বাজারের খোলা সয়াবিন তেল কবে ঢুকবে বোতলে?
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কয়েক বছর ধরে আলোচনা চললেও কোম্পানিগুলো এখন বলছে, তাদের প্রস্তুতি নেই। তা শুনে হতাশ ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, খোলা সয়াবিন তেল আর বিক্রি হবে না, সব বোতলে ভরতে হবে। নানা সময়ে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, বিক্রেতা কোম্পানিগুলোকে সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে বারবার। এভাবে কয়েক বছর গড়িয়ে গেলেও অগ্রগতি নেই বললেই চলে।
সোমবার ঢাকার কারওয়ান বাজারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে এক আলোচনায় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাংলাদেশের বাজার এখনও শতভাগ প্যাকেটজাত ভোজ্যতেলের জন্য প্রস্তুত নয়।
তা শুনে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান প্রশ্ন তুললেন, তাহলে এত দিনের আলাচনার ফল কী দাঁড়াল?
ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানি, ডিলার ও পাইকারি বিক্রেতাদের নিয়ে এই বৈঠক হয়।
কেন এই সিদ্ধান্ত?
স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্যতেল, দামের কারসাজি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে প্রায় এক দশক ধরে প্যাকেটজাত ভোজ্যতেল বিপণনে উৎসাহিত করে আসছে সরকার।
ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ যুক্ত করার আইন হয়েছে ২০১৩ সালে। কিন্তু বাজারে এখনও খোলা সয়াবিন তেলে ভিটামিন এ এর অনুপস্থিতি পাচ্ছে বিএসটিআই।
সফিকুজ্জামান সোমবারের বৈঠকে বলেন, যে প্রক্রিয়ায় খোলা তেল বিক্রি হচ্ছে সেখানে ভিটামিন এ মেশানো হলেও রোদে বা অন্যান্য পরিস্থিতির কারণে ভিটামিন এ থাকছে না।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে আরেকটি কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৯ সালে আরেকটি আইন হয়েছে যে, ভোজ্যতেল সম্পূর্ণ প্যাকেটজাত বা বোতলজাত করতে হবে। এখন কেমিকেলের ড্রামে এসব তেল পরিবহন করা হয়। এগুলো কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত কিংবা ফুড গ্রেডেড কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
“দোকানে ড্রামের মুখটা খোলা থাকে, তেলাপোকা ও ইঁদুর পড়ে মরে থাকে। এসব কারণে আমরা এটা(বোতলজাত) বাধ্যতামূলক করেছি।”
বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই
আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে সয়াবিন তেল এবং ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পাম তেল শতভাগ বোতলজাত বা প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করার কথা।
সেই জুলাই গড়িয়ে আরেকটি জুলাইও পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শক্ত পদক্ষেপের দিকে হাঁটতে পারেনি সরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের প্রয়োজন হয়; যার ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। ভোজ্যতেলের বাজারের ৭০ শতাংশ পাম তেল এবং ৩০ শতাংশ সয়াবিন তেলের দখলে রয়েছে।
এখন সরকার চাচ্ছে, আপাতত পাম তেল বাদ রেখে ৩০ শতাংশ বা সাড়ে সাত লাখ টন সয়াবিন তেলের বাজার শতাভাগ বোতলজাতকরণ।
সফিকুজ্জামান বলেন, “অনেকগুলো ডেডলাইন পার হয়ে গেছে। তিনবার আমরা পিছিয়ে গেছি। সবপক্ষ নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। জুলাইতে জাতীয় কমিটির মিটিং হয়েছে। অগাস্ট থেকে আমরা পুরোপুরি প্যাকেজিংয়ে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখনও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।”
অবশ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি, দেশে মূল্যস্ফীতিসহ বেশ কিছু কারণের কথা বলেন তিনি।
“গত দুই বছরে ভোজ্যতেলের দাম অনেক বেড়ে গিয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে বোতলজাত করার বিষয়ে সরকারও একটু স্লো হেঁটেছে। কারণ, খোলা তেলের চেয়ে বোতলের তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেশি। যেহেতু এখন দামটা নিম্নগামী, সেই কারণে এই সময়টা আমরা বেছে নিয়েছিলাম।”
টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, বাজারে এখন প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৭৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল ১৬৫ টাকা, প্রতি লিটার খোলা পাম তেল ১৩৫ টাকা।
দামে বেশি হেরফের হলে খোলা সয়াবিন তেলের দামে বিক্রেতারা ক্রেতাদের হাতে কম দামের পাম তেল ধরিয়ে দেন। এই বিষয়টিকেও সয়াবিন তেল বোতলজাত করার পেছনে একটি কারণ হিসাবে উল্লেখ করে ভোক্তা অধিকার।
আরও সময় চান ব্যবসায়ীরা
বৈঠকে এস আলম গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ডলার সংকট ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখনই ভোজ্যতেল প্যাকেটজাত করতে কারখানার অবকাঠামোগত পরিবর্তনে হাত দিতে পারছেন না তারা। আর বাজারে চাহিদা থাকার কারণেই খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে।
তিনি জানান, এস আলম গ্রুপের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার টন। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ খোলা তেল এবং বাকিটা প্যাকেটজাত তেল।
“আমাদের বর্তমান প্যাকিং ক্যাপাসিটি দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ টন। এটা হয়ত আমরা ৫০০ থেকে ৬০০ টনে নিয়ে যেতে পারব। পুরোটা প্যাকিং করার মতো অ্যাবিলিটি এই মুহূর্তে নেই। যতটুকু করছি, সেটা করতে গিয়েও প্রচুর বিনিয়োগ হয়ে গেছে।”
ভোজ্যতেল স্বাস্থ্যসম্মত কি না এবং সেখানে ভিটামিন এ এর প্রয়োজনীয় উপস্থিতি আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে অন্য কোনো উপায় বের করার পরামর্শ দেন এই ব্যবসায়ী গ্রুপের প্রতিনিধি।
মেঘনা গ্রুপের প্রতিনিধি শফিউর রহমান জানান, তারা দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টন প্যাকেটজাত করার সক্ষমতা রাখেন। কোম্পানি তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, “এখনই (খোলা তেল বিক্রি) বন্ধ করে দিলে সাপ্লাই চেইনে সমস্যা হবে। সবাই একমত যে, আমরা প্যাকিংয়ে চলে যাব। তবে এই মুহূর্তে যখন ডলারের দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এখনই নতুন বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না।”
টি কে গ্রুপের কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন আহমেদও একই কথা বলেন। সেই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, “ধীরে ধীরে প্যাকিংয়ে যেতে হবে। ক্রেতারাই প্যাকেটের বাজার সৃষ্টি করবে। আটা-ময়দার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। আগে খোলা আটা বেশি ছিল, প্যাকেট আটা কম ছিল। এখন খোলা আটা নেই বললেই চলে।”
রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের কর্মকর্তা আপাতত বোতলের পরিবর্তে পলিপ্যাক ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “বোতলে যেতে না পারলে পলি প্যাকেটে যাওয়া যায়। পলিপ্যাক করতে সর্বোচ্চ ৭ টাকা খরচ হয়। রূপচাঁদা সব সময় প্যাকেটেই তেল বিক্রি করছে।”
এখন কী করবে ভোক্তা অধিদপ্তর?
ব্যবসায়ীরা যেসব কথা বলেছেন, তা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে তুলে ধরা হবে বলে জানান ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। এই মুহূর্তে খুচরা পর্যায়ে জরিমানা বা শক্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না বলে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেন তিনি।
তবে সার্বিক চিত্রে হতাশা প্রকাশ করে সফিকুজ্জামান বলেন, “তিন-চার বছর ধরে এটা নিয়ে কাজ হচ্ছে। এখন মনে হয় আমরা শুরুর পর্যায়েই আছি। আবারও যদি ড্রামের পক্ষে কথা বলেন, তাহলে চার বছরের আলোচনায় লাভ হলো কী? এভাবে চলতে থাকলে কবে এটা শুরু হবে জানি না।”
