Published : 02 Sep 2025, 02:06 PM
ডাকসু নির্বাচনের এক প্রার্থীকে ‘গণধর্ষণের’ হুমকি দেওয়া শিক্ষার্থীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদের প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করে রিট মামলা করার পর ওই প্রার্থী এ হুমকি পান।
মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে হুমকিদাতার শাস্তি দাবির পাশাপাশি ডাকসু নির্বাচন নিয়ে একগুচ্ছ প্রস্তাব ও দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে তাহমিনা খানম বলেন, “হাই কোর্টে একজন প্রার্থীর রিটের বিষয়কে কেন্দ্র করে, সেই নারী প্রার্থীকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষার্থী ফেইসবুক পোস্টের মাধ্যমে গণধর্ষণের হুমকি দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
“হুমকিদাতা আলী হুসেনকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দিতে হবে, যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।”
এসএম ফরহাদের প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রোববার হাই কোর্টে রিট আবেদনটি করেন ‘অপরাজেয় ৭১, অদম্য ২৪’ প্যানেলের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক প্রার্থী বি এম ফাহমিদা আলম।
৫ অগাস্টের আগে এসএম ফরহাদ ‘ছাত্রলীগের কমিটিতে’ ছিলেন, এর পরও তিনি কীভাবে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী হলেন, এমন প্রশ্ন তুলে তার প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করা হয় রিট আবেদনে।
সোমবার তার রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে হাই কোর্ট আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচন স্থগিত করে এবং আদেশের ১৫ দিনের মধ্যে জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার আদেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালকে।
ওই আদেশের পর শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখালে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চেম্বার আদালত হাই কোর্টের আদেশ স্থগিত করায় নির্বাচনের ‘বাধা’ কেটে যায়।
ফাহমিদাকে নিয়ে সোমবার বিকালে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আলী হুসেন।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের এ আবাসিক শিক্ষার্থী পোস্টে লেখেন, “হাই কোর্টের বিপক্ষে এখন আন্দোলন না করে আগে একে গণধর্ষণের পদযাত্রা করা উচিত।
“কেউ এসব শব্দচয়ন দেখে সুশীল হইয়েন না, যে একে সাপোর্ট করবে ওপরের কথাটা তার জন্যও প্রযোজ্য।”
তার এ পোস্টের পর থেকে ছাত্রদল ও বেশ কয়েকটি বাম ছাত্র সংগঠন অভিযোগ করে, আলী হুসেন ছাত্রশিবিরের কর্মী।
আলী হুসেনকে শিবির নেতা হিসাবে অভিহিত করে মঙ্গলবার ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ডাকসু নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সিনেট ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করছে সংগঠনটি।
আলী হুসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সোমবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছে ছাত্রশিবির। ‘অপরাজেয় ৭১, অদম্য ২৪’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী নাইম হাসান হৃদয়ও একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
তাদের অভিযোগের সূত্র ধরে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিকে ‘সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন’ দিতে বলা হয়েছে।
সহকারী প্রক্টর মুহাম্মদ মাহবুব কায়সারকে প্রধান করে গঠিত কমিটিতে আরও দুই সহকারী প্রক্টর শেহ্রীন আমিন ভূইয়া এবং মো. রেজাউল করিম সোহাগ সদস্য হিসাব রাখা হয়েছে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের সংবাদ সম্মেলনে ডাকসু ভোট সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের স্বার্থে পর্যাপ্ত বুথের ব্যবস্থা, আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং সাইবার বুলিংয়ের বিষয়ে ব্যবস্থাগ্রহণে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলছে, “ডাকসু নির্বাচনের জন্য মোট ভোটারের অনুপাতে যথেষ্ট সংখ্যক বুথ নিশ্চিত করতে হবে। যথাযথভাবে ব্যালট যাচাই করে ভোটদানের জন্য প্রত্যেক ভোটারের কত সময় লাগবে তা বাস্তবসম্মতভাবে নির্ণয় করে তার ভিত্তিতেই বুথের ব্যবস্থা করতে হবে।
“এই প্রাক্কলন অনুযায়ী প্রয়োজন হলে বুথের সংখ্যা বাড়াতে হবে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে বুথের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যাকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এখনো বুথের সংখ্যা যথেষ্ট নয় বলে আমরা মনে করি এবং প্রাক্কলন অনুযায়ী সংখ্যা নির্ধারণের দাবি জানাই।”
নির্বাচনে ভোটদানের সময়সীমা আরও এক ঘণ্টা বাড়িয়ে বিকাল ৫টা পর্যন্ত করার দাবি জানিয়েছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
লিখিত বক্তব্যে তাহমিনা খানম বলেন, “কতগুলো বুথ হবে এবং কত সময় লাগবে তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের কোনো অভিযোগ বা দ্বিমত থাকলে সে বিষয়গুলো সমাধান করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
“ভোটগণনা প্রক্রিয়াকে কার্যকরী ও স্বচ্ছ করার জন্য কর্তৃপক্ষকে যৌক্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এই প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনার জন্য দৈনিক একটি নির্ধারিত সময়ে বসতে হবে।”
তিনি বলেন, “নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি হিসেবে আচরণবিধি ও এর লঙ্ঘন সংক্রান্ত সকল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে এবং সেগুলো যেন কোনো পক্ষের প্রতি বৈষম্যমূলক না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
“কোনো বিধিলঙ্ঘনের জন্য নির্ধারিত শাস্তি কী তা কোথাও উল্লেখ না থাকায় ঢালাওভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং এ সংক্রান্ত তথ্য জানানো হলেও কমিশনকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আমরা দেখছি না। কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তাকে/ সেই প্যানেলকে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।”
নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে নিযুক্ত করার ক্ষেত্রে যেন কোনো বৈষম্য না হয় তা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
সাইবার বুলিং বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাহমিনা খানম বলেন, “সাইবার বুলিয়িং বন্ধ করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
“বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সম্পর্কে অরুচিকর পোস্ট ও মন্তব্য সহকারে আক্রমণ করা হয় এমন গ্রুপ বা পেইজে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি যে সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক কমিউনিটির জন্য অপমানজনক হয়ে ওঠে তা বিবেচনা করতে হবে। এ ধরনের পেইজ/গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভোটদানের উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাসে নিরাপদে আগমন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন অনুসারে বাস ও ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্তের বিষয়ে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলছে, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমে ৭ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সকল পরীক্ষা ও ক্লাস বাতিল করেছিল। পরবর্তীতে তারা ৭ তারিখের পরীক্ষা ও ক্লাস বাতিলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ৮ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করে।
“আমরা মনে করি, শুধু নির্বাচনের দিন ক্লাস ও পরীক্ষা একযোগে বন্ধ করা এবং নির্বাচনের আগের দুইদিন অর্থাৎ ৭ ও ৮ তারিখ কেবল পরীক্ষা স্থগিত থাকলেও ক্লাস চালু রাখা যৌক্তিক। আমরা এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সহযোগিতা আশা করি।”
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক নেটওয়ার্কের সংগঠক অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা।