২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

হাত হারানোর শঙ্কা থেকে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানের রেকর্ডময় অভিষেকের গল্প

তিন বছর আগে হুমকির মুখে পড়েছিল যার ক্রিকেট ক্যারিয়ার, সেই তিনিই স্বীকৃত ক্রিকেটে অভিষেকে সাত নম্বরে নেমে অপরাজিত ১৪৯ রানের ইনিংসে দলকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দিয়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে।

হাত হারানোর শঙ্কা থেকে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানের রেকর্ডময় অভিষেকের গল্প

অসাধারণ ইনিংস খেলে দলকে জেতান লিয়াম ব্ল্যাকফোর্ড। ছবি: ক্রিকেট ভিক্টোরিয়া

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 20 Sep 2026, 08:30 PM

Updated : 20 Sep 2026, 08:30 PM

ক্রিকেটে লিয়াম ব্ল্যাকফোর্ডের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ছিল সবসময়ই। রাজ্য দল ভিক্টোরিয়া ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে নিয়মিত পারফর্ম করছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় যুব টেস্ট অভিষেক রাঙান সেঞ্চুরি করে। কিন্তু এর কয়েক মাস পরই বাঁধে বিপত্তি। ধরা পড়ে হাতে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা। একাধিক অস্ত্রোপচারে হুমকির মুখে পড়ে যায় ক্যারিয়ার। এমনকি হাত হারানোর শঙ্কাও জাগে। লম্বা সময় থাকতে হয় ক্রিকেটের বাইরে। তবে সব প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে তিনি ফিরে আসেন বাইশ গজে। আর এখন, স্বীকৃত ক্রিকেটে অভিষেকে অতিমানবীয় এক ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন ২২ বছর বয়সি ক্রিকেটার।

অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ৫০ ওভারের প্রতিযোগিতা ওয়ানডে কাপে কুইন্সল্যান্ডের ৩৩৫ রানের জবাবে ১৪ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল ভিক্টোরিয়া। বিব্রতকর এক পরাজয়ের চোখ রাঙানি তখন ভিক্টোরিয়ার সামনে। ব্ল্যাকফোর্ড সাত নম্বরে যখন ব্যাটিংয়ে নামেন, দলটির রান তখন ৫ উইকেটে ৮৪। দেড়শ হওয়া নিয়েই শঙ্কা। কিন্তু পরের গল্পটা অবিশ্বাস্য।

ষষ্ঠ উইকেটে ভিক্টোরিয়া অধিনায়ক উইল সাদারল্যান্ডের সঙ্গে ১৪৩ বলে ১৫২ রানের জুটিতে আশা জাগিয়ে তোলেন ব্ল্যাকফোর্ড। সাদারল্যান্ড ১০৬ বলে ১০০ রান করে ফিরলেও, আরও দুটি কার্যকর জুটিতে দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন ব্ল্যাকফোর্ড।

ব্রিজবেনের অ্যালান বোর্ডার ফিল্ডে শনিবার শেষ দুই ওভারে ২৮ রানের সমীকরণ মিলিয়ে ম্যাচটি ভিক্টোরিয়া ৩ উইকেটে জিতে যায় এক বল বাকি থাকতে। ১৬ চার ও ছয় ছক্কায় ১১৩ বলে অপরাজিত ১৪৯ রানের ইনিংস খেলে জয়ের নায়ক ব্ল্যাকফোর্ড।

প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে অভিষেকে কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ইনিংস এটি। এতদিন রেকর্ডটি ছিল মাজিদ খানের। সেই ১৯৭৩-৭৪ মৌসুমে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কুইন্সল্যান্ডের হয়ে অভিষেকে ১১৫ রান করেছিলেন পাকিস্তানের এই অলরাউন্ডার।

Image

বাঁহাতি কিপার-ব্যাটসম্যান ব্ল্যাকফোর্ড। ছবি: ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

ব্ল্যাকফোর্ড বাঁহাতি কিপার-ব্যাটসম্যান। ভিক্টোরিয়ার ক্রিকেট অঙ্গনে তাকে দারুণ সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার হিসেবে বিবেচনা করা হয় অনেক আগে থেকেই। ১৫ বছর বয়সে, ২০১৯ সালে তিনি ভিক্টোরিয়া কান্ট্রি দলের নেতৃত্ব দেন। এরপর ন্যাশনাল অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৬ দলের এবং ন্যাশনাল অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৮ দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৬ বছর বয়সে জিলংয়ের হয়ে তার ‘ফার্স্ট গ্রেড’ ক্রিকেটে অভিষেক হয়। ১৮ বছর বয়সে ভিক্টোরিয়ার দ্বিতীয় একাদশের হয়ে অভিষেকের দিনেই করেন ৯৭ রান।

২০২৩-২৪ মৌসুমের আগে ক্রিকেট ভিক্টোরিয়া তার সঙ্গে দুই বছরের ‘রুকি চুক্তি’ করে এবং ভিক্টোরিয়ান প্রিমিয়ার ক্রিকেটে তিনি জিলংয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন।

প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়েও। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ব্রিজবেনে ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে যুব টেস্ট অভিষেকে রান তাড়ায় উপহার দেন ১৩৬ বলে ১০৬ রানের ইনিংস।

তরতর করে তার ওপরে ওঠাটা যেন তখন রূপকথার মতোই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঘটে বিপত্তি, যা কেবল তার ক্রিকেট খেলাই নয়, বরং জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। তার ডান হাতে রক্ত জমাট বাঁধা (ব্লাড ক্লট) সমস্যা ধরা পড়ে। পরবর্তীতে তিনটি অস্ত্রোপচার করাতে হয় তার—যার মধ্যে একটি ছিল পাঁজরের হাড় অপসারণ। এমনকি তার হাতটি হারানোর শঙ্কাও তৈরি হয়।

২০২৩-২৪ অস্ট্রেলিয়ান মৌসুমের পুরোটা সময় ব্ল্যাকফোর্ডকে মাঠের বাইরে থাকতে হয়। চরম কঠিন সময় কাটিয়ে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি আবার ক্রিকেটে ফেরেন তিনি।

গত মাসে ভিক্টোরিয়া ক্রিকেট একাডেমির হয়ে টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে খেলেন ব্ল্যাকফোর্ড। যদিও খুব একটা ভালো করতে পারেননি। সাত ইনিংসে করতে পারেন কেবল ৮৯ রান। এর মধ্যে বাংলাদেশ হাইপারফরম্যান্স (এইচপি) দলের বিপক্ষে এক ম্যাচে আউট হন ১১ রান করে, অন্য ম্যাচে অপরাজিত থাকেন ১৯ রানে।

তবে এবার পেশাদার ক্রিকেটে অভিষেকেই রেকর্ডময় আলো ঝলমলে ইনিংসে দলকে জেতালেন তিনি।

ব্ল্যাকফোর্ডের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি সত্যিই অসাধারণ। আর এটিই তার এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা।

“ক্রিকেট ছাড়া একটা বছর- সত্যি বলতে বেশ দীর্ঘ একটা বছরই ছিল। শারীরিকভাবে আমি সুস্থই ছিলাম, কিন্তু রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যার কারণে আমাকে ওষুধ খেতে হচ্ছিল। আমি ক্রিকেট খেলতে পারছিলাম না, কারণ বলের আঘাত লাগার ঝুঁকি নেওয়া যাচ্ছিল না।

“আমি কৃতজ্ঞ যে এখন আবার মাঠে ফিরতে পেরেছি। এই বিষয়টিই আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পরিস্থিতি অন্যরকমও হতে পারত।”