১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এলপিজির আমদানি সীমা কোনো সমস্যা না: ব্যবসায়ীদের কথার জবাবে বিইআরসি প্রধান

তবে ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে অচলাবস্থার প্রভাব দেশে এলপিজির সরবরাহ ও বাজারে পড়ার কথা তুলে ধরেন তিনি।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Jan 2026, 06:58 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:34 PM

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজারে অস্থিরতার জন্য আমদানি সীমা বাড়ানোর আবেদনে সরকারের সাড়া না পাওয়াকে একটি কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক গোলটেবিল আলোচনায় তার ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, এই সীমার অতিরিক্ত আমদানি হওয়ার ঘটনা আছে। শিথিলযোগ্য এই সীমা কোনো সমস্যা না।

তবে ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে অচলাবস্থার প্রভাব দেশে এলপিজির সরবরাহ ও বাজারে পড়ার কথা তুলে ধরেন তিনি। বলেন, চীন কেনার পরিমাণ বাড়ানোর কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনেক জাহাজ কালো তালিকাভুক্ত করায় সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে।

এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিনের সহযোগিতায় ‘এলপিজি বাজারে খাতের রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এ গোলটেবিলের আয়োজন করে লোয়াব। আলোচনায় এক হাজার ৩০৫ টাকা নির্ধারিত দামের সিলিন্ডার ২৫০০-২৬০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হওয়ার বিষয়ে জানতে চান এক সাংবাদিক।

এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে লোয়াবের সভাপতি বলেন, আইগ্যাস, মেঘনা গ্রুপ, ডেল্টা, ওমেরা, যমুনা- এই পাঁচ কোম্পানির আমদানি সীমা বাড়ানোর জন্য সংগঠনের পক্ষে আবেদন করেছিলেন তিনি।

“এক বছর পর নভেম্বর মাসে জ্বালানি মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে বলল, মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা কাভার করে না বলে নতুন করে পরিমাণ বাড়াতে পারবে না। আমি যদি পরিমাণ বাড়াতে না পারি, আমি আনতে পারতেছি না।”

তার সংগঠন লোয়াব দাম নির্ধারণ করে না দাবি করে তিনি বলেন, “প্রাইসিং করে বিইআরসি। ওষুধের দাম, বা অন্যান্য পণ্য আপনি যদি বাজার থেকে কিনতে যান, ওখানে যদি বেশি দামে বিক্রি করে আপনি কিনবেন? 

“নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আছে না! কোনোটা বেশি দামে বিক্রির করার রাস্তা আছে নাকি? লোয়াব এক টাকাও বেশি দামে বিক্রি করে না।”

তার এ বক্তব্যের পর বাজার রেগুলেশনের বিষয়ে নানা কথার পাশাপাশি আমদানি সীমা নিয়েও কথা বলেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।

সীমার বাইরে বিভিন্ন কোম্পানির আমদানির তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “লিমিটের বিষয়টা আমি সমস্যা বলে মনে করি না। কেন, না বলে মনে করি, এক বছর পেন্ডিং থাকার পর জ্বালানি বিভাগ ‘নীতিমালায় নেই’ বলে তারা আবেদনগুলি নামঞ্জুর করেছেন।”

জালাল আহমেদ তথ্য দেন, ইউনাইটেড আইগ্যাসের লিমিট যখন এক লাখ টন, তখন তারা আমদানি করেছে এক লাখ ৮৩ হাজার টন। ৩ লাখ টন সীমার জায়গায় ওমেরা ২ লাখ ২০ হাজার টন, ২ লাখ ৫০ হাজার টন সীমার মেঘনা ২ লাখ ৯৯ হাজার টন, ১ লাখ ৮০ হাজার টন সীমার যমুনা স্পেসটেক ২ লাখ ৮ হাজার টন এবং ৬০ হাজার টন আমদানি সীমার ডেল্টা এলপিজির ৮০ হাজার টন এনেছে।

“অর্থাৎ লিমিট ক্রস করে যারা আমদানি করেছে, কাউকে আটকানো হয়নি, তারা আমদানি করতে পেরেছে।”

তিনি বলেন, “লিমিটের বিষয়ে আমার যেটা ব্যক্তিগত অভিমত, এটার থাকার দরকার নাই। তবে কালকে যখন আমরা আলাপ করেছিলাম আপনাদের অনেকের সঙ্গে, কেউ কেউ বলেছে যে একটা লিমিট থাকতে পারে। থাকলে সেটা শিথিল থাকবে।”

জালাল আহমেদ বলেন, ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে অচলাবস্থার কারণে চীন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ব্যাপক পরিমাণে পাইকারি এলপিজি কিনেছে। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে অসংখ্য জাহাজ কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। 

“নভেম্বরে ১৮৪টি জাহাজ ও ১০টি কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আসছে। ডিসেম্বরে ২৯টি জাহাজ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় এসেছে। ইরান থেকে জ্বালানি বের না হওয়ার কারণে চীনের মতো বড় ক্রেতারা ব্যাপক কেনাকাটা করছে। ফলে বাংলাদেশের ছোট ক্রেতারা সুযোগ কম পেয়েছে।”

আগামী রোজার মাসে সংকট যাতে অতোটা প্রকট না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখেই এখনই উদ্যোগ নিতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করে তিনি বলেন, “উনারা যেন সর্বত চেষ্টা করেন যেন যত বেশি সম্ভব এই মাসে আনার। এই মাসে যদি এক লাখ ৫০ হাজার টনও চলে আসে, আমার ধারণা এটা এখনকার সমস্যাটা কমিয়ে আনবে এবং ফেব্রুয়ারির কার্গোটা যেন উনারা নিশ্চিত করেন। 

“গতকাল উনাদের কাছে চেয়েছি আমি তিন মাসের প্রক্ষেপণ, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ। যদি উনারা জানুয়ারিতে এক লাখ ৫০ হাজার জন নিশ্চিত করতে পারেন এবং ফেব্রুয়ারির ডেলিভারিটা যদি নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে হয়তো আমাদের রমজানের সমস্যাটা থাকবে না।”

আলোচনায় নির্ধারিত দামের দ্বিগুণ দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামানও।

তিনি বলেন, “কেন এক হাজার ৩০৬ টাকার গ্যাস আমরা ২৫শ টাকা কিনব? একজন সাংবাদিক ভাই এখানে প্রশ্ন তুলেছেন, টাকা দিলে গ্যাস পাওয়া যায়। লোয়াবের যারা আছেন, যারা এটার অপারেটর তারা বলছে যে ওই প্রাইজেই দিচ্ছে। তাহলে তাদের ফ্যাক্টরি থেকে আমার বাড়ি পর্যন্ত, আমি রিটেইলারের কাছ থেকে যখন কিনছি, এটার সাথে যারা স্ট্রাইক করেছিল কয়দিন আগে বা সেখানে কোথায় গ্যাপ আছে।

“সেখানে কী হলো, জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে বলল যে, আমাদের লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে, ম্যাজিস্ট্রেটদেরকে মোবাইল কোর্ট করার জন্য, ভোক্তা অধিকারের ডিজিকে আমরা বললাম, ওরাও যেন এটা নিয়ে কাজ করে।”

এলপিজি অপারেটররা বাড়তি দাম না নিলে সেই টাকা কার পকেটে গেছে, সেটা খুঁজে বের করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “এই ১৩০০ টাকা বা এরকম ১২০০ টাকা অতিরিক্ত, এই টাকাগুলো কাদের পকেটে গেছে, আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলে কোথায় এই টাকাগুলো চলে গেছে অতিরিক্ত, সেটাও বের করা দরকার।”

গ্রাহক থেকে বিল নিলেও গ্যাস না দিয়ে তিতাস ভোক্তার সাথে প্রতারণা করছে মন্তব্য করে ক্যাব সভাপতি বলেন, “আমাদের যাদের পাইপলাইনে গ্যাস আছে, কোনো জায়গায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, ১১শ টাকা বিল নিচ্ছে, কেন?

“এটা ভোক্তার সাথে প্রতারণা। তিতাস গ্যাস বলছে যে, তাদের এটা চুরি হয়; চুরি বন্ধ করার দায়িত্বটা কার? এবং তারা মেইন যে গ্রিড লাইন সেখান থেকে পাইপ দিয়ে বাড়িতে বাড়িতে বিভিন্ন জায়গায় গ্যাস দিয়েছে। এটা অন্য কেউ করেনি। তিতাসের লোকজনই করেছে।”

তিনি বলেন, “আমি যদি ওই তিতাস গ্যাসের সুশাসন যদি আমি নিশ্চিত না করতে পারি, তাহলে এলপিজির উপরে এই অতিরিক্ত চাপ পড়বে। আপনি পাইপলাইনের গ্যাসের বিল দিচ্ছেন, সাথে সাথে আপনার সিলিন্ডার কিনতে হয়। ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার আপনার কিনতে হয় ২৫০০ টাকায়।

“তিতাস যেখানে গ্যাসগুলো দেওয়ার কথা, সেটা যদি ঠিকভাবে দিতে পারত, তাহলে তো নিশ্চয় সিলিন্ডারের উপরে এ চাপটা পড়ত না।”

অনুষ্ঠানে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, এলপিজি ব্যবসায় লাইসেন্সিং একটা বড় সমস্যা। যেই কারণে প্রায় ২৮টি কোম্পানি ব্যবসায় নেমেও টিকে আছে কেবল ৮-১০টি। বছরে এক কোটি টাকারও বেশি যদি লাইসেন্স নবায়নে খরচ হয়ে যায় তাহলে কোম্পানিগুলো এই টাকা কার কাছ থেকে আদায় করবে? 

“সেজন্য কয়েক বছরের জন্য আরও কম খরচে লাইসেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে। আন্তর্জাতিক চর্চা হচ্ছে একক রেগুলেটর এবং কয়েক বছরের জন্য লাইসেন্স। সবার জন্য ল্যাবের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। একটা ল্যাব থেকেই পণ্যের মান যাচাই করা সম্ভব। প্রয়োজনে বছরব্যাপী পরিদর্শন কাজ চালানো যেতে পারে।”

মালিকদের তথ্যের বরাত দিয়ে এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের সম্পাদক মোল্লা এম আমজাদ হোসেন বলেন, রেগুলেটরি খরচ কমালে ১২ কেজি একটি সিলিন্ডারে ১০০ টাকা পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব একেএম ফজলুল হক বলেন, দেশের প্রায় ৬০ লাখ পরিবারে এলপিজির ব্যবহার রয়েছে। তাই এটি এখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার এলপিজি নীতিমালা নবায়ন করছে। সেখানে কীভাবে এই খাতকে সমস্যামুক্ত করা যায় সেই দিক নির্দেশনা যোগ করা হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বিএনপি নেতা জহিরউদ্দিন স্বপন, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল হাসান, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামসুজ্জামান সরকার বক্তব্য দেন।