১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

লোহা-কয়লার দামের প্রভাব দা-ছুরিতে

কামারের দোকান, কামারপাড়ার পাশাপাশি অনলাইনেও চলছে বিক্রি।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 May 2026, 03:55 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:18 PM

কয়লার আগুনে পোড়ানো জ্বলন্ত লোহার ওপর ওস্তাদ-সাগরেদের হাতুড়ির ছন্দবদ্ধ পিটাপিটি আর টুংটাং শব্দে কর্মব্যস্ত হয়ে উঠেছে কামারপাড়া। অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে এখন বেশি ব্যস্ততা এ পাড়ায়।

কোরবানি ঈদের দিন কয়েক আগে কেউ বানাচ্ছেন পশু ও মাংস কাটার নানা সরঞ্জাম, আবার কেউ ক্রেতাকে দেখাচ্ছেন পণ্য।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, চাঁদ উদ্যান, মোহাম্মদপুরের কামারপাড়া ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। তবে কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতিতে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত তারা।

কামারিরা বলছেন, লোহা ও কয়লার দাম বেশি হওয়ায় দা, ছুরি, চাপাতি বানাতে খরচ বেশি পড়ছে। ফলে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। আর বেশি দাম হাঁকায় ক্রেতাও কমছে।

দাম বেড়ে যাওয়ায় পুরনো সরঞ্জামে শান দিয়ে এবারের মত কোরবানির কাজ চালিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন ক্রেতাদের অনেকে।

কারওয়ান বাজারে রয়েছে মিউনিসিপ্যাল কর্মকার মার্কেট। রেল লাইনসংলগ্ন এ কামারপট্টিতে রয়েছে ১৪টি কামারের ঘরসহ প্রায় ২৪-২৫টি দোকান। প্রতিটি দোকানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার বিভিন্ন আকারের দা, বঁটি, ছুরি, চাপাতি। ক্রেতাদের আনাগোনাও বেড়েছে।

দেশে গত ছয় মাসে প্রতিটন লোহার দাম ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সেই সঙ্গে কয়লার দামও বাড়তি। এর প্রভাব দা-ছুরির বাজারে পড়ার কথা বলছেন বিক্রেতারা।

কারওয়ান বাজারের কামারপল্লীতে এক দশক ধরে কাজ করছেন ফাহিম। পাশাপাশি অনলাইনেও এসব সরঞ্জাম বিক্রি করেন তিনি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “লোহা ও কয়লা দুইটার দাম বেশি। মৌসুম আসলে মজুরিও বাড়তি থাকে। 

“অফ সিজনে ৫০০/৬০০ টাকা দিয়ে কামলা পাওয়া গেলেও এসময়ে হাজার টাকা দেয়া লাগে। সেটাতো দামে যোগ হবে। এরপরও দাম বেশি বাড়েনি। ৬০/৭০ টাকা এদিক ওদিক হয় আরকি।”

এ বাজারের ভোলা সদর হার্ডওয়্যার দোকানের মালিক আমির হোসেন বলেন ভিন্ন কথা। তার দাবি, “দাম আগের মতোই আছে। পাঁচ বছর আগে যা বিক্রি করেছি, এখনও ওই দামে বিক্রি হচ্ছে।”

দাম বেশি হাঁকানোর অভিযোগ করেন শান্তিবাগ থেকে দা-ছুরি কিনতে আসা ক্রেতা মনিরুল ইসলাম। বলেন, “দুই বছর পর পর দুই-একটা সরজ্ঞাম কিনি। আগেরগুলো হারিয়ে যায়, না হয় জং ধরে ধার যায়।

“এবার ছুরি আর চাপাতি কেনার জন্য এসেছি কিন্তু দাম বেশি চায়। একটি চাপাতি দাম চায় ১ হাজার টাকা। দুই বছর আগে কিনেছি ৬৫০ টাকা দিয়ে।”

কারওয়ান বাজারে নতুন যন্ত্রপাতি বিক্রি ও বানানোতে ব্যস্ততা দেখা গেলেও আবাসিক এলাকার আশেপাশের কামার পাড়াগুলোতে দেখা যায় অন্য চিত্র। 

মোহাম্মদপুর, চাঁদ উদ্যানে এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কামারের দোকানে চলছে দা-ছুরি বানানোর পাশাপাশি পুরোনো দা-ছুরিতেও শান দেওয়ার কাজও।

রোববার সকালে মোহাম্মদপুরের গ্লাস ফ্যাক্টরি গলিতে পাশাপাশি থাকা তিনটি কামারের দোকানের একটি দোকানে পুরনো দা-ছুরি ধার দিত এসেছেন সাদেক। বটি, দা ও একটি মাঝারি ছুরি নিয়ে এসেছেন। বটি ও দা ধার দিতে দাম ঠিক করলেন ১৭০ টাকা। একটি চাপাতিও কিনলেন। 

তিনি বলেন, “গত বছর চাপাতি কিনেছি ৭০০ টাকায়। এবার সেটি কিনতে হয়েছে ৯০০ টাকায়। তারপরও কিনতে হবে, তাই কিনেছি।”

১২ বছর বয়স থেকে কামারের কাজে যুক্ত থাকা বগুড়ার আদম দিঘীর বাসিন্দা এবায়দুল ইসলাম বলেন, “কয়লার দাম বেশি। লোহার দাম বেশি। এবার কিছুটা বেশি দামই নিতে হচ্ছে।

“তবে কোরবানির ঈদকে ঘিরে বেচাবিক্রি কিছুটা বেড়েছে। তবে আগের বছরগুলোর তুলনায় কম।”

কোনটার দাম কত

দোকানদাররা বলছেন, বড় স্প্রিং চাপাতির দাম প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকা, ছোট চাপাতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়া ছুরি (ছোট) ২০০, মাঝারি ৩০০ এবং বড় জবাই করার ছুরি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

দা ৮০০-৯০০ টাকা, বঁটি প্রতিপিস সাড়ে ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা, ভোজালি ৫০০ থেকে ২ হাজার এবং হাড় কাটার জন্য ছোট আকারের কুড়াল ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

এছাড়া পশুর চামড়া কাটার জন্য ছোট ছোট চাকু বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। 

যন্ত্রপাতি ধার দিতে বঁটির জন্য ১২০ থেকে ২০০ এবং চাপাতিতে ১৫০-২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। 

অনলাইনেও চলছে বিক্রি

বিক্রিসহজ ডটকম, অফুরন্ত ডটকম, অথবা ডটকম, ইফেরি ডটকমসহ বিভিন্ন অনলাইন বাজারেও চলছে ছুরি-চাপাতির বিক্রি।

অনলাইন ঘেঁটে দেখা গেছে, টেবিল বটি ৯৫০ টাকা, নিউ এলিট বটি ৪৫০, চাপাতি ১ হাজার, ১২ ইঞ্চি স্টিলের গরু কাটার ছুরি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০, ছোট সাইজের ছুরি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ৩০০ এবং মাঝারিগুলো বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়।

টিকে থাকতে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরাও এখন অনলাইনে সরঞ্জামাদি বিক্রি করছেন। ফাহিম নামের এক বিক্রেতা বলেন, “দোকানে বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনেও বিক্রি করছি। ওখানে আরো বেশি দামে বিক্রি করা যায়।”