Published : 21 Dec 2025, 04:41 PM
প্রথম ইনিংসেও জুটির রেকর্ড গড়েছেন ডেভন কনওয়ে ও টম ল্যাথাম। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে দুজন মিলে যা করলেন, সেটিকে বলা যায় রেকর্ডের মহোৎসব। প্রথম ইনিংসের ২২৭ রানের ইনিংসের সঙ্গে কনওয়ে যোগ করলে সেঞ্চুরি। প্রথম ইনিংসের ১৩৭ রানের পাশে ল্যাথামও উপহার দিলেন আরেকটি শতরান। নিউ জিল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে দুজনের ব্যাটের দাপটে রেকর্ড বইয়ে বয়ে গেল সুনামি।
২৫৩ বছরের ইতিহাসে প্রথম
দুই ইনিংসেই দুই ওপেনারের ব্যাটে সেঞ্চুরি- স্বীকৃত ক্রিকেটে এমন কিছু হলো এই প্রথম। টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শ বছরে তো বটেই, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২৫৩ বছরের ইতিহাসেও এমন কীর্তি আগে দেখা যায়নি কোনো দুই ওপেনারের।
জোড়া শতরানে চতুর্থ
সব পজিশন মিলিয়ে কোনো দুই ব্যাটসম্যানের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করার চতুর্থ নজির এটি। সবার আগে এটি করেছিলেন ইয়ান চ্যাপেল ও গ্রেগ চ্যাপেল। ১৯৭৪ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েলিংটনে এই ইতিহাস গড়েছিলেন চ্যাপেল ভাইরা।
২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আবু ধাবিতে আজহার আলি ও মিসবাহ-উল-হাক সেটির পুনরাবৃত্তি করেন। ২০২৪ সালে সিলেটে বাংলাদেশের বিপক্ষে করেন ধানাঞ্জায়া ডি সিলভা ও কুসাল মেন্ডিস।
পাঁচশতে প্রথম
প্রথম ইনিংসে কনওয়ে ও ল্যাথামের জুটি ছিল ৩২৩ রানের, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৯২। দুই ইনিংস মিলিয়ে রান উঠেছে ৫১৫। টেস্ট ইতিহাসে এই প্রথম এক টেস্টে উদ্বোধনী জুটিতে স্পর্শ করল ৫০০।
আগের সর্বোচ্চ ৪১৫ ছিল নিল ম্যাকেঞ্জি ও গ্রায়েম স্মিথ জুটির। দক্ষিণ আফ্রিকান জুটি সেটি করেছিলেন এক ইনিংসেই, ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিপক্ষে। টেস্টে সেরা উদ্বোধনী জুটির রেকর্ড সেটি।
দুই প্রোটিয়া ব্যাটার ভেঙেছিলেন ৫২ বছর পুরোনো রেকর্ড। ১৯৫৬ সালে চেন্নাইয়ে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪১৩ রানের জুটি গড়েছিলেন ভারতের পঙ্কজ রায় ও ভিনু মানকাড়।
অনন্য যুগলবন্দি
একই টেস্টে এক ইনিংসে ট্রিপল সেঞ্চুরি ও আরেক ইনিংসে সেঞ্চুরি জুটি নেই টেস্ট ইতিহাসে আর কোনো জুটির।
এক ইনিংসে আড়াইশ ও আরেক ইনিংসে শতরানের জুটি আগে ছিল তিনটি। ১৯৭৬ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে করেছিলেন পাকিস্তানের মুশতাক মোহাম্মদ ও জাভেদ মিয়াঁদাদ, ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাকিস্তানেরই আব্দুল্লাহ শাফিক ও ইমাম-উল-হাক এবং এই বছরই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিম।
রানের প্লাবন
কনওয়ে এই টেস্টে করেছেন ৩২৭ রান, ল্যাথাম ২৩৮। দুজন মিলে করেছেন ৫৬৫ রান। এক টেস্টে দুই ওপেনারের রান মিলিয়ে যা রেকর্ড।
আগের সর্বোচ্চ ৫৫০ ছিল এজবাস্টনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রায়েম স্মিথ ও হার্শেল গিবসের।
কনওয়ের কীর্তি
একই টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি ও সেঞ্চুরি করা দশম ব্যাটসম্যান ডেভন কনওয়ে। তবে নিউ জিল্যান্ডের হয়ে তিনিই প্রথম।
১৯৬৯ সালে প্রথম এটি করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ডগ ওয়াল্টার্স। পরে করেছেন সুনিল গাভাস্কার, লরেন্স রো, গ্রেগ চ্যাপেল, গ্রাহাম গুচ, ব্রায়ান লারা, কুমার সাঙ্গাকারা, মার্নাস লাবুশেন এবং গত জুলাইয়ে শুবমান গিল।
তাদের মধ্যে ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যান লরেন্স রো করেছিলেন অভিষেকেই। গুচ ও সাঙ্গাকারা ডাবল ছাড়িয়ে করেন ট্রিপল সেঞ্চুরিও।
বাবার পর ছেলে
১৯৯২ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বুলাওয়ায়ো টেস্টে দুই ইনিংসেই শতরানের উদ্বোধনী জুটি গড়েছিলেন মার্ক গ্রেটব্যাচ ও রড ল্যাথাম। নিউ জিল্যান্ডের হয়ে এত দিন শুরু জুটিতে দুই ইনিংসেই শতরানের একমাত্র নজির ছিল সেটি।
এবার সেখানে নাম উঠে গেল ডেভন কনওয়ে ও টম ল্যাথাম জুটির। নাম শুনেই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, সেই রড ল্যাথামের ছেলে এই টম ল্যাথাম।
অলরাউন্ডার রড ল্যাথামের ক্যারিয়ার থমকে গিয়েছিল ৪ টেস্ট ও ৩৩ ওয়ানডেতেই। ছেলে ল্যাথামের এটি ৯১তম টেস্ট। পাশাপাশি খেলেছেন তিনি ১৬৩ ওয়ানডে ও ২৬ টি-টোয়েন্টি।
আগের দুজন, এবার দুজন
নিউ জিল্যান্ডের হয়ে ওপেন করতে নেমে এক টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি ছিল এবারের আগে স্রেফ দুজনের। ১৯৭৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গ্লেন টার্নার, ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিটার ফুলটন। এবার এক টেস্টেই করে ফেললেন দুজন।
ওপেনারদের বাইরে এক টেস্টে জোড়া সেঞ্চুরি করা কিউই ব্যাটসম্যান জেফ হাওয়ার্থ, অ্যান্ড্রু জোন্স ও কেন উইলিয়ামসন।
তিনে কনওয়ে
দুই ইনিংস মিলিয়ে ডেভন কনওয়ে করেছেন ৩২৭ রান, নিউ জিল্যান্ডের হয়ে এক টেস্টে যা তৃতীয় সর্বোচ্চ।
কিউইদের হয়ে এক টেস্টে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড স্টিভেন ফ্লেমিংয়ের। ২০০৩ সালে কলম্বো শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে তিনি করেছিলেন অপরাজিত ২৭৪, দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ৬৯। এক টেস্টে করেছিলেন ৩৪৩ রান।
১৯৯১ সালে ওয়েলিংটনে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই মার্টিন ক্রো করেছিলেন ৩০ ও ২৯৯। ম্যাচে মোট রান ছিল ৩২৯।
নতুন চূড়ায় নিউ জিল্যান্ড
এই টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৫৭৫ রানে ইনিংস ঘোষণা করা নিউ জিল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংস ছেড়েছে ২ উইকেটে ৩০৬ রানে। ম্যাচে মোট রান তুলেছে তারা ৮৮১। নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে যা তাদের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ।
১৯৩০ সাল থেকে টেস্ট খেলছে তারা, এটি তাদের ৪৮৩তম টেস্ট। আগের সর্বোচ্চ ছিল ১৯৯০ সালে ভারতের বিপক্ষে অকল্যান্ড টেস্টে ৮৭৪ রান।
রেকর্ডের চাকা চলমান
নিউ জিল্যান্ডের উদ্বোধনী জুটি দুই ইনিংসে তুলেছে ৩২৩ ও ১৯২। ওয়েস্ট ইন্ডিজের উদ্বোধনী জুটি প্রথম ইনিংসে তুলেছে ১১১ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে চতুর্থ দিন শেষে অপরাজেয় আছে ৪৩ রানে। দুই দল মিলিয়ে শুরুর জুটিতে রান উঠেছে এখনও পর্যন্ত ৬৬৯। অনায়াসেই যা বিশ্বরেকর্ড।
এক টেস্টে শুরুর জুটিতে আগের সবচেয়ে বেশি রান ছিল ১৯৫৬ সালে চেন্নাইয়ে। ভারতের একমাত্র ইনিংসে ৪১৩ রানের জুটি গড়েছিলেন পঙ্কজ রায় ও ভিনু মানকাড়। নিউ জিল্যান্ডের দুই ইনিংসে ৭৫ ও ৮৯ রানের জুটি গড়েছিলেন বার্ট সাটক্লিফ ও গর্ডন লেগাট। ম্যাচে শুরুর জুটিতে মোট রান এসেছিল ৫৭৭।
এবারের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ আছে পঞ্চম দিনে। ব্র্যান্ডন কিং ও জন ক্যাম্পবেল যদি সোমবার এই জুটিকে নিতে পারেন শতরানে, টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবার এক ম্যাচে শতরানের উদ্বোধনী জুটি দেখা যাবে চারটি।