২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

এলপিজি ‘সংকট’: ভোক্তার ত্রাহি দশা

ভোক্তারা বলছেন, যে কোম্পানির গ্যাসের সিলিন্ডার তারা নিয়মিত ব্যবহার করেন, সেটা না থাকার কথা বলছেন দোকানি। নতুন করে অন্যদের সিলিন্ডার নিতে গেলে সিলিন্ডারসহ দাম ধরার কথা বলা হচ্ছে।

এলপিজি ‘সংকট’: ভোক্তার ত্রাহি দশা

ফাইল ছবি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Sep 2026, 12:56 AM

Updated : 26 Sep 2026, 12:58 AM

সকালের নাশতা তৈরির মাঝপথে হুট করে সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে যায় মিরপুর-১২ নম্বরের মুসলিম বাজার এলাকার গৃহিনী পারভীন আজাদের।

নিয়মিত যে দোকান থেকে তিনি গ্যাস সিলিন্ডার কেনেন, সেই সোহাগ ইলেকট্রনিক্সে ফোন করলেও ধরেননি দোকানি; উপায়ন্তর না দেখে নিজেই দোকানের পথ ধরেন পারভীন।

বাজারে এসে ওই দোকান বন্ধ পেয়ে আরেক দোকানে গেলে তাকে বলা হয়, তার সবসময় ব্যবহার করা বসুন্ধরা এলপিজি নেই। অন্য কোম্পানির সিলিন্ডার কিনতে গুণতে হবে ৩৫০০ টাকা!

এমন পরিস্থিতি দেখে হোটেল থেকে নাশতা কিনে বাসায় ফিরেছেন পারভীন আজাদ। নাশতা সেরে সোহাগের সন্ধানে বের হয়েও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি তিনি।

এরপর দুপুরের খাবারও হোটেল থেকে কেনার পরিকল্পনার কথা বললেন এই নারী; রাতে হয়ত মিটমিট করে জ্বলা লাইনের গ্যাসের রান্নার চেষ্টা চালাবেন।

প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) যে দাম নির্ধারণ করে, তাতে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এখন ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

আগের দাম থেকে ১৩ টাকা কমিয়ে ২ সেপ্টেম্বর এই দাম নির্ধারিত হলেও ভোক্তাকে কিনতে হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বাড়তি দিয়ে।

শুক্রবার সকালে মিরপুর ১২ এর মুসলিমবাজার ঘুরে দেখা যায় বেশিরভাগ দোকান বন্ধ। কারও কারও দোকানের সামনে গ্যাসের সিলিন্ডার দেখা গেলেও দোকান বন্ধ দেখা যায়।

কোনো কোনো দোকানে সিলিন্ডার বিক্রি হলেও দাম চড়া। তারা বলছেন, বেশিরভাগ কোম্পানির সরবরাহ নেই। যে গ্যাস রয়েছে, সিলিন্ডারসহ কিনতে তার দাম পড়বে ৩৫০০-৩৬০০ টাকা পর্যন্ত।

আর সিলিন্ডার মিলে গেলে সেক্ষেত্রে প্রতিটি এলপিজি গ্যাস ২১ শ টাকা করে বিক্রির কথা বলছেন তারা।

ওই এলাকার দোকানি শাহীন বলেন, "আমাদের কাছে এখন ফ্রেশের সাপ্লাই আছে। ২১০০ টাকা।"

এটাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও ৫১৫ টাকা বাড়তি। ২১ শ টাকা কবে হল, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "লাস্ট ১০-১২ দিন আগে। একবারে বাড়ে নাই, ধাপে ধাপে বাড়ছে। ১৬০০ টাকা থেকে ২১০০ টাকা হয়েছে।"

ভোক্তারা বলছেন, যে কোম্পানির গ্যাসের সিলিন্ডার তারা নিয়মিত ব্যবহার করেন, সেটা না থাকার কথা বলছেন দোকানি। নতুন করে অন্যদের সিলিন্ডার নিতে গেলে সিলিন্ডারসহ দাম ধরার কথা বলা হচ্ছে।

মুসলিম বাজারের আরেকজন ক্রেতা বলেন, এমনিতে যে কোনো কোম্পানির সিলিন্ডার ফেরত দিলেই আরেকটা সিলিন্ডার দিয়ে দেয়। এখন সংকটের কথা বলে কোম্পানি পরিবর্তন করতে বলছে, সিলিন্ডারসহ দাম ধরতে চাচ্ছে।

ওই ভুক্তভোগী বলছেন, “বাসায় ডেলিভারি নিতাম ১২ কেজি গ্যাস ২ হাজার টাকায়। এখন বলতেছে, এটা নাই। অন্যটা নিতে হবে। ৩৫০০ টাকা লাগবে।

"বোতলে ১৫০০ টাকা বেশি। আরে ভাই আমার তো নাভানার সাথে সম্পর্ক না। আমি চিনি এদের। তিনবছর একই দোকান থেকে কিনি। একেক সময় একেক কোম্পানির দেয়। আর সুযোগ বুঝলেই বলে ওই কোম্পানির নাই।"

মিরপুরের মত সংকট অতটা প্রকট না হলেও ঢাকার পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে এলপিজি।

ওই এলাকার দোকানি মনির মোল্লা বলেছেন, আগের বৃহস্পতিবার ১৭ শ টাকায় ওমেরা’র ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনলেও বৃহস্পতিবার তাকে গুণতে হয়েছে বাড়তি দুশ টাকা।

বাড়তি দামের কারণ হিসাবে ডিলারের কাছ থেকে সরবরাহ কমার যুক্তি আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “ডিলার বলছে, সাপ্লাই কম, তাকেও বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে। দাম বাড়ানোর জন্য এই সংকট তৈরি করা হয়েছে মনে হচ্ছে।”

ঢাকার ইন্দিরা রোডে সাধনপাড়ার সামনের এলপিজি ডিলার, মাজেদ এন্টারপ্রাইজের দোকানি বলেছেন, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম আগে ১৭ শ টাকা থেকে বিক্রি করেছেন। শুক্রবার দাম দুই হাজার টাকা।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাধারণত চাহিদা অনুযায়ী মাল পাই। গতকাল (বৃহস্পতিবার) মাত্র এক গাড়ি দিয়েছে। দামও বাড়তি। আমাদের কিছু করার থাকছে না।”

মিরপুরের পাইকপাড়া আহমেদ নগরের একজন বিক্রেতা জানালেন, ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে জিএমআই, আইগ্যাস ও নাভানার সিলিন্ডারের সাপ্লাই পাচ্ছেন না। গ্রাহককেও দিতে পারছেন না।

মগবাজার দিলু রোডের একজন বিক্রেতা জানালেন, তার দোকানে পেট্রোম্যাক্স ও ওমেরা ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির সিল্ডিন্ডারের সরবরাহ নেই।

“আমার কাছে যা আছে, ২১০০ টাকায় দিতে পারব। আগে ১৭৫০ টাকায় দিতাম, কিন্তু এখন আমাদেরই বেশি দিয়ে নিতে হচ্ছে। কোম্পানি থেকে বলছে, এলপিজির কনটেইনার আসছে না।”

এই সংকটের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, “অলরেডি মধ্যপ্রাচ্যের ক্রাইসিস পেট্রোলিয়াম খাতের উপর একটা সমস্যা। এই ক্রাইসিস যতক্ষণ চলবে ততক্ষণ পর্যন্ত সবাইকে সাফার করতে হবে।”

তিনি বলেন, “মিডলইস্টের ক্রাইসিসে গভমেন্ট যেসব কার্গো কিনছে, ওখানেই সাপ্লাইয়ের যা অবস্থা, তারচেয়ে তো আমাদের অবস্থা ভালো। আমরা তো অ্যাটলিস্ট ডেলিভারি করছি।”

কেউ যদি বেশি দামে বিক্রি করে, তাদের বিষয়ে তদারকি বাড়ানোর আহ্বান জানান লোয়াব সভাপতি।

তিনি বলেন, “আমরা তো আমাদের প্রাইসেই বিক্রি করি। এখন খুচরা বিক্রেতা যদি নির্ধারিত দরে বিক্রি না করে, সেটা তো সরকারকে দেখতে হবে।”