র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে এই মানববন্ধন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে; বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা সময়ে কর্মসূচি পালিত হয়।
Published : 03 May 2023, 06:37 PM
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের র্যাগিং ও বুলিংয়ে জড়িত থাকলে প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, এমন সুযোগ রেখে নীতিমালা জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এই নীতিমালা কার্যকর হবে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই। এতে বলা হয়েছে, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিন থেকে পাঁচ সদস্যের বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধ কমিটি থাকতে হবে। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে একদিন পালিত হবে ‘বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধ দিবস’।
রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সচিব সোলেমান খানের স্বাক্ষরে মঙ্গলবার এই নীতিমালা জারি করা হয়। নীতিমালাটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, বুলিং ও র্যাগিংয়ে কোনো শিক্ষক, অশিক্ষক অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীর প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন বা বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বুলিং ও র্যাগিংয়ে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, গভর্নিং বডি, ম্যানেজিং কমিটি, এডহক কমিটি, বিশেষ কমিটির কোনো সভাপতি, সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট বিধি, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
যেসব কাজ করলে র্যাগিং-বুলিং হবে
মৌখিক বুলিং ও র্যাগিং: কাউকে উদ্দেশ্য করে মানহানিকর বা অপমানজনক এমন কিছু বলা বা লেখা যা খারাপ কোনো কিছুর প্রতি ইঙ্গিত বহন করে ইত্যাদিকে মৌখিক বুলিং ও র্যাগিং বোঝাবে। যেমন- উপহাস করা, খারাপ নামে সম্বোধন করা বা ডাকা, অশালীন শব্দ ব্যবহার করা, গালিগালাজ করা, শিস দেওয়া, হুমকি দেওয়া, শারীরিক অসমর্থতাকে নিয়ে উপহাস করা বা অনুরূপ কার্যাদি।
শারীরিক বুলিং ও র্যাগিং: কাউকে কোনো কিছু দিয়ে আঘাত করা, চড়-থাপ্পড়, শরীরে পানি বা রং ঢেলে দেওয়া, লাথি মারা, ধাক্কা মারা, খোঁচা দেওয়া, মারা, বেঁধে রাখা, কোনো বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বা বসে বা বিশেষ অবস্থায় থাকতে নির্দেশ দেওয়া অথবা কোনো কিছু করতে বা না করতে বাধ্য করা, কারো কোনো জিনিসপত্র জোর করে নিয়ে যাওয়া বা ভেঙে ফেলা, মুখ বা হাত দিয়ে অশালীন বা অসৌজন্যমূলক অঙ্গভঙ্গি করা বা অনুরূপ কার্যাদি।
সামাজিক বুলিং ও র্যাগিং: কারও সম্পর্কে গুজব ছড়ানো, প্রকাশ্যে কাউকে অপমান করা, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোত্র, পেশা, গায়ের রঙ, অঞ্চল বা জাত তুলে কোনো কথা বলা বা অনুরূপ কার্যাদি।
সাইবার বুলিং ও র্যাগিং: কারো সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটূ কিছু লেখা বা ছবি বা অশালীন ব্যঙ্গাত্মক কিছু পোস্ট করে তাকে অপদস্থ করা বা অনুরূপ কার্যাদি।
সেক্সুয়াল বুলিং ও র্যাগিং: ইচ্ছাকৃতভাবে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আপত্তিজনক স্পর্শ করা বা করার চেষ্টা করা, ইঙ্গিতবাহী চিহ্ন প্রদর্শন করা, আঁচড় দেওয়া, জামা-কাপড় খুলে নেওয়া বা খুলতে বাধ্য করা বা অনুরূপ কার্যাদি।
এছাড়াও উপরে বর্ণনা করা হয়নি এমন কর্ম, আচরণ, কার্যাদি যা অসম্মানজনক, অপমানজনক ও মানহানিকর এবং শারীরিক বা মানসিক যাতনার কারণ হতে পারে, তা যে নামেই হোক না কেন তা বুলিং ও র্যাগিং হিসেবে গণ্য হবে।
শাস্তির প্রক্রিয়া
নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ৩-৫ সদস্য বিশিষ্ট বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধ কমিটি কমিটি গঠন করতে পারবে। কমিটি এক বা একাধিকও হতে পারে। এই কমিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং হয় কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। পর্যবেক্ষণের জন্য বুলিং বা র্যাগিং লগস তৈরি করবে, প্রয়োজনে প্রশ্নমালা ব্যবহার করবে।
বুলিং সংক্রান্ত অভিযোগ দাখিল ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছে আবেদন দাখিল করবেন। বুলিং ও র্যাগিং সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ প্রাপ্ত হলে প্রতিষ্ঠান প্রধান কমিটি গঠন করে তদন্তের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গঠিত কমিটিও তাদের নিকট উপস্থাপিত অভিযোগ তদন্তপূর্বক প্রতিষ্ঠান প্রদানের নিকট অদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
নীতিমালায় তদন্তকারী টিম বুলিং সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সর্বোচ্চ ০৭ (সাত) দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান প্রধান তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপনপূর্বক পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষ ও কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের করণীয় সম্পর্কে নীতিমালায় বলা হয়েছে, বুলিং ও র্যাগিংয়ে উৎসাহিত হয় এরূপ কোনো কার্যকলাপ, সমাবেশ বা অনুষ্ঠান করা যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যেসব জায়গায় বুলিং ও র্যাগিং হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেসব জায়গায় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা করবে।
সচেতনতামূলক কার্যক্রম
শিক্ষাবর্ষের শুরুতে এক দিন ‘বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধ দিবস’ পালন করে বুলিং ও র্যাগিংয়ের কুফল সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সচেতন করবে।
বুলিং ও র্যাগিংয়ের কুফল সম্পর্কিত সিনেমা, কার্টুন, টিভি সিরিজ প্রদর্শন, অনলাইনে দায়িত্বশীল আচরণের ব্যাপারে অনলাইন বিহেভিয়ার সম্পর্কিত কর্মশালাসহ ইত্যাদি সহপাঠ্যক্রমিক কর্মশালা আয়োজনে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। কর্তৃপক্ষ বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের ‘এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ’-এ অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করবে।
শিক্ষা বৎসরের শুরুতেই কমিটি আবশ্যিকভাবে এবং পরবর্তীতে তিন মাস অন্তর অন্তর শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভা, মতবিনিময়, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম,ওয়ার্কশপ আয়োজন করবে। রাখতে পারবে অভিযোগ বক্স বা ডিজিটাল ড্রপ বক্স।
নীতিমালায় বলা পদক্ষেপ কার্যকরে প্রয়োজনীয় অর্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই দিতে হবে।