Published : 08 Sep 2026, 05:02 PM
পারিশ্রমিক কাঠামো নিয়ে ক্রিকেটারদের সঙ্গে সমঝোতা হয়নি এখনও। তবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৭-২৮ মৌসুম থেকে বিগ ব্যাশ লিগে বেসরকারি বিনিয়োগ আনা হবে। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের শুরুটা হতে যাচ্ছে মেলবোর্ন রেনেগেডসের বিক্রয় প্রক্রিয়া চালুর মাধ্যমে।
অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের নিয়ন্তা সংস্থাটি মঙ্গলবার জানায়, ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক নিয়ে চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এসিএ) একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে ‘অনেকটা পথ দূরে’ থাকা সত্ত্বেও বিগ ব্যাশে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরবর্তী ধাপ নিয়ে কাজ এগিয়ে নেবে তারা।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার চেয়ারম্যান মাইক বেয়ার্ড এবং প্রধান নির্বাহী টড গ্রিনবার্গ জানান যে, রাজ্যগুলোকে তাদের বিগ ব্যাশ ফ্রাঞ্চাইজিগুলো বাজারে তুলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে দলের অংশীদারিত্ব বা পুরো দল বিক্রি করার অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বোর্ড।
অস্ট্রেলিয়ার পুরুষ দলের অধিনায়ক প্যাট কামিন্স, সহ-অধিনায়ক ট্রাভিস হেড, নারী দলের অধিনায়ক সোফি মলিনিউ এবং অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার এলিস পেরিকে পাশে নিয়ে ঘোষণাটি দেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার দুই কর্তা। কামিন্স এবং হেডের উপস্থিতি কিছুটা বিস্ময় জাগিয়েছে। কারণ জাতীয় দলে ব্যস্ততা ও চোট আর বিশ্রাম মিলিয়ে ২০১৯ সালের পর কামিন্স এবং ২০২৩ সালের পর হেড বিগ ব্যাশে খেলেননি। যদিও আগে অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সের হয়ে বিগ ব্যাশে শিরোপাজয়ী অধিনায়ক ছিলেন হেড।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বিবৃতিতে বলছে, রেনেগেডসের বিক্রয় প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে অন্য ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর ভবিষ্যৎ।
“বিগ ব্যাশ লিগগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার লক্ষ্যে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বোর্ড একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়েছে, যার সূচনা হবে মেলবোর্ন রেনেগেডসের বিক্রয় প্রক্রিয়া চালুর মাধ্যমে। নতুন মালিকানার অধীনে ২০২৭-২৮ মৌসুম খেলার লক্ষ্যে রেনেগেডসের জন্য বেসরকারি মালিকদের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হবে।
এই প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে, একটি স্ব-নির্ধারণ মডেলের আওতায় অন্য দলগুলোকেও বাজারে আনার বিষয়টি বিবেচনা করবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া, যা প্রতিটি রাজ্যকে তাদের নিজস্ব ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং সমাজের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ মূল্যায়নের সুযোগ দেবে।”
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার দাবি, বিগ ব্যাশে বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সম্ভাব্য বিপুল অঙ্কের অর্থ কাজে লাগানো হবে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সব পর্যায়ে।
“এই স্ব-নির্ধারণ মডেল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সকল দিকের সর্বোত্তম স্বার্থে নেওয়া হয়েছে এবং এটি কমিউনিটি, ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক পথ এবং এলিট ক্রিকেটের জন্য তহবিল বৃদ্ধি করবে; টেস্ট ক্রিকেটের প্রাধান্য রক্ষা করবে; আমাদের জাতীয় দল এবং বিগ ব্যাশ লিগগুলোতে সেরা খেলোয়াড়দের বিকাশ ও সম্পৃক্তকরণ অব্যাহত রাখবে এবং আমাদের ব্র্যান্ড, ভক্তদের সম্পৃক্ততা ও বাণিজ্যিক শক্তি বৃদ্ধি করবে।
রেনেগেডসের বিক্রয় প্রক্রিয়া চলাকালীন সদস্য রাজ্যগুলো এবং অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যাবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার চেয়ারম্যান বেয়ার্ড একই সুর কণ্ঠে তুলে বললেন, সামগ্রিকভাবে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট উপকৃত হবে এখান থেকে।
“বিগ ব্যাশে বিনিয়োগ ও এর প্রসারে এবং প্রতিটি স্তরে ক্রিকেটের স্বার্থ এগিয়ে নিতে অঙ্গীকারে ঐক্যবদ্ধ ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া এবং এর রাজ্য সদস্যরা। বিগ ব্যাশে বেসরকারি বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত করার মাধ্যমে, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া খেলাটির দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করতে, এর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এবং কমিউনিটি ক্রিকেট ও তৃণমূল স্তরের অংশগ্রহণ, ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক পথ এবং শীর্ষ স্তরে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিচ্ছে।
রেনেগেডসের বিক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করা আমাদের সদস্যদের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসন মডেলে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে এবং খেলাটির জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্তের প্রতিনিধিত্ব করছে।”
এখানে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট পরিচালনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও সদস্য রাজ্যগুলোর। এসবের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক সূচি, ক্রিকেটারদের প্রাপ্যতা, বিগ ব্যাশের পারিশ্রমিকের পরিধি, ব্র্যান্ডিং প্রস্তাবনা, সেইসঙ্গে পরিচালনার লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষিত মূল্য অর্জন এবং বিনিয়োগকারীদের অনুমোদন।
তবে এই ঘোষণাটি গত ১৫ জুনের বোর্ড সভার পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া বিবৃতির পরিপন্থী, যেখানে বলা হয়েছিল, পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে চারটি মূল শর্ত পূরণ করতে হবে, যার মধ্যে একটি ছিল: “অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এসিএ) সঙ্গে একটি স্ব-নির্ধারণ মডেলের কার্যপ্রণালীর বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো।”
ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকইনফোকে এসিএর প্রধান নির্বাহী পল মার্শ বলেছেন যে, দুই পক্ষের মধ্যে এখনও অনেক মতের ব্যবধান রয়েছে। সম্ভাব্য জটিলতার আভাসও মিলল তার কথায়।
“বিগ ব্যাশের প্রস্তাবিত বেসরকারীকরণের পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার আজকের ঘোষণাটি আমরা লক্ষ্য করেছি। এসিএর দৃষ্টিকোণ থেকে, বিগ ব্যাশ লিগগুলোর বেসরকারীকরণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে কাজগুলো করা প্রয়োজন, আজকের এই ঘোষণা তাতে কোনো পরিবর্তন আনবে না। এসিএ এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে একটি নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং বর্তমানে সম্ভাব্য সেই নতুন চুক্তি নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে।
আজকের ঘোষণা সত্ত্বেও, এসিএর সম্মতি ছাড়া কোনো দল বিক্রির বিষয়ে অগ্রসর হতে পারবে না অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাধান করা প্রয়োজন আগে। তা হলো, বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত অর্থ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট রাজস্বের সংজ্ঞার আওতায় পড়বে কি না। এই বিষয়ে, এই অর্থ সমঝোতা স্মারকের আওতায় পড়বে কি না, তা স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করার একটি প্রক্রিয়া প্রস্তাব করে এসিএ গত সপ্তাহে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে চিঠি লিখেছিল। এই প্রক্রিয়াটি এই প্রকল্পের পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।”
পল মার্শ বলেন, বিগ ব্যাশে বেসরকারীকরণের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এসিএ। তবে তা এই শর্তেই করা হবে যে, চুক্তিটি যেন ‘ক্রিকেট ও ক্রিকেটার, উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক হয়।’
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী গ্রিনবার্গ মতপার্থক্যের কথা স্বীকার করেই শোনালেন আশার কথা।
“পল মার্শের সঙ্গে ভালো আলোচনা হয়েছে আমার। হ্যাঁ, আলোচনার রূপরেখা নিয়ে আমাদের মধ্যে বেশ খানিকটা মতপার্থক্য রয়েছে। আমাদের একটি সমঝোতা স্মারক আছে, যা ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তাই আমরা মনে করি, আমাদের হাতে সময় আছে। এই নির্দিষ্ট মডেলে আমরা যা করার চেষ্টা করছি, তা হলো ক্রিকেটারদের হাতে আরও বেশি অর্থ তুলে দেওয়া।
আমরা মনে করি, এটি এই প্রকল্পের একটি মৌলিক অংশ। তাই আমরা এর একটি সমাধান খুঁজে বের করব। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। আমি বুঝতে পারছি, পলের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ অনেক ক্রিকেটার আছে তার সংগঠনে। আমি নিশ্চিত যে, আমরা একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারব।”
বর্তমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের মোট আয়ের ২৭.৫ শতাংশ পাওয়ার অধিকার এসিএর এবং তারা মনে করে যে, এর মধ্যে বিগ ব্যাশের ক্লাবগুলোর শেয়ার বিক্রি থেকে প্রাপ্ত যেকোনো এককালীন অর্থের মধ্যেও এই ২৭.৫ শতাংশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া মনে করে যে, এসিএ শুধুমাত্র বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে অর্জিত এবং পুনঃবিনিয়োগ করা সুদের ২৭.৫ শতাংশ পাওয়ার অধিকারী।
গত ফেব্রুয়ারিতে আলোচনা শুরু করেছিল এসিএ, যেখানে তারা ক্রিকেটারদের চলমান আয়ের অংশ স্থায়ীভাবে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিনিময়ে বিক্রয়লব্ধ অর্থের ২৭.৫ শতাংশ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু সেই প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
জানা গেছে, সমঝোতা স্মারকের ব্যাখ্যা নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ইতিবাচক ছিল। তবে, এই ধরনের নিষ্পত্তি কখন হতে পারে, তা স্পষ্ট নয়।
মেলবোর্ন রেনেগেডসের বিক্রয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগকে স্বাগত জানিয়েছে ক্রিকেট ভিক্টোরিয়া। যদিও বছরের শুরুতে মেলবোর্ন স্টার্স এবং রেনেগেডসের ব্যবস্থাপনা একীভূত করার ঘোষণা দিয়ে তারা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছিল। আগামী মৌসুমের আগে স্টার্সের নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা থাকলেও, তারা আরও এক বছরের জন্য বর্তমান ব্র্যান্ডিং বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিক্রয় প্রক্রিয়া চলাকালীন রেনেগেডসকে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তত্ত্বাবধানে স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ দেয়।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ক্রিকেট ভিক্টোরিয়ার পরিচালক শন রিচার্ডসন এবং এই বছর শেষ হওয়ার আগেই দলটি বিক্রি করা যাবে বলে তারা আত্মবিশ্বাসী।
“এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে এগিয়ে যেতে এবং মেলবোর্ন রেনেগেডসকে বাজারে আনতে আগ্রহী আমরা। এই দেশে ক্রিকেটের ভবিষ্যতের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার জন্য আমরা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বোর্ডকে ধন্যবাদ জানাই।
স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই স্পষ্ট আগ্রহ রয়েছে (দল কিনতে) এবং ভিক্টোরিয়ায় ক্রিকেটের জন্য আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সম্ভাব্য অংশীদারকে খুঁজে বের করতে আমরা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভিক্টোরিয়ান ক্রিকেটের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত পুনঃবিনিয়োগের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে এই বেসরকারি বিনিয়োগ।”