২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫ কার্তিক ১৪৩৩

এলপিজির দাম কত বাড়াতে চায় কোম্পানিগুলো? বিইআরসিতে প্রস্তাব

চলতি মাসের শুরুতে একলাফে ১২ কেজি সিলিন্ডারে ২৫২ টাকা বাড়ানো হলেও সরকারি এ দামে কোথাও এলপিজি মিলছে না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 21 Oct 2026, 12:46 AM

Updated : 21 Oct 2026, 12:46 AM

বর্তমান সরকারি দামে তাদের না পোষানোর কথা তুলে ধরে নতুন মূল্য নির্ধারণে কমিশন বাড়ানোসহ গ্যাস বাজারজাত করার বিভিন্ন ধাপে বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয় চায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বোতলজাতকারী কোম্পানিগুলো।

কোম্পানিগুলো কেজিপ্রতি গ্যাস মজুত ও বোতলজাত করার খরচের সঙ্গে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর আবেদন করেছে। পাশাপাশি বিনিয়োগের ওপর মুনাফা বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছে।

দাম বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে ব্যাংকঋণের সুদ, পরিবহন, কারখানা পরিচালনা ও নিরাপত্তা খরচ বাড়ার কথা বলেছে কোম্পানিগুলো।

কোম্পানিগুলোর দেওয়া প্রস্তাবে খরচের হিসাবে পার্থক্য দেখা গেছে। প্রতি কেজি এলপিজি মজুত ও বোতলজাত করার খরচ ওমেরা এলপিজি ১২ টাকা ২৫ পয়সা, মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি ২৫, ডেল্টা এলপিজি ৩০, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি সাড়ে ১৯ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।

বাড়তে থাকা এলপিজির দাম নিয়ে আগামী ২৯ অক্টোবর গণশুনানি করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এতে সরকারি এলপিজির দাম এবং বেসরকারি এলপিজির বিভিন্ন খরচ ও কমিশন পরিবর্তনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হবে। প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে আগামী ২৭ অক্টোবরের মধ্যে লিখিত মতামত জমা দেওয়া যাবে।

Image

ফাইল ছবি

গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম মোট ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। সেপ্টেম্বরে দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

তবে বাজারে এখনও নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি মিলছে না; ১২ কেজির সিলিন্ডার ২৩০০ টাকার নিচে পাচ্ছেন না ক্রেতারা।

এর মধ্যেই বিভিন্ন খরচ ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি করতে যাচ্ছে বিইআরসি।

হাই কোর্টের নির্দেশনায় ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। পরে ওই বছরের অক্টোবরে দাম নির্ধারণের পদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়। এরপর থেকে সৌদি আরামকোর প্রতি মাসের চুক্তিমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে কমিশন।

কোম্পানিভেদে খরচের হিসাবে পার্থক্যের বিষয়ে এ খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) এর সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রতিটি কোম্পানি নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী প্রস্তাব দিয়েছে। কোন কোম্পানির হিসাব কতটা গ্রহণযোগ্য তা সরকার বিবেচনা করবে।

এলপিজির ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এলপিজির বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করা যাচ্ছে না।

নির্ধারিত দাম বাড়ানোর পরও ভোক্তারা কেন সেই দামে এলপিজি পাচ্ছেন না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “পাচ্ছে না কেন, এটা তো আমি বলতে পারব না। এটা তো আমরা এনে দেব।” বাজারে বেশি দামে বিক্রি তদারকির বিষয়ে তিনি বলেন, “ওটা তো মনিটরিং করার দায়িত্ব আমার না।”

বাজার তদারকি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন লোয়াব সভাপতি। বেশি দামে বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রস্তাবে যা চায় অপারেটরগুলো

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিম চৌধুরী ১৩ অক্টোবর তাদের প্রস্তাব জমা দেন। এতে লোয়াবের ২০২৩ সালের ১৮ অক্টোবরের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাবসহ একটি চিঠি এবং চলতি অক্টোবরের সৌদি আরামকোর চুক্তিমূল্যের ভিত্তিতে তৈরি নতুন হিসাব সংযুক্ত করা হয়েছে।

লোয়াবের ওই চিঠিতে অপারেটরগুলোর মুনাফার হার ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

আর ওমেরার প্রস্তাবে প্রতি কেজি এলপিজি মজুত ও বোতলজাতকরণ খরচ ১১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ২৫ পয়সা করার কথা বলেছে। অন্যান্য ব্যয়, মুনাফা ও কমিশন বাড়ানোর হিসাবসহ ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ১৩৭ টাকা করার দাবি করা হয়েছে।

অর্থাৎ বর্তমান সরকারি দর ১ হাজার ৮৩৭ থেকে প্রতি সিলিন্ডারে আরও প্রায় ৩০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে কোম্পানিটি।

ওমেরা নতুন হিসাবে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারে অপারেটরের মুনাফা ও কোম্পানি কর বাবদ প্রায় ১৪০ টাকা বেশি প্রস্তাব করেছে। ঋণ ও অর্থায়ন ব্যয় বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৮৭ টাকা।

এছাড়া আমদানির অন্যান্য খরচ বাড়িয়ে প্রায় ১১ থেকে ৩৫ টাকা, ব্যাংকসংক্রান্ত খরচ ৮ থেকে ৩০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবে পরিবেশকের কমিশন ৫০ টাকা অপরিবর্তিত রেখে খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে ৮০ টাকা করা হয়েছে। কয়েকটি খাতে ব্যয় কম দেখিয়ে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ টাকা দাম বাড়ানোর হিসাব দিয়েছে কোম্পানিটি।

কোম্পানিটির দাবি, কারখানা পর্যায়ে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্য অপারেটরদের ব্যয় প্রায় ৪৭৮ টাকা। অথচ বিইআরসির হিসাবে এ ব্যয় ২১২ টাকা বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর আগে মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি প্রথমে ৯ মার্চ মূল্য নির্ধারণের বিভিন্ন খরচ সংশোধনের আবেদন করে। পরে ১৫ অক্টোবর বিইআরসির চাহিদা অনুযায়ী আরও তথ্য জমা দেয়।

সবশেষ আবেদনে কোম্পানিটি মজুত ও বোতলজাতকরণ খরচ প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশকের কমিশন প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে ১০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সা করার দাবি জানিয়েছে।

মেঘনার দাবি, ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি সিলিন্ডারের নিরাপত্তা পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। নিজেদের বিনিয়োগের ওপর বছরে ২০ শতাংশ মুনাফা বিবেচনার প্রস্তাবও দিয়েছে কোম্পানিটি।

অন্যদিকে ডেল্টা এলপিজি ১৫ মার্চের আবেদনে মজুদ ও বোতলজাতকরণ খরচ প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে।

কোম্পানিটি পরিবেশকের কমিশন প্রতি কেজিতে ৮ টাকা ৩৩ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ১০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের দাবি, আমদানি, পরিবহন ও ঋণের খরচ বাড়ায় বর্তমান দামে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে তুলনামূলক কম খরচের প্রস্তাব দিয়েছে পেট্রোম্যাক্স এলপিজি। ১৫ অক্টোবরের আবেদনে কোম্পানিটি মজুত ও বোতলজাতকরণ খরচ প্রতি কেজিতে ১৯ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণের আবেদন করেছে।

পাশাপাশি প্রতি কেজিতে ১ টাকা ৫০ পয়সা টার্নওভার কর এবং ৮ টাকা ১২ পয়সা অর্থায়ন ব্যয় বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে। টার্নওভার কর হল ব্যবসার মোট আয়ের ওপর ধার্য করা কর। ব্যবসায় লাভ না হলেও এই কর দিতে হয় বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

পেট্রোম্যাক্স পরিবেশকের কমিশন প্রতি কেজিতে ৮ টাকা ৩৪ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৭ টাকা ৫০ পয়সা করার দাবি জানিয়েছে। অটোগ্যাস মজুদ খরচ প্রতি কেজিতে ৩ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৭৫ পয়সা করার আবেদনও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি সরকারি এলপি গ্যাস লিমিটেডও সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২০৫ টাকা ৪২ পয়সা করার আবেদন করেছে। ফেব্রুয়ারির ওই আবেদনে বিদ্যমান দাম ৮২৫ টাকা দেখানো হলেও অক্টোবরে বিইআরসির নির্ধারিত দাম ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা।

এদিকে কোম্পানিগুলো এলপিজির আমদানি খরচ বাড়ার কথা বললেও জাহাজভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম সেপ্টেম্বরে প্রতি টনে ১৬০ ডলার থেকে বাড়িয়ে অক্টোবরে ২৫০ ডলার করেছে বিইআরসি। একই সময়ে সৌদি আরামকোর গড় চুক্তিমূল্য ৬৪৭ দশমিক ৭৫ থেকে বেড়ে ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার হয়েছে।

ওমেরার নতুন প্রস্তাবে অক্টোবরের এ দুটি হার অপরিবর্তিত রয়েছে।

কমিশন তিনগুণ চান পরিবেশকরা

অপারেটরগুলোর পাশাপাশি এলপিজি পরিবেশকরাও কমিশন বাড়ানোর আবেদন করেছেন।

তাহের এন্টারপ্রাইজ, মা এন্টারপ্রাইজ, জামাল এজেন্সি ও উজ্জ্বল ট্রেডার্সের আবেদনে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারে পরিবেশকের কমিশন ৫০ থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে ৭০ টাকা করার দাবি রয়েছে।

তাদের বক্তব্য, পরিবহন, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান কমিশনে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

পুরনো খবর:

এলপিজির দাম ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব, গণশুনানি করবে বিইআরসি
মন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পর কর্মসূচি প্রত্যাহার এলপিজি ব্যবসায়ীদের
১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ২৫২ টাকা
দেশে এলপিজির মজুদ ‘পর্যাপ্ত, সংকট নেই’, বলছেন তথ্য উপদেষ্টা
এলপিজি ‘সংকট’: ভোক্তার ত্রাহি দশা