Published : 19 Aug 2026, 05:32 PM
বাংলাদেশের জয় শুধু বাংলাদেশেরই নয়, নর্দান টেরিটরি (এনটি) ক্রিকেটেরও জয়! গত কয়েক দিনে ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে যে তোলপাড়, তাতে ঘুরেফিরেই এসেছে এনটি ক্রিকেট এবং ডারউইনের নাম। এই ভেন্যু, উইকেট, এখানকার আয়োজন, সবকিছুই তুমুল প্রশংসিত হয়েছে। তাতে দারুণ রোমাঞ্চিত এনটি ক্রিকেটে প্রধান নির্বাহী গ্যাভিন ডোভি। তবে তার খারাপ লাগছে ম্যাচ হেরে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা তোপের মুখে থাকায়।
বিশ্ব ক্রিকেটে ডারউইন প্রায় অচেনা হলেও বাংলাদেশে এটি খুব পরিচিত নাম। এই মাঠ টেস্ট ভেন্যু হয়ে ওঠার জন্মপ্রক্রিয়াতেও মিশে আছে বাংলাদেশের নাম। ২০০৩ সালে এখানে প্রথম টেস্টে স্টিভ ওয়াহর অস্ট্রেলিয়ার প্রতিপক্ষ ছিল খালেদ মাহমুদের দল।
গত দুই বছরে ডারউইনে টপএন্ড টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের হাই পারফরম্যান্স বা ইমার্জিং দল খেলেছে নিয়মিত। ডারউইন টেস্টে ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হওয়া হাসান মাহমুদ ও সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান ওই টপএন্ড টি-টোয়েন্টিতে খেলেছেন। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ২০১৭ সালে এখানে এসেছিলেন ডেভেলপমেন্ট সফরে। সেসব অভিজ্ঞতা এবারের সফরে তাদেরকে সহায়তা করে থাকতে পারে।
তবে ডারউইনকে বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে ফিরিয়েছে এবার বাংলাদেশের এই জয়। ২২ বছর পর এখানে টেস্ট ম্যাচ হয়েছে এবং শান্তদের ঐতিহাসিক জয়ের পর গত কয়েক দিনে বিশ্ব ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি নিশ্চিতভাবেই ‘ডারউইন।’
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ছোট রাজ্য ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন এনটি ক্রিকেটের জন্য এটি অভাবনায় প্রাপ্তি। এখন তাই উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভাসছে তারা। তবে ১১ বছর জাতীয় দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে এখন এনটি ক্রিকেটে কাজ করা ডোভির মনে বিষাদের কিছুটা স্রোত বইছে প্যাট কামিন্সের দলের কথা ভেবে।
“এটা কঠিন… ভালো লাগার ব্যাপার যে, ম্যাচটি খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সবাই ডারউইনকে নিয়ে কথা বলছে, এবং টেস্ট ক্রিকেট নিয়েও কথা বলছে; ‘ওল্ড স্কুল’ ধাঁচের টেস্ট ক্রিকেটের উইকেট ও খেলা এবং বলা যায়, একটি ছোট দলের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক জয়, যারা আমাদের দেখা সেরা অস্ট্রেলিয়ান দলগুলির একটিকে হারিয়ে দিয়েছে। এই সবকিছুই এই অঞ্চলের ক্রিকেটের জন্য দারুণ ব্যাপার।
কিন্তু ক্রিকেটারদের জন্য খুব খারাপ লাগছে আমার, যারা স্পষ্টতই অনেক সমালোচনার শিকার হচ্ছে। তারা খুবই ভালো, দলকে হৃদয়ে ধারণ করে, স্রেফ এই ম্যাচে তারা পুরোপুরি পর্যদুস্ত হয়েছে।”
এই ম্যাচের সাফল্য এনটি ক্রিকেটে নতুন আশার আলোও নিয়ে এসেছে। তারা এখন নিয়মিত টেস্ট আয়োজনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
এমনিতে অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে এই অঞ্চলকে যেমন অনেকটা আলাদা ধরা হয়, অনেক অস্ট্রেলিয়ানের কাছেও এটি একরকম ‘বিদেশ’, তেমনি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়তে হয় এই অঞ্চলকে। ২০০৩ ও ২০০৪ সালে এখানে দুটি টেস্ট হয়েছিল মূলত অস্ট্রেলিয়ায় তখন শীতকাল হওয়ায়। অস্ট্রেলিয়ার মূল ভেন্যুগুলি তখন ব্যস্ত থাকে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ‘ফুটি’ বা অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবল (এক ধরনের রাগবি) নিয়ে, ওই সময়ে আবহাওয়াও ক্রিকেট উপযোগী থাকে না। কিন্তু শীতকালেও নর্দান টেরিটরি বেশ উষ্ণ থাকে এবং ফুটির ব্যস্ততা সেখানে নেই। এই কারণেই বাংলাদেশের এবারের টেস্টও সেখানেই আয়োজিত হয়েছে।
তবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া এখন নিয়মিত চেষ্টা করছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মৌসুম একটু লম্বা করার। সেটির অংশ হিসেবে গত বছর ডারউইন ও ম্যাকাইতে সাদা বলের সিরিজ হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। আগামী বছর নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষেও সাদা বলের সিরিজ হতে পারে এখানে। সেটি ডারউইনেই হবে, তা নিশ্চিত নয়। এই অঞ্চলের অন্য তিন ভেন্যু ম্যাকাই, টাউন্সভিল ও কেয়ার্নসও আছে লড়াইয়ে তবে নর্দান টেরিটরিতেই হবেই, তা নিশ্চিত।
সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের ক্রিকেটের জন্য ইতিবাচক অনেক কিছু্ আছে। তবে এনটি ক্রিকেটের প্রধান নির্বাহী স্বপ্ন দেখছেন মূলত নিয়মিত টেস্ট ভেন্যু হয়ে ওঠার। কয়েক মাস পরই শেষ হবে আইসিসির বর্তমান ভবিষ্যৎ সফর সূচি (এফটিপি)। আগামী সূচির পরিকল্পনায় নিজেদের জোরালাভাবে বিবেচনায় দেখতে চান ডোভি।
“আমার ভাবতে ভালো লাগবে, আয়োজনটি এতটাই ভালো ছিল যে কিছু সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
ওয়ানডে সিরিজটি (২০২৭ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে) আমরা শেষ করতে পারলে, আমি আশা করছি যে আমরা তখন এনটি সরকার এবং সিএ-এর সঙ্গে বসে বলতে পারব, ‘আচ্ছা, এফটিপি কেমন হবে, এবং আগামী তিন বছর কেমন হতে পারে।
অতীতের চেয়ে সামনের সময়টায় এখানে সাদা বলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়মিতই হবে। তবে ডোভি স্পষ্ট করেই বলছেন, আরও বেশি টেস্ট ক্রিকেট আয়োজন করতে মুখিয়ে তারা।
“আদর্শ পরিস্থিতি হবে যদি আমরা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছাই, যেখানে টানা ছয় বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হবে, যা অতীতের পরিস্থিতি থেকে হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমার মনে হয় আমরা দারুণ একটা অবস্থানে আছি। গত বছর আমাদের টি-টোয়েন্টি ছিল, এই বছর একটি টেস্ট, আগামী বছর ওয়ানডে আছে, তাই আমরা তিনটি সংস্করণই পরখ করে দেখার, পরীক্ষা করার এবং নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাচ্ছি।
কিন্তু আমার মনে হয় এই সপ্তাহটা এতটাই ভালো কেটেছে – এটা ছিল অন্য এক পর্যায়ের – এরপর আমি এখানে আরও টেস্ট ক্রিকেট দেখতে চাই।”
তবে এই অঞ্চলে ক্রিকেট আয়োজনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ অতিরিক্ত ব্যয়। সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সবকিছুর খরচ এখানে বেশি। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী সম্প্রতি বলেছেন, এই অঞ্চলে গ্রিনবার্গ উল্লেখ করেছেন যে অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত উত্তরে টেস্ট আয়োজন করা খুবই ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া।
গ্রিনবার্গের মতে, আগের চেয়ে আরও বেশি সীমিত ওভারের ম্যাচ দিয়ে প্রক্রিয়া শুরু করাটা বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
“টেস্ট ক্রিকেট (আয়োজন করা) হয়তো আরও কঠিন হবে, কিন্তু এখানে সাদা বলের ক্রিকেট খেলার পরিকল্পনা আমাদের অবশ্যই আছে। বছরের এই সময়ে এই তাপমাত্রায়, এই কন্ডিশনে খেলাটা সম্ভবত এটাই প্রমাণ করে যে, ক্রিকেট খুব কম সময় থমকে থাকে... বছরের এই সময়ে ক্রিকেট আয়োজনের জন্য এটা একটা দারুণ সুযোগ বলে মনে হচ্ছে, তাই চলুন এটা চালিয়ে যাই।
এই ধরনের অঞ্চলের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এটা খুব ব্যয়বহুল। এখানে ক্রিকেট নিয়ে আসাটা খুব ব্যয়বহুল। আমাদের সম্প্রচার অংশীদাররা... ডারউইনের মতো জায়গায় আসার খরচ সম্পর্কে জানেন।”
এনটি ক্রিকেটের প্রধান নির্বাহী ডোভি অবশ্য এবারের টেস্টের সাফল্য দিয়েই উদাহরণ তুলে ধরেছেন। এই টেস্টে আনুষ্ঠানিক হিসেবে ১৮ হাজার ৩৫২ দর্শক ছিলেন গ্যালারিতে, যাদের অর্ধেকই এসেছেন অন্যান্য রাজ্য থেকে। সামগ্রিকভাবেই এই অঞ্চলের পর্যটন ও অন্যান্য খাতের জন্য যা উৎসাহব্যঞ্জক ব্যাপার।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী বললেন, রাজ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো একসঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে খরচের ব্যাপারটির একটি সুরাহা সম্ভব।
“এই খরচগুলোর কিছুটা পুষিয়ে নিতে আমাদের সাহায্য করার জন্য সরকার এবং পর্যটন সংস্থাগুলোর সমর্থন সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমি সত্যিই আনন্দিত যে, আমরা এখানে আসতে পেরেছি এবং এখানে এমন উঠতি ছেলেমেয়েরা আছে, যারা আশা করি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দলে তাদের নায়কদের দেখতে পাবে, যারা পরবর্তীতে ক্রিকেট খেলবে এবং আজীবন ভক্ত হয়ে থাকবে।”
বিশ্ব ক্রিকেটে এই অঞ্চলের পরিচিতি ক্রমে ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করছে টপএন্ড টি-টোয়েন্টিও। প্রতিবছরই এই টুর্নামেন্টের পরিসর বাড়ছে। বিদেশের দল বাড়ছে। এবারের আসর শুরু হবে শুক্রবার থেকে এবং বাংলাদেশের দল এখানে অংশ নিচ্ছে টানা তৃতীয়বার। এবার অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটি দলের সঙ্গে নিউ জিল্যান্ড ‘এ’ দল, নেপাল জাতীয় দল, হায়দরাবাদ কিংসমেন একাডেমিও অংশ নিচ্ছে।
টপএন্ড টি-টোয়েন্টি যে নতুন উচ্চতা স্পর্শ করছেন, সেটিও আশাবাদী করছে ডোভিকে।
“গত বছর সম্ভবত বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই আয়োজনটি সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। এখানে আসা বিগ ব্যাশ দলগুলির কোচ ও ক্রিকেটারদের মুখ থেকে এটা শোনা প্রশান্তিময় যে, তারা এমনভাবে তুলে ধরছেন, এটি এখন বিগ ব্যাশের পরই অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় সেরা টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা। আমার মনে হয়, আমরা এটিকে যে পর্যায়ে নিয়ে এসেছি, তারই ভালো প্রতিফলন পড়ছে এখানে।
আন্তর্জাতিক দল এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটারদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এখন এটিকে দেখতে পাচ্ছেন। গত বছর আমাদের সম্প্রচার ছিল অসাধারণ... একেবারে মেজর লিগ ক্রিকেটের সমতুল্য। সুতরাং, আমরা অবশ্যই এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে আমরা মনে করি এটি একটি দুর্দান্ত আয়োজন এবং এখানকার শীতকালীন ক্রিকেট কেমন হতে পারে, সেটির চমৎকার উদাহরণ।”