প্রথম দিনে তিনশ পেরিয়েও সঙ্গী কিছু আক্ষেপ

থিতু হয়েও বাজে শটে উইকেট বিলিয়ে এসেছেন শান্ত-মুশফিকসহ বাংলাদেশের কয়েকজন ব্যাটসম্যান।

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনিসিলেট থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 Nov 2023, 12:39 PM
Updated : 28 Nov 2023, 12:39 PM

প্রথম দিনেই রান পেরিয়ে গেছে তিনশ। ওভারপ্রতি রান সাড়ে তিনের বেশি। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা দল তো এমন ছবিই কল্পনা করে! সমস্যা হলো, স্কোরবোর্ডে উইকেটের কলামও থাকে। সেদিকে তাকালেই ছবিটা ফিকে হয়ে আসছে অনেকটা। উইকেট যে পড়ে গেছে ৯টি!

আরেকটু গভীরে গেলে হতাশার ছবিই বরং স্পষ্ট হয় বেশি। দলের প্রথম ৯ ব্যাটসম্যানই দু অঙ্ক ছুঁয়েছেন, কিন্তু ফিফটি করতে পেরেছেন স্রেফ একজন। থিতু হয়ে উইকেট ছুড়ে এসেছেন কয়েকজন। নিউ জিল্যান্ডের সফলতম বোলার যিনি, তিনি আসলে বিশেষজ্ঞ বোলারই নন!

সিলেট টেস্টের প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের রান ৯ উইকেটে ৩১০। মাহমুদুল হাসান জয় ছাড়া বলার মতো রান করতে পারেননি একজনও। সেই জয়ও আসলে সেঞ্চুরিটা একরকম ফেলেই এসেছেন মাঠে। সম্ভাবনা জাগিয়েও আউট হয়েছেন ৮৬ রানে।

টেস্ট অভিষেকের প্রায় চার বছর পর দ্বিতীয় ম্যাচটি খেলতে নেমেছেন যিনি, সেই গ্লেন ফিলিপস নিয়েছেন ৪ উইকেট। একসময় তার পরিচয় ছিল মূলত কিপার-ব্যাটসম্যান। পরে বোলিংয়ে হাত পাকানো শুরু করেন। এখন সীমিত ওভারে হাত ঘোরাতে দেখা যায় প্রায়ই। তাই বলে টেস্টের প্রথম দিনে ৪ উইকেট পেয়ে যাবেন, এমন কিছু যে তিনি নিজেও ভাবতে পারেননি, তা হাসতে হাসতে বলেই দিলেন দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সম্ভব করেছেন সেটিই।

ফিলিপসের একটি ফুল টসে উইকেট বিলিয়ে এসেছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। জোর করে বানিয়ে কাট করার চেষ্টায় আউট হয়েছে মুমিনুল হক। বেশ ভালো শুরুর পর ফিলিপসের বলেই আলগা শটে উইকেট হারিয়েছেন অভিষিক্ত শাহাদাত হোসেন। অফ স্পিনারকেই উইকেট দিয়ে এসেছেন নুরুল হাসান সোহান।

উইকেট উপহারের পালা শেষ নয় সেখানেই। দলের অভিজ্ঞতম ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিমও নিজের মূল্যবান উইকেট স্রেফ হাতে ধরে দিয়ে এসেছেন এজাজ প্যাটেলকে।

শান্ত ও মুশফিক যেভাবে আউট হয়েছেন, মনে হচ্ছিল যেন শেষ দিনে সাড়ে তিনশ রান তাড়ায় জয়ের জন্য ব্যাট করছে বাংলাদেশ!

দিনের শুরুটা বেশ স্বস্তিতেই করতে পেরেছিল বাংলাদেশ। উইকেটে পেসারদের সহায়তা তেমন একটা না থাকলেও নতুন বলে কিছুটা সুইং আদায় করে নেন টিম সাউদি। আরেক পাশে কাইল জেমিসনও ছিলেন আঁটসাঁট। তবে সফলতা তারা পাননি। সপ্তম ওভারেই আক্রমণে আনা হয় স্পিন। শুরুটা তবু নিরাপদেই করতে পারে বাংলাদেশ। প্রথম ১২ ওভারে বিপদ হতে দেননি জয় ও জাকির হাসান।

জাকির অবশ্য খুব একটা স্বস্তিতে খেলতে পারছিলেন না। এজাজের বলে বোল্ড হয়ে আগে বিদায়ও নেন তিনি। এরপরই শুরু শান্তর ঝড়।

টেস্ট নেতৃত্বের অভিষেকে শান্ত চমকে দেন আগ্রাসী ব্যাটিং দিয়ে। বিশেষ করে, এজাজ প্যাটেলের ওপর চড়াও হয়ে ওঠেন তিনি। চতুর্থ বলেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে ছক্কা মারেন এই বঁহাতি স্পিনারকে। পরে তাকে আছড়ে ফেলেন মাথার ওপর দিয়ে সাইটস্ক্রিনের ওপর, ছক্কা মারেন স্লগ সুইপেও। এসবের মধ্যে চার মারেন রিভার্স সুইপ করেও।

তার দাওয়াই হিসেবেই ফিলিপসের অফ স্পিন আক্রমণে আনেন টিম সাউদি। কিউই অধিনায়কের সেই সিদ্ধান্ত সফল করে তুলতে সহায়তা করেন শান্তই। একবার ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে ঠিকভাবে খেলতে পারেননি। পরের বলেই আবার একই চেষ্টা করতে গিয়ে ফুল টস বলে ক্যাচ দিয়ে বসেন। এমন ডেলিভারিতে উইকেট পেয়ে বিস্ময়টা লুকাননি ফিলিপস। শান্ত নিজেও হতাশায় ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। কিন্তু তখন আর লাভ কী!

৫৩ রানের এই জুটি ভাঙার পরও খুব বিপদে পড়তে হয়নি বাংলাদেশকে। জয় এক প্রান্তে আস্থায় খেলছিলেন শুরু থেকেই। আরেক পাশে মুমিনুলও ভালো শুরু করেন। লাঞ্চের আগে রান পেরিয়ে যায় একশ। দ্বিতীয় সেশনও উইকেটশূন্য থেকে কেটে যাচ্ছিল নির্বিঘ্নেই।

কিন্তু এরপরই পথ হারানোর শুরু। শান্তর মতোই ফিলিপসের বলে ৩৭ রানে আউট হয়ে ফেরেন মুমিনুল। পরের ওভারেই ইশ সোধির লেগ স্পিনে মনোযোগ হারিয়ে স্লিপে ধরা পড়েন জয়।

এরপর সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারতেন যিনি, সেই মুশফিকই সবচেয়ে হতাশ করেন। হুট করেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এজাজ প্যাটেলকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান আউট হন ১২ রানে।

২ উইকেটে ১৮০ রানে থাকা দল ৩০ রানের মধ্যে হারায় ৩ উইকেট।

এরপর আর কোনো ব্যাটসম্যান দায়িত্ব নিয়ে খেলতে পারেননি। ২০ রান করে কাইল জেমিসনের বাড়তি বাউন্সের শিকার হন মেহেদী হাসান মিরাজ। টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম অভিযানে শুরুটা ভালো করেও শাহাদাত ২৪ রানে ফেরেন হতাশাজনক শটে।

এরপর আশা হয়ে উইকেটে ছিলেন কেবল সোহান। তবে নির্ভরতা তিনি জোগাতে পারেননি। বরাবরের মতোই উইকেটে অস্থির উপস্থিতি ছিল তার। ছটফট করতে করতে কিছু শট অবশ্য তিনি খেলেছেন, দ্রুত কিছু রান এসেছে। তবে ইনিংস বড় হয়নি। ৫ চারের ইনিংস থেমেছে ২৮ বলে ২৯ রান করে।

এরপর নাঈম হাসান ও শরিফুল ইসলামের কয়েকটি বাউন্ডারিতে দলের রান তিনশ পেরোয়। আলোকস্বল্পতায় দিনের খেলা শেষ হয় ৫ ওভার আগে। শেষ জুটির চেষ্টায় দিনটা পার হয়ে যায় অলআউট না হয়ে। সেটিকে সান্ত্বনা মনে করা যেতে পারে আপাতত। তবে গোটা দিনে তাকিয়ে একটু দীর্ঘশ্বাসই হয়তো পড়বে ড্রেসিং রুমে। দিনটা তো আরও কত ভালো হতো পারত!

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৮৫ ওভারে ৩১০/৯ (জয় ৮৬, জাকির ১২, শান্ত ৩৭, মুমিনুল ৩৭, মুশফিক ১২, শাহাদাত ২৪, মিরাজ ২০, সোহান ২৯, নাঈম ১২, তাইজুল ৮*, শরিফুল ১৩*; সাউদি ১৪-২-৪৩-০, জেমিসন ১৭-৫-৫২-২, প্যাটেল ২৪-১-৭৬-২, সোধি ১৪-১-৭১-১, ফিলিপস ১৬-১-৫৩-৪)