প্রতিপক্ষ দল সেটা করেনি। আমরা একরকম এগিয়েই গিয়েছিলাম হাত মেলাতে, কিন্তু তারা ততক্ষণে ড্রেসিং রুমে ঢুকে গেছে।”
“ম্যাচের সেটি দুঃখজনক এক সমাপ্তি। আমরা যেভাবে খেলেছি, তাতে তো হতাশ ছিলামই, তবে অবশ্যই হাত মেলাতে চেয়েছিলাম।”
পাকিস্তানের কোচ নিশ্চিত করেন, ভারতীয় অধিনায়ক হাত না মেলানোর কারণেই পুরস্কার বিতরণীতে যাননি পাকিস্তান অধিনায়ক।
ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বিবৃতি দিয়ে ভারতের পদক্ষেপকে খেলার চেতনার বিরোধী হিসেবে উল্লেখ করে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। সেখানেই জানানো হয়, ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফটের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর কথা।
“ম্যাচ রেফারির আচরণের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ম্যানেজার নাভিদ আকরাম চিমা। টসের সময় ম্যাচ রেফারিই দুই অধিনায়ককে অনুরোধ করেছিলেন হাত না মেলাতে।”
এসব ঘটনার রেশ যে আরও কিছুদিন চলবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সব ঠিক থাকলে, সুপার ফোর পর্বে আবার মুখোমুখি হবে এই দুই দল। এছাড়াও ফাইনালে দেখা হওয়ার পথ তো খোলা আছেই। খেলার বাইরের খেলাও তাই এখনও বাকি।
ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক উত্তেজনার ছাপ বরাবরই ক্রিকেটে পড়েছে। রাজনৈতিক কারণেই প্রতিবেশি দুই দেশ ক্রিকেটের আঙিনাতেও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে হাত না মেলানোর ঘটনা ইতিহাসে নজিরবিহীন। দুই দেশের সম্পর্ক যেমনই থাকুক, মাঠের বাইরে দুই দলের ক্রিকেটারদের সম্পর্ক সবসময়ই উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। দুই দেশের ক্রিকেটারদের বন্ধুত্বের অনেক গল্প ক্রিকেটবিশ্বে প্রচলিত আছে। এবারের মতো চিত্র আগে দেখা যায়নি কখনও।